Vision  ad on bangla Tribune

শিশু ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম খাচ্ছে ওসিসি

জাকিয়া আহমেদ০৭:৪৫, মে ১৯, ২০১৭

শিশু নির্যাতন

বেড়েই চলেছে শিশু ধর্ষণের ঘটনা। প্রতিদিনই কোনও না কোনও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে ভর্তি হচ্ছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি)। ওসিসি’র তথ্যানুযায়ী, এসব শিশুর বয়স ছয় বছর থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। গত কয়েক দিনে এই সংখ্যা আরও বেড়ে যাওয়ায় তাদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে ওসিসি।

ওসিসির সমন্বয়ক ডা. বিলকিস বেগমের মতে, শিশুরাই ধর্ষণের সবচেয়ে বড় শিকার। কারণ তারা কিছুই বলতে পারে না, অসহায় থাকে ধর্ষণের সময়। ধর্ষককে ভয়ও পায়।

ওসিসিতে সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে ভর্তি থাকা ছয় শিশুর প্রত্যেকেই ধর্ষণের শিকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ের মতো শিশু ধর্ষণের এই পরিস্থিতি তারা আগে দেখেননি। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় এবং ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহারের ফলেই আশঙ্কাজনকভাবে শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে।

ওসিসি ও ভিকটিমদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিশুরা কেবল ঘরের বাইরেই নয়, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নিজ ঘরে, নিকটাত্মীয়-স্বজনদের হাত থেকেও রক্ষা পাচ্ছে না তারা।

ওসিসিতে ভর্তি হওয়া ভাটারা থানার ১৪ বছরের এক কিশোরী এবং সাভারের ১৫ বছরের আরেক কিশোরী জানিয়েছে, তারা এই নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়েছে নিকটাত্মীয়দের দ্বারা। অন্যদিকে, গত মঙ্গলবার (১৫ মে) তিন বছরের এক শিশু ঘরের বাইরে খেলতে গিয়ে পাশের বাড়ির চাচা সম্পর্কীয় এক লম্পটের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার থেকে জানা যায়, গত দুই সপ্তাহে শিশু ধর্ষণ আগের তুলনায় আরও বেড়েছে। প্রতিদিন সাত থেকে আট জন ধর্ষণের শিকার হয়ে ভর্তি হয়েছে ওসিসিতে। গত ১৫ মে সাত জন ও ১৬ মে আট শিশুকে ওসিসি থেকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। এরমধ্যে তিন বছরের একটি শিশুও রয়েছে। আর বুধবার (১৭ মে) ওসিসিতে ভর্তি হয়েছে ছয় শিশু, এরা প্রত্যেকেই ধর্ষণের শিকার।

মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ১৩ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৫ জন, মার্চ ও এপ্রিলে ২২ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় বরিশালে এক শিশু মারাও গেছে।

সম্প্রতি ধর্ষণের হার বেড়েছে মন্তব্য করে ওসিসির সমন্বয়ক ডা. বিলকিস বেগম বলেন, ‘ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতার কারণে এবং ধর্ষণের ঘটনায় বিচার না হওয়ায় শিশু ধর্ষণের হার বেড়েছে। অপরাধীরা ধরেই নিয়েছে এর কোনও বিচার হয় না। আর যেখানে অপরাধের কোনও বিচার নেই, সেখানে অপরাধ বাড়বেই। শিশুরা ধর্ষণের বড় শিকার। কারণ তারা কিছুই বলতে পারে না, অসহায় থাকে ধর্ষণের সময়।’

ডা.বিলকিস বেগম আরও  বলেন, ‘মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে এটা শুনতে কোনও অভিভাবকেরই ভালো লাগে না, একইসঙ্গে সমাজ এখনও ভিকটিমদের ব্যাপারে সংবেদনশীল নয়। আত্মীয়-স্বজনসহ পুরো সমাজ তার দিকেই আঙুল তুলবে, এ ভয়েই অনেক পরিবার ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ করে না। এর ফলে অপরাধীদের কথাও প্রকাশ হয় না। আবার অনেক সময় মামলা করলেও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অপরাধীদের ঠিকমতো বিচার হয় না।’

ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার নিজ উদ্যোগে ডিএনএ টেস্ট, ফরেনসিক টেস্ট, মামলা করা, সাক্ষী জোগাড় করাসহ সব কিছু করলেও কোথায় গিয়ে যেন মামলাগুলো আটকে যায়। হতাশ হয়ে ‘এটাই বুঝি না’ বলে আক্ষেপও করেন ডা. বিলকিস বেগম।

দেশে শিশু নির্যাতনের আইন থাকলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা বেড়ে চলেছে বলে মন্তব্য করেন এই চিকিৎসক।

শিশু ধর্ষণের ঘটনার বর্তমান চিত্র পরিবর্তনে আইনের সঠিক প্রয়োগ, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও নৈতিক অবক্ষয় রোধে বিভিন্ন পর্যায়ে কাউন্সেলিং এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম নেওয়ার সুপারিশ তুলে ধরেন মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার সিগমা হুদা।

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, অপরাধীরা মনে করে শিশুদের সহজেই কাবু করা যায়। তারা সাক্ষী হিসেবে জোরালো না। আর শিশুদেরকে ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা যায়।

মানসিক বিকৃতির কারণ হিসেবে মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতাকে দায়ী করে এলিনা খান। তিনি বলেন, সবার হাতে হাতে এখন ইন্টারনেটসহ মোবাইল ফোন। এর সহজলভ্যতার কারণে মনুষ্যত্ব হারিয়ে বোধশূন্য হয়ে পড়ছে সমাজের একটি অংশ।

ইন্টারনেট ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘অ্যাডাল্ট মুভি যখন কেউ দেখতে চাইবে তখন সেখানে যদি বাধা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা যায়, তাহলে কিছুটা হলেও এই মানসিক বিকৃতি কমে আসবে। কিছুদিন আগেও আইনজীবী হিসেবে আমরা শিশু ধর্ষণের এত ঘটনা দেখিনি, এ ধরনের বিকৃতি আগে খুব কমই ছিল।’

সরকারের উচিত মোবাইলফোন কোম্পানির সঙ্গে অ্যাডাল্ট ছবির বেলায় পে-চ্যানেল বা এই ধরনের কিছু করা। ইন্টারনেট এক্সেসকে একেবারেই নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা উচিত। নৈতিকতা মূল্যবোধের অভাবও এ জন্য দায়ী। স্কুল-কলেজ-বাড়িতে মর্যাদাবোধের বিষয়ে যদি যথাযথ শিক্ষা না দেওয়া যায় তাহলে নৈতিকতাহীন প্রজন্মই গড়ে উঠবে। এ ধরনের অবক্ষয় হবেই; যার কারণেই বাবার কাছে সন্তানও নিরাপদ নয় এখন।

/এসএমএ/টিএন/

লাইভ

টপ