যেসব কারণে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ৪১ প্রজাতির মাছ

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১১:৫৭, এপ্রিল ২১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২০, এপ্রিল ২১, ২০১৭

বিলুপ্ত প্রায় দেশি মাছ

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হাওরে গত কয়েকদিন ধরেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে ভেসে উঠছে। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট জেলার মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, ধান পচে হাওরের পানিতে অ্যামোনিয়া গ্যাস তৈরি হয়েছে। গ্যাসের জন্যই পানিতে অক্সিজেন কমে গেছে। এতেই মাছ মরে যাচ্ছে। তবে হাওর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্ভিদ পচে অ্যামোনিয়া তৈরি হয় না। অন্য কোনও কারণ আছে। সেগুলোকে খুঁজে বের করতে খুব দ্রুত বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতে হবে।

হাওরে প্রাথমিকভাবে চুন ছিটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। আপাতত এ ধরনের গবেষণার কোনও পরিকল্পনা জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নেই।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ নিয়ে কাজ করছেন। কেন্দ্রিয়ভাবে আমরা বিষয়টি গভীরভাবে মনিটর করছি। হাওরের মাছ মরার কারণ ও এর প্রতিকার থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় বের করতে তো কিছুটা সময় দিতে হবে।’

কৃষি ও চাষাবাদ ব্যবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে উজাড় হয়ে যাচ্ছে দেশি প্রজাতির কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, টেংরা, পুঁটি, ডারকা, মলা, ঢেলা, চেলা, শাল চোপরা, শৌল, বোয়াল, আইড়, ভ্যাদা, বুড়াল, বাইম, খলিসা, ফলি, চিংড়ি, মালান্দা, খরকাটি, গজার, শবেদা, চেং, টাকি, চিতল, গতা, পোয়া, বালিয়া, উপর চকুয়া, কাকিলাসহ প্রায় ৪১ প্রজাতির মাছ। গ্রামে এক সময় পৌষ-মাঘ মাসে পুকুর, খাল, ডোবা, ঘের থেকে দেশি মাছ ধরার ধুম পড়তো। এখন অনেক অনেক গ্রামে দেশীয় মাছ নেই বললেই চলে। শীতকাল ছাড়া বর্ষাকালে ধানি জমিতে কইয়া জাল, বড়শি ও চাই পেতে মাছ ধরার রীতিও হারিয়ে গেছে অনেক এলাকা থেকে। যারা একসময় পুকুর, খাল-বিল, ডোবা, নালায় মাছ ধরে পরিবারের চাহিদা পূরণ করতো তাদের অনেকেই এখন বাজার মাছ কিনতে বাধ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে ১৪ কারণে। এগুলো মধ্যে জলবায়ুর প্রভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কারেন্ট জালের অবৈধ ব্যবহার, ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহার, জলাশয় দূষণ, নদ-নদীর নব্যতা হ্রাস, উজানে বাধ নির্মাণ, নদী সংশ্লিষ্ট খাল-বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, ডোবা ও জলাশয় ভরাট করা, মা মাছের আবাসস্থলের অভাব, মা মাছের ডিম ছাড়ার আগেই ধরে ফেলা, ডোবা-নালা পুকুর ছেঁকে মাছ ধরা, বিদেশি রাক্ষুসে মাছের চাষ করা ও মাছের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটার কারণ উল্লেখযাগ্য।

রাজধানীর শান্তিনগর বাজারের মাছ ব্যবসায়ী শরীয়তপুরের আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৫-১৬ বছর আগেও মাছ কিনে খাওয়ার তেমন রেওয়াজ ছিল না আমার এলাকায়। কেনার মধ্যে শুধু ইলিশ মাছ কেনার কথাই মনে পড়ে। মাছের প্রয়োজন হলে বাড়ির সামনে খালে বা নদীতে চলে যেতো। খালে, পুকুরে তখন এত মাছ ছিল যে, কেউ খালি হাতে নেমেও হাতিয়ে মাছ ধরতে পারতো।’

এ প্রসঙ্গে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন মুফতি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাড়িতে দুটি পুকুর রয়েছে। তার জন্মের পর থেকে এ পুকুর দুটি দেখছেন। ২০ বছর আগেও পুকুর থেকে সারা বছর বাড়ির সবাই মাছ ধরতো। এ ছাড়া শীতের মৌসুমে পুকুর আউড়ান হতো (অনেক মানুষ একত্রে পুকুরে নেমে পানি ঘোলা করা। ঘোলা পানি খেয়ে মাছ দুর্বল হয়ে ওপরে ভেসে উঠে। এর পর সহজে সেসব মাছ ধরা হয়)। এরপর জাল, ডালা, খুচন নিয়ে মাছ ধরতে নেমে যেত। কেউ শুধু হাত দিয়ে হাতিয়ে মাছ ধরত। শোল, গজার, টাকি, চিংড়ি, শিং, কই, টেংরা, পাবদা, ফলিসহ নানা জাতের মাছ ধরা পড়তো। তবে এখন পুকুর দুটিতে চেলা, পুঁটি, বায়লা ছাড়া কোনও মাছ নেই।

পিরোজপুরের নাজিরপুরের কলার দোয়ানিয়া গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আসলাম মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে টেলিফোনে জানান, স্থানীয় কলার দোয়ানিয়া বাজারেও হাটের দিন দেশি প্রজাতির অনেক মাছ উঠতো। এখন আর সেই মাছ ওঠে না। বাজার ভরা থাকে চাষের পাঙ্গাস ও তেলাপিয়ায়। মাঝে মধ্যে জাটকা ওঠে।

দেশি মাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ইরি ধান ও অন্যান্য সবজিতে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের কারণে এটা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ বলেন, ‘বিভিন্ন কারণেই দেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। যে মাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে বলে বলা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে অনেক প্রজাতির মাছ রক্ষঅ করতে গবেষণা চলছে। পাবদা, টেংরা, বোয়াল, আইড় মাছের চাষ হচ্ছে। পাঙ্গাসের চাষ হচ্ছে আগে থেকেই। কৈ মাছেরও চাষ হচ্ছে। আরও গবেষণা হবে। দেশি নানা প্রজাতির মাছ রক্ষায় মৎস্য অধিদফত প্রতিবছরই মৎস্য মেলার আয়োজন করে। একই কর্মসূচি জেলা উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’   

/এসআই/এসটি/

আরও পড়ুন: মাছের মড়কের কারণ অনুসন্ধানে সুনামগঞ্জে প্রতিনিধি দল

লাইভ

টপ