behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

কর্মীরা বরখাস্ত, কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে!

চৌধুরী আকবর হোসেন১২:০৫, ডিসেম্বর ০২, ২০১৬

প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান

যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিমানটি তুর্কমেনিস্তানে জরুরি অবতরণ করে। এ ঘটনায় বিমানের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের গাফিলতির বিষয়টি উঠে আসে। এরপর সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বিমানের প্রকৌশল শাখার ছয়জনকে। তবে এই ছয়জন যাদের অধীনে কাজ করতেন তাদের কারও বিরুদ্ধেই এখন পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়া তদন্ত কমিটিতেও রয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন কর্মকর্তা।

তবে বেসামরিক বিমান পরিবহন রাশেদ খান মেনন মন্ত্রী বলছেন, ‘পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন আসলে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। সরকারপ্রধানের জীবনের প্রশ্ন জড়িত ছিল, সেহেতু কোনওভাবেই হালকা করে দেখার অবকাশ নেই। এ দায় দায়িত্ব যারই হোক তাকে নিতে হবে।’ 

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনের পাওয়ার পর বুধবার (৩০ নভেম্বর) ছয়জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা হলেন, ইঞ্জিনিয়ার অফিসার এস এম রোকনুজ্জামান, সামিউল হক, লুৎফর রহমান, মিলন চন্দ্র বিশ্বাস ও জাকির হোসেন এবং টেকনিশিয়ান সিদ্দিকুর রহমান।

বিমান সূত্রে জানা গেছে, ইঞ্জিনিয়ার অফিসাররা কাজ করেন বিমানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী দেবেশ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে। টেকনিশিয়ানরা কাজ করেন বিমানের চিফ অব টেকনিক্যাল ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে। সার্বিক তদারকির দায়িত্বে বিমানের পরিচালক (প্রকৌশল ও ম্যাটারিয়াল ম্যানেজমেন্ট) উইং কমান্ডার (অব.) আসাদুজ্জামান। এরমধ্যে ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী (প্রডাকশন) দেবেশ চৌধুরীসহ চারজন গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই ফ্লাইটে। যারা আশখাবাদ বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের পর বিমানটি ত্রুটি অনুসন্ধান করে মেরামত করেন।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় সোমবার (২৮ নভেম্বর) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিমানের চিফ অব টেকনিক্যাল ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ৪ সদস্যের কমিটির একটি কমিটি করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, চিফ অব ফ্লাইট সেফটি ক্যাপ্টেন সোয়েব চৌধুরী, ডেপুটি চিফ অব ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ হানিফ ও ম্যানেজার (কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স) নিরঞ্জন রায়।

সূত্র জানায়, যাদের দায়িত্ব ছিল ইঞ্জিনিয়ার অফিসার ও টেকনিশিয়ান তদারকি করে বিমান উড্ডয়নের আগে সার্বিক যান্ত্রিক পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তারাই রয়েছেন বিমানের তদন্ত কমিটিতে। সেই কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে ছয়জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বহাল রয়েছেন বিমানের প্রকৌশল ও ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট পরিচালক। ফলে বিমানের তদন্ত ও প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রী

মন্ত্রণালয়ে বিমান ও সিভিল এভিয়েশন উইংয়ের দায়িত্বে আছেন অতিরিক্ত সচিব আবুল হাসনাত মো. জিয়াউল হক। এ ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হলেও সেখানে নেই জিয়াউল হক। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও পর্যটন) স্বপন কুমার সরকারকে আহ্বায়ক করে ৪ সদস্যের  কমিটিতে আরও রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের প্রতিনিধি, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন) চৌধুরী এম জিয়াউল কবির, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেটারিয়াল মেনেজমেন্ট)। প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী সেই বিমানটি ত্রুটির কারণ খতিয়ে দেখে ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে। এছাড়া, ভবিষ্যতে জন্য সর্তকতামূলক সুপারিশও দিতে বলা হয়েছে।  

এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি অবসরে যাওয়া বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আসলে যাদের দায় আছে, তারা বরখাস্ত হননি। যখন ভিভিআইপি ফ্লাইট হবে তার আগেই সমন্বয় মিটিং হয় এসএসএফের সঙ্গে। মন্ত্রণালয়ে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, সিভিল এভিয়েশন এবং এসওপি মিটিং করা হয়। এসওপি অব ভিভিআইপি ফ্লাইট মানে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্ল্যান অব ভিভিআইপি ফ্লাইট। মিটিং এ এসওপি ধরে সবাইকে ব্রিফিং করা হয় কে কোন দায়িত্ব পালন করবে। এসএসএফের অধীনে চলে যাবে সেই উড়োজাহাজ। এসওপি অনুযায়ী নির্ধারণ হয় উড়োজাহাজ কোন সময়ে সার্ভিসিং হবে, চেকিং হবে, কখন উড্ডয়ন হবে সব কিছুই। ইঞ্জিনিয়ারিং টিমকে বিমানের পরিচালক (প্রকৌশল ও ম্যাটারিয়াল ম্যানেজমেন্ট) দায়িত্বে বণ্টন করে দেন। তাদের কাজ শেষে তিনি আবার ফিডব্যাক নেবেন এবং তিনি ফাইনালি সেটিসফায়েড হয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কনফার্ম করবেন। এই এসওপি ধরলেই বের হয়ে যাবে কে কোন দায়িত্বে ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটা সময় নিয়ম ছিল ভিভিআইপি ফ্লাইটে বিমানের এমডিও যাবেন। যদিও এখন এমডি যান না, এখন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন কর্মকর্তা ও গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়াররা যান।’

বিমানের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বিমানের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এসওপি অনুয়ায়ী প্রধান প্রকৌশলী, চিফ অব টেকনিক্যাল এবং পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেটারিয়াল মেনেজমেন্ট) কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। সাময়িকভাবে ধামা চাপা দেওয়া মতো তদন্ত হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে এভিয়েশন খাত বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর মডেলের উড়োজাহাজ আধুনিক ও নতুন। বলা হচ্ছে, নাট খুলে গেছে এটা কি করে সম্ভব। তদন্ত করা হচ্ছে, তদন্ত শেষে পুরো বিষয়টি হয়তো পরিষ্কার হবে। তবে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটা মেজর মেনটেইন্যান্স ফেইলিওর হয়েছে। এটার দায় বিমানের এড়ানো উচিত না।’

তবে বিমানের তদন্ত কমিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে-এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিমানের তদন্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী বলেন, ‘বুধবার বিমান যে তদন্ত রিপোর্ট দিয়েছে এটা একেবারেই প্রিলিমারি রিপোর্ট। এখন পর্যন্ত বিস্তারিত বিবরণ তারা দেয়নি। তারা (বিমান) বলেছে, শিগগির আরও কিছু রিপোর্ট দেবে। সবচেয়ে বড় তদন্ত করছে মন্ত্রণালয়। বিমান তো হচ্ছে এক পক্ষ। সে জায়গায় মন্ত্রণালয় এবং সিভিল এভিয়েশন, তারা নিরপেক্ষভাবে দেখার চেষ্টা করছে।’

কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি পত্রিকায় দেখলাম। এখন তারা কতখানি ইনভলবড্‌ বলা মুশকিল।’

বিমানের যে ছয়জনকে সাময়িক বরখাস্ত হলেও তাদের বিভাগীয় প্রধানদের বিরুদ্ধে ব্যব্স্থা নেওয়া হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমার মনে হয় এমন প্রশ্নের উত্তর সম্পূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন যখন আসবে তখন তার মধ্যে পাওয়া যাবে। তবে এটা ঠিক এ বিষয়টি অনেকের দৃষ্টি আর্কষণ করেছে। আমি আশা করি, বিমান তদন্তের ক্ষেত্রে কোনও ত্রুটি রাখবে না। তবে একটা কথা, মন্ত্রণালয় এবং সিভিল এভিয়েশন আলাদা দুটি তদন্ত করছে। আমি আশা করি তার মধ্য থেকে সবকিছু বেরিয়ে আসবে।’

আরও বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে মেনন বলেন, ‘আমার মনে হয় তাই। তবে যতক্ষণ তদন্ত প্রতিবেদন না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলা মুশকিল।’

যাদের অধীনে ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনিশিয়ানরা কাজ করেন তারাই বিমানে তদন্ত কমিটিতে রয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘এটা তো বিমান করেছে। আমাদের মন্ত্রণালয়ের তদন্ত দেখুক। তারপর দেখা যাবে। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবে।’

সোমবার জাতীয় সংসদে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ভ্রমণের জন্য এক্সিকিউটিভ এয়ারক্রাফট কেনা হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী। তবে আলাদা বিমান কিনলেই সমস্যার সমাধান মিলবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘না, না, এটা কোনও সমাধান না। যখনই আমাদের  ভিভিআইপি ফ্লাইট হয় সেটা রাষ্ট্রপতি হোক বা প্রধানমন্ত্রী হোক সেখানে স্বাভাবিকভাবে নরমাল রুট থেকে প্লেন তুলে নিতে হয়। এতে শিডিউলে অসুবিধা হয় এবং নিরাপত্তা সেভাবে নিশ্চিত করা যায় না। আমরা আশা করবো এ নিরাপত্তার ব্যবস্থা আরও ভালোভাবে নিতে। তবে প্রধানমন্ত্রী নিজের জন্য জনগণের পয়সায় প্লেন কেনার পক্ষে রাজি নাও হতে পারেন।’

দোষীদের কত দিনের মধ্যে শাস্তির আওতায় আনা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘কতদিন তো বলতে পারবো না। কারণ মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট আসবে  ৭ দিন পরে সিভিল এভিয়েশন ১৫ দিন সময় নিয়েছে। সুতরাং আমার মনে হয় যে, এ মাসের মধ্যে বাদ বাকিটা শেষ করবো।’

দোষীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আগে সিদ্ধান্ত হোক, তারপর দেখবেন।’

বিমানকে রিশাফল করা হবে বলেও জানান মন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আলোচনা তো হচ্ছে। এখনই সব বলা যাবে না, পরে বলি।’

প্রসঙ্গত, ২৭ নভেম্বর হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে গতিপথ পরিবর্তন করে তুর্কমিনিস্তানের রাজধানী আশখাবাদে জরুরি অবতরণ করে।

 /সিএ/এসটি/এফএস/

 

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ