জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সাদ্দামের ‘নিজেকে রক্ষা’র অ্যাপ

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ০৭:৫০, আগস্ট ১৯, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০০, আগস্ট ১৯, ২০১৬

যেমন হবে আত্মরক্ষা অ্যাপের হোমপেজ

২০১২ সালের একদিন ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে নিজের মোবাইলফোন ও টাকা-কড়ি খোয়ান মেহেরপুরের মুজিবনগরের যুবক সাদ্দাম হোসেন শাহীন। সেই থেকে শিক্ষা নিয়ে ভাবতে থাকেন কীভাবে এর প্রতিকার বের করা যায় এবং মানুষকে সহযোগিতা করা যায়। সে সময় তিনি মেহেরপুরেই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়তেন।পড়াশোনারত অবস্থাতেই তিনি তার ভাবনাটা কাজে লাগিয়ে তৈরি করে ফেলেন সেলফ প্রটেক্ট বা নিজেকে রক্ষা নামের একটি অ্যাপ। যদিও অ্যাপটি ছিল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের। সেই প্রাথমিক পর্যায়ের অ্যাপটি চোখে পড়ে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান সবুর খানের।

বাংলা ট্রিবিউনকে বাকি গল্পটা বলেন সাদ্দাম নিজেই—‘সবুর খান স্যারের সঙ্গে আমার ফেসবুকে যোগাযোগ হয়। আমি অ্যাপের বিষয়টি তাকে খুলে বলি। তিনি আমাকে ঢাকায় আসতে বলেন। আমি ঢাকায় এসে তার সঙ্গে দেখা করে অ্যাপের বিষয়টি বুঝিয়ে বলি। তিনি আমার অ্যাপটি দেখে খুবই পছন্দ করেন। তিনি আমাকে ঢাকায় আসার পরামর্শ দিয়ে বলেন, মেহেরপুরে থাকলে অ্যাপটা নিয়ে বেশি দূর যাওয়া যাবে না।’

‘সবুর খান স্যার আমাকে ওই অ্যাপটির কারণে স্কলারশিপ দিয়ে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি) পড়ার সুযোগ করে দেন।’

বর্তমানে সাদ্দাম এই ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের (সম্মান) শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।

এই অ্যাপটি ব্যবহার করে যে কোনও ব্যক্তি নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারেন এবং কোনও বিপদে পড়লে উদ্ধার পাওয়ার জন্য হাতের মোবাইলে আগে থেকে ইন্সটল থাকা অ্যাপের সাহায্য নিয়ে মোবাইলের বাটন টিপে বিপদমুক্ত হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন এর নির্মাতা।

সাদ্দাম জানান, ২০১৪ সাল থেকে তিনি সেলফ প্রোটেক্ট-এর কাজ শুরু করেন।সরকারের আইসিটি বিভাগের অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে তার এই আইডিয়ার কথা জানালে প্রশিক্ষকরা তাকে উৎসাহিত করেন, একইসঙ্গে সহযোগিতাও করেন। ছোট্ট প্রশিক্ষণ আর ইন্টারনেট থেকে গাইড নিয়ে শুরু হয় তার অ্যাপ তৈরির কাজ। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় তার কাজ আরও সহজ হয়ে যায়।

এখনও অ্যাপটির উন্নত সংস্করণ তৈরির কাজ করছেন তিনি। সাদ্দাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অ্যাপটি জননিরাপত্তামূলক ও অপরাধ দমন-সংক্রান্ত হওয়ায় গুগল প্লে-স্টোর বা অন্যান্য মার্কেট প্লেসে দিতে গেলে পুলিশ সদর দফতর বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হয়। অ্যাপটির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা প্রথমে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাবে এবং বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিটির সহায়তায় এগিয়ে আসবে। এজন্য তথ্য এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্ভাবনী অনুদানের প্রকল্প ও পুলিশ সদর দফতরে আবেদন করেছেন সাদ্দাম। 

সাদ্দাম জানালেন, অ্যাপটির ডেভেলপের কাজ শেষ। এখন সার্ভার এন্ডের কাজ বাকি রয়েছে। সার্ভার এন্ডের কাজটির জন্য বেশ বড় অংকের টাকার প্রয়োজন। পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার মতো লাগবে। টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেলে আর অনুদান পেলে তিনি অ্যাপটি গুগল প্লেসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় তুলে দিতে পারবেন। তিনি আশাবাদী, আইসিটি বিভাগ থেকে অনুদান পেলে তিনি সার্ভার এন্ডের কাজটি শুরু করতে পারবেন। 

যেভাবে কাজ করবে অ্যাপটি:

অ্যাপটি প্রথমে স্মার্টফোনে ইন্সটল করতে হবে। এর দুটি অংশ। একটা হচ্ছে ক্লায়েন্ট বা ইউজার অ্যাপ, যা ব্যবহারকারীর স্মার্টফোনে থাকবে। আরেকটি হচ্ছে সার্ভার অ্যাপ বা নোটিফিকেশন রিসিভার অ্যাপ, যেটি পুলিশের কাছে বা পুলিশ স্টেশনে থাকবে। এরপর অ্যাপটি এনাবল (সক্রিয়) করতে হবে। নির্দিষ্ট বক্সে টিক চিহ্ন দিয়ে অ্যাপটি সক্রিয় রাখতে হবে। সেবা পাওয়ার জন্য অ্যাপসটিকে সব সময় সক্রিয় রাখতে হবে যাতে করে যেকোনও বিপদের সময় নির্দিষ্ট পাওয়ার বাটনটি পরপর চার বার (প্রেস) করার সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ পুলিশ স্টেশনে প্রয়োজনীয় তথ্যসহ বার্তা (নোটিফিকেশন) পৌঁছে যাবে।

সাদ্দাম হোসেন

বিপদে পড়লে বা সন্ত্রাসীদের আক্রমণের শিকার হলে আক্রান্ত ব্যক্তি তার কাছে মোবাইল ফোনে থাকা ‘সেলফ প্রোটেক্ট’ অ্যাপের নির্দিষ্ট বাটনটি চাপলে অ্যাপটি প্রথমে ব্যক্তির সবচেয়ে কাছের পুলিশ স্টেশনটির অ্যাপ খুঁজে বের করবে। তারপর জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ স্টেশনের সার্ভারে জানাবে। ব্যবহারকারী যে এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন সেখানকার আশেপাশের শব্দ ও ছবি ধারণ করে পুলিশ স্টেশনে পাঠাবে অ্যাপটি যাতে আক্রান্ত ব্যক্তির সাহায্যার্থে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে। পুলিশ স্টেশনের অ্যাপের সঙ্গে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছেও একই বার্তা মোবাইলে পৌঁছে যাবে টেক্সট মেসেজ আকারে।সার্ভারে পৌঁছানোর পর সংশ্লিষ্ট থানায় দায়িত্বরত নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মকর্তার মোবাইল নম্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির নোটিফিকেশনটি টেক্সট মেসেজ আকারে পৌঁছে যাবে।

অ্যাপটি ব্যবহার করতে ব্যবহারকারীর কোনও ইন্টারনেট সংযোগ বা ডাটা অন থাকার প্রয়োজন নেই। ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকলেও জিপিএস চালু থাকার কারণে সার্ভিস প্রোভাইডার বা মোবাইল অপারেটরের সাহায্যে বার্তাটি পুলিশ স্টেশনে পৌঁছবে। তবে সার্ভার অ্যাপ্লিকেশন বা পুলিশের কাছে থাকা অ্যাপে ইন্টারনেট সংযোগ থাকতে হবে, যেন ব্যবহারকারী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রয়োজনীয় তথ্যসমৃদ্ধ বার্তাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার স্থানটি গুগল ম্যাপে দেখে শনাক্ত করা যায়।

আক্রান্ত ব্যক্তি একবার নির্দিষ্ট বাটন প্রেস করার মাধ্যমে যেভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য পুলিশের কাছে পৌঁছে যাবে তেমনি ছিনতাইকারীরা ওই ব্যক্তির হ্যান্ডসেট থেকে সিম পরিবর্তন করলেও নির্দিষ্ট সময় পরপর ছিনতাইকারীর অবস্থানের তথ্য নিকটস্থ পুলিশ স্টেশনের সার্ভারে আসতে থাকবে। স্মার্টফোন ছাড়া সাধারণ ফিচার ফোনগুলোর জন্য সেটআপ টেক্সট অপশন থাকবে, যাতে করে টেক্সটটি নির্দিষ্ট এসএমএস সার্ভার নম্বরের মাধ্যমে পুলিশের সার্ভারে পৌঁছে যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের তুলনায় ফিচার ফোন ব্যবহারকারীরা একটু দেরিতে সেবা পাবেন। অ্যাপটি ডেভেলপ করা হয়েছে অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের জন্য। এর পাশাপাশি উইন্ডোজ আর আইওএসের জন্যও অ্যাপটি ডেভেলপ করার কাজ চলছে।

সাদ্দাম জানালেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক সরকারিভাবে অ্যাপটি বাস্তবায়ন ও কার্যকরী করার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া পুলিশের সিআইডি হেড কোয়ার্টারের সাইবার ক্রাইম ইনফরমেশন সেন্টার থেকে অ্যাপটি পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে ইতিবাচক অনুমতি দিয়েছে। সরকারের চূড়ান্ত অনুমতি সাপেক্ষে অ্যাপটি মার্কেট প্লেসে আনা হবে।

/এইচএএইচ/টিএন/

আরও পড়ুন: আইন প্রণয়নে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধান বিচারপতির

 

লাইভ

টপ