Vision  ad on bangla Tribune

ধলেশ্বরীর বাতাসে দুর্গন্ধ, জীবন অতিষ্ঠ

শফিকুল ইসলাম, সাভার থেকে ফিরে১৪:৪৫, মার্চ ২১, ২০১৭

সরেজমিন সাভার ট্যানারি পল্লি-৩নানা সমস্যার কারণে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সাভারের ট্যানারি পল্লী সংলগ্ন হরিণধরা আর ঝাউচর গ্রামও একই সমস্যায় আক্রান্ত। পচা চামড়া আর বিভিন্ন বর্জ্যের দুর্গন্ধে সাভারের হেমায়েতপুরের গ্রাম দুটোর বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। প্রকল্পের উত্তর বা দক্ষিণ যেদিক দিয়েই বাতাস বয়ে যাক, দুর্গন্ধে  পাঁচ মিনিট থাকাই দায়! বছর খানেক ধরে চলছে এ অবস্থা। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, সব ট্যানারি কারখানা একসঙ্গে শতভাগ উৎপাদন শুরু করলে পরিস্থিতি রীতিমতো অসহনীয় হয়ে পড়বে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হরিণধরা গ্রামে নির্মিত সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কয়েকটি কারখানা উৎপাদন (ব্লু ওয়েট) শুরু করেছে। এসব কারখানার পরিত্যক্ত বর্জ্য শিল্পনগরীর একটি নির্দিষ্ট স্থানে খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্য থেকেই দুর্গন্ধ  ছড়াচ্ছে। এখনই এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের কোনও উপায় নেই বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ধলেশ্বরীর বাতাসে দুর্গন্ধ, জীবন অতিষ্ঠতবে ভবিষ্যতে এসব বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন প্রকল্পের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মাঈনুদ্দিন আহমেদ। তিনি আরও জানিয়েছেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য আমিনবাজারে ফেলার ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের সঙ্গে বিসিক কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

দেখা গেছে, ট্যানারি পল্লীর উত্তর ও দক্ষিণ পাশের সীমানা ঘেঁষে ফেলা হচ্ছে কঠিন বর্জ্য। একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে ট্যানারি পল্লীর ডাম্পিং স্টেশন তৈরির জন্য পাঁচ বিঘা খোলা জায়গা রাখা হয়েছে। কিন্তু এখনও সেখানে ডাম্পিং স্টেশন তৈরি হয়নি। সেটির চেহারা দাঁড়িয়েছে পুকুরের মতো। ট্যানারির বর্জ্যে পুকুর অনেকটাই ভরে গেছে। চামড়ার পরিত্যক্ত কঠিন বর্জ্য এবং ঝিল্লির অংশ গড়িয়ে পড়ছে পুকুরের পানিতে। অবশ্য সেটাকে পানি না বলাই ভালো। বর্জ্য মিশ্রিত পানি পরিণত হয়েছে ঘন তরল ময়লায়, যা থেকে ছড়াচ্ছে বীভৎস গন্ধ।

ধলেশ্বরীর বাতাসে দুর্গন্ধ, জীবন অতিষ্ঠরি পল্লীর উত্তর দিকে কিছুটা দূরে একেবারে ধলেশ্বরী নদীর পার ঘেঁষেও ফেলা হচ্ছে কঠিন বর্জ্য (পরিত্যক্ত চামড়া, কান, শিং ইত্যাদি)। ট্যানারির বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশ্রিত এসব বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীর পানিতে। ফলে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। আবার এখান থেকে বর্জ্যের টুকরা কুকুর ও কাক নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ফেলছে। সেগুলো পচেও দুর্গন্ধ ছাড়াচ্ছে।

একটি ট্যানারি কারখানার ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, ট্রাক থেকে লবণ মিশ্রিত কাঁচা চামড়া নামিয়ে ড্রামে তোলা হচ্ছে। ড্রামে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ শেষে কঠিন ও তরল বর্জ্য আলাদা করা হচ্ছে। ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় কারখানার কঠিন বর্জ্য ও ঝিল্লি ফেলা হচ্ছে পুকুরের চেহারার ওই খোলা জায়গায়। আর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি চালু না হওয়ায় তরল বর্জ্য বা ক্রোম পানি ফেলা হচ্ছে ধলেশ্বরী নদীতে।

সিইটিপির পশ্চিম পাশের দেয়াল ঘেঁষে ধলেশ্বরী নদী। ভাঙনের হাত থেকে ট্যানারি রক্ষার জন্য নদীর পারে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাঁধের ভেতর দিয়ে মোটা পাইপে করে ট্যানারির বিষাক্ত পানি ফেলা হচ্ছে নদীতে। ফলে নদীর মাছ মরে ভেসে উঠছে।

ধলেশ্বরীর বাতাসে দুর্গন্ধ, জীবন অতিষ্ঠবিশ্লেষকদের মতে, যে সমস্যার কারণে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরানো হচ্ছে, ঠিক একই সমস্যায় জর্জরিত সাভারের ট্যানারি পল্লীর আশেপাশের এলাকা। হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো বুড়িগঙ্গায় ফেলেছে বিষাক্ত পানি ও বর্জ্য। আর সাভার ট্যানারি পল্লীর বিষাক্ত পানি ফেলা হচ্ছে ধলেশ্বরী নদীতে। হাজারীবাগের মতো সাভারেও খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে বর্জ্য। যার দুর্গন্ধে ঝাউচর ও হরিণধরা গ্রামের মানুষের জীবন অতিষ্ঠ।

সাভার চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক আবদুল কাইয়ুম জানান, সরকারি অংশের কাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় সিইটিপি নির্মাণের কাজ ৮০ শতাংশ হয়েছে। তবে ডাম্পিং ইয়ার্ডসহ কিছু কাজ এখনও বাকি রয়েছে। সেগুলো দ্রুত শেষ করা হবে।

চামড়া শিল্পনগরীর দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে জমজম সিটি নামে একটি আবাসিক প্রকল্প। এ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে জমজম সিটি মাদ্রাসা, মসজিদ এবং গ্রাম। জমজম সিটির সীমানা প্রাচীর ঘেঁষেই সেই ডাম্পিং স্টেশন, যেটি এখন দেখতে অনেকটা পুকুরের মতো। ডাম্পিং স্টেশনের কারণে ভীষণ বিপদে পড়েছেন জমজম সিটি মাদ্রাসার শতাধিক ছাত্র এবং মসজিদের মুসল্লিরা। বর্জ্যের দুর্গন্ধে তাদের পক্ষে চলাফেরা করাই মুশকিল।

ধলেশ্বরীর বাতাসে দুর্গন্ধ, জীবন অতিষ্ঠজমজম সিটি মাদ্রাসার শিক্ষক আবু বকর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শুরু থেকেই  চামড়ার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে এখানে। মসজিদের মুসল্লি ও মাদ্রাসার ছাত্র সহ আমাদের সবার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি, থানায় অভিযোগ করেছি, বিসিককেও লিখিতভাবে জানিয়েছি। কিন্তু কোনও কাজ হয়নি। সবসময় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। উল্টো ট্যানারিতে যারা কাজ করছে, তারাই আমাদের হুমকি দিচ্ছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এর সভাপতি আবু নাসের খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরানোর মূল কারণ ছিল ওই এলাকার পরিবেশ রক্ষা করা। কিন্তু সাভারে ট্যানারি সরিয়েও পরিবেশের জন্য লাভ হয়নি। হাজারীবাগের মতো সাভারের পরিবেশও দূষিত হয়ে মানুষকে অতিষ্ট করে তুলেছে। এর প্রভাবে সেখানকার মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তারা এখন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে আছেন।

 ছবি: নাসিরুল ইসলাম।

/এসআই/এএআর/আপ-এসএনএইচ/

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ