বাবার শেষ নিঃশ্বাসের উত্তাপ এখনও পাই: মোহাম্মদ নাসিম

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৭:১৩, নভেম্বর ০৩, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৬, নভেম্বর ০৩, ২০১৬

বক্তব্য রাখছেন মোহাম্মদ নাসিম

জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে নিজের বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জাতীয় চার নেতার একজন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর ছেলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন,‘১৯৮০ সালে আমি কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলাম। যে কক্ষে আমার পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল, সেই কক্ষেই আমি বন্দি ছিলাম। চার নেতার রক্তের দাগ এখনও মুছেনি। আমার পিতার শেষ নিঃশ্বাসের উত্তাপ এখনও পাই। পিতার মুখ শেষবারের মতো দেখতে পারিনি।’

বৃহস্পতিবার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে জাতীয় চার নেতার স্মৃতি নিয়ে আয়োজিত ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মহাপ্রাণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন,‘জাতীয় চার নেতা জীবনেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন, মরণেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে বেঈমানি করে মীর জাফর বাংলার স্বাধীনতার সূর্যকে অস্তমিত করেছিলেন। যা ১৬ ডিসেম্বর বাংলার মাটিতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ফিরে এসেছিল। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তার নির্দেশনায় চার নেতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই সময় চার জনের সঙ্গে ছিল বিশ্বাসঘাতক মোশতাক। একাত্তর সালেও সে বেঈমানি করার চেষ্টা করেছিল। পাকিস্তানিদের সঙ্গে আঁতাত করার চেষ্টা করেছিল। জাতীয় চার নেতার বিচক্ষণতা, দূরদর্শীতার কারণে সে ব্যর্থ হয়েছিল।

মৃত্যুর পর বাবার মুখ শেষবারের মতো দেখার সুযোগ না পেলেও দুঃখ নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘পিতার মুখ শেষবারের মতো দেখতে পারিনি। আমি তখন রাজনীতি করতাম। আমাকে পেলে তখন মেরে ফেলা হতো। কিন্তু আমি গর্ব ও অহঙ্কারের সঙ্গে বলতে পারি, আমি মোশতাকের মতো বেঈমানের সন্তান নই। আমার পিতা জীবন দিয়েছেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করেননি।’

এর আগে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে ডিআইজির দায়িত্বে থাকা কাজী আব্দুল আওয়ালের ছেলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল হত্যাকাণ্ডের সেই ভয়াল রাতের বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘‘রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে আমাদের বাসার টেলিফোনে কল আসে। আমরা থাকতাম দ্বিতীয় তলায়। নিচতলায় ছিল ফোন। আমি ফোন রিসিভ করি। তখনকার আইজি প্রিজন নুরুজ্জামান সাহেব বাবার সঙ্গে কথা বলতে চান। এরপর বাবা আর ঘুমাননি। কাপড় পড়ে বেরিয়ে গেলেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কি হয়েছে। বাবা জানিয়েছিলেন, ‘আইজি সাহেব ডেকেছেন। অফিসের কাজে যেতে হবে।’ পরদিন সকালে কয়েদিসহ কয়েকজন আমাদের বাসায় আসল। তাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, চার নেতাকে মেরে ফেলা হয়েছে।’

হাবিবুল আউয়াল তার বাবার বরাত দিয়ে বলেন, ‘ওইদিন সেনা সদস্যরা বারবার জানতে চাচ্ছিল, চারজন কোথায়। জেল কর্তৃপক্ষ কি দরকার জানতে চাইলে বলে, শ্যুট করবো। এই শুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সম্ভব হয়নি। অবশেষে জেল থেকে বলা হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলি। তখনকার সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন মোশতাক। তার সঙ্গে আইজি প্রিজন কথা বললে তিনি বলেন, ওরা মারতে গেছে মারুক আপনি কি করবেন।’’

চার জনকে এক কক্ষে নিয়ে এসে ব্রাশ ফায়ার করা হয় জানান তিনি। তার বাবার কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, ব্রাশ ফায়ার করে সেনা সদস্যরা বেরিয়ে যাচ্ছিল। এরমধ্যে ভেতরের কক্ষ থেকে চার নেতার কেউ একজন কঁকিয়ে ওঠেন। শব্দ শুনে ওরা আবার ফিরে এসে সবাইকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন তার বক্তব্যে বলেন, ‘খুনি মোশতাক  ও জিয়া চক্রই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। এই চক্রই একমাত্র দায়ী। তারা বঙ্গবন্ধুসহ চার নেতাকে হত্যা করে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু তা তারা পারেনি। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা নির্মাণ করছেন।’

আলোচনা সভায় কারা অধিদফতরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেকার উদ্দিনের সভাপতিত্বে আরও উপস্থিত ছিলেন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম ম স আরেফিন সিদ্দিক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক, ঢাকার জেলা প্রশাসক মো. সালাউদ্দিন, কারা উপমহাপরিদর্শক কর্ণেল ইকবাল হোসেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী সেলিমসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও কারা কর্মকর্তারা।

এর আগে জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ও কারা মহাপরিদর্শক প্রথমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও পরে জাতীয় চার নেতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর তারা বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার কারা স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখেন।

উল্লেখ্য, জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারা স্মৃতি জাদুঘর’ ও ‘জাতীয় চার নেতা কারা স্মৃতি জাদুঘর’ ঘুরে দেখা ও দুর্লভ ১৪৫টি ছবি নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনী চলবে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রদর্শনী উপলক্ষে সকল দর্শনার্থী কারাগার অভ্যন্তরে প্রথমবারের মতো প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শনী উন্মুক্ত থাকবে। তিনটি সেশনে এ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১২টা প্রথম, দুপুর ১টা থেকে ৩টা দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সেশনে বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারবেন। কারাগারে প্রবেশ করতে জনপ্রতি টিকিটের দাম ১০০ টাকা।

আরজে/এপিএইচ/

লাইভ

টপ