Vision  ad on bangla Tribune

সুলভ মূল্যে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট বিক্রি করছে মালিহা গ্রুপ (ভিডিও)!

রশিদ আল রুহানী১০:০৫, জুন ১৯, ২০১৭

রাজধানীর মধ্যবাড্ডার লিংক রোডে মালিহা গ্রুপের অফিস

‘সার্টিফিকেট লাগবে? একটি সার্টিফিকেট বদলে দেবে আপনার জীবন। দীর্ঘদিন পড়াশোনা বাদ দিয়েছেন? কোনও সমস্যা নেই। দেশের যে কোনও শিক্ষাবোর্ডের মাধ্যমে যে কোনও শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের অরিজিনাল সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। এছাড়া কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের ডিপ্লোমা কোর্স, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনও সাবজেক্টের অরিজিনাল সার্টিফিকেটও দেওয়া হয় সুলভ মূল্যে।’

আড়ালে-আবডালে নয়, জনসাধারণের মোবাইল ফোনে মেসেজ দিয়ে এমনকি রাস্তার পাশের দেয়ালে দেয়ালে এমন চটকদার কথার বিজ্ঞাপন দিয়ে অবৈধ সার্টিফিকেট বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে মালিহা গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের কয়েকটি ওয়েবসাইট আর ফেসবুক পেজও রয়েছে। যেখানে তারা নিজেদের সম্পর্কে প্রচারণা চালাচ্ছে নিয়মিত।

এভাবে সার্টিফিকেট বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বিশ্ববিদ্

মালিহা গ্রুপের বিজ্ঞাপন

যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘এটা মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। দেশে এমন অনেক প্রতারক চক্র রয়েছে বলে আমাদের কাছে অভিযোগ আছে। ইতোমধ্যে আমরা কয়েকজনকে ধরেছি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। আরও খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে, হদিস পেলেই তাদের ধরে আইনের আওতায় আনা হবে।’

নিজেও মোবাইল ফোনে সার্টিফিকেট কেনার আমন্ত্রণ পেয়েছেন জানিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘বেশিরভাগ মেসেজ বিদেশ থেকে দেওয়া হয়। এ কারণে ফোন নম্বর ট্র্যাক করে  তাদের পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’ তবে প্রতিষ্ঠানটির নাম-পরিচয় জানার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান তিনি।

বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদক ওই প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে গিয়ে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অনুসন্ধান চালিয়েছেন। রাজধানীর মধ্যবাড্ডার লিংক রোডে প্রাণ-আরএফএল সেন্টারের বিপরীতে গ-১০৩ নং চারতলা ভবনের তিনতলায় বড় করে সাইনবোর্ডে লেখা মালিহা ট্রাভেল লি.। ঠিক পাশেই লেখা এডুকেশন হেল্পলাইন লি.। মূলত তারা মালিহা গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

সনদ দেওয়ার বিজ্ঞাপন

সার্টিফিকেট দেওয়াসহ এই অফিসে মালিহা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মালিহা রিয়েল স্টেট, মালিহা ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস নামে বেশ কয়েকটি প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসে আছেন। ভবনের দোতলায় একটি বড় কক্ষে পৃথকভাবে পার্টিশান দিয়ে তিনটি ডেস্ক বসিয়ে ক্রেতাদের ভোলাচ্ছেন কয়েকজন তরুণী।

সানজিদা নামে এডুকেশন হেল্পলাইনের কাস্টমার সার্ভিস প্রতিনিধির দাবি, বাংলাদেশের যে কোনও শিক্ষাবোর্ডের অধীনে পেছনের যে কোনও শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক, কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে নিডস ও নিডাসা নামক দুটি ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট দেয়। নিডস ও নিডাসা ডিপ্লোমা কোর্স সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কিছুই বলতে পারেননি। এছাড়া উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনও বিষয়ের সার্টিফিকেট দেওয়া হয় এখান থেকেই।

এমনকি দেশের পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সাউদার্ন, পিপলস, আমেরিকা বাংলাদেশ, এশিয়ান এবং উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনও বিভাগের সার্টিফিকেটও দেওয়া হয়। ইউজিসি গত সপ্তাহে ১৬ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হতে ও তাদের সম্পর্কে সতর্ক করতে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকা বাংলাদেশ ও সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির নামও রয়েছে।

এসএসসি’র সার্টিফিকেট ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দুটি ডিপ্লোমা, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনও বিষয়ের সার্টিফিকেটের দাম ৪০ হাজার টাকা। তবে ওই পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটের দামের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। সাউদার্ন, উত্তরা ও আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে সার্টিফিকেট পেতে গুনতে হবে ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে এশিয়ান ও পিপলস থেকে নিতে দেড় লাখ টাকা লাগে বলে দাবি করেন সার্টিফিকেট বাণিজ্যে জড়িত প্রতিষ্ঠানটির ওই তরুণী।

তবে অন্যসব সার্টিফিকেট এভাবে পাওয়া গেলেও এইচএসসি’র সার্টিফিকেট টাকা দিলেও পাওয়া যায় না। এজন্য রয়েছে ভিন্ন ব্যবস্থা। কোনও কলেজে চলতি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সার্টিফিকেট প্রত্যাশী প্রার্থীকে ভর্তি করানো হয়। তবে সরাসরি দ্বিতীয় বর্ষে। যেন ভর্তি হওয়ার এক বছরের পরই ওই পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় বসতে পারে। সেক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠান শর্ট সাজেশন দেয় ওই শিক্ষার্থীকে। বাড়িতে বসে বই মুখস্থ করে পরীক্ষা দিলেই শতভাগ পাশের নিশ্চয়তা দেওয়া হয় বলেও দাবি করলেন এডুকেশন হেল্পলাইনের আরেক কাস্টমার সার্ভিস প্রতিনিধি ঊর্মি।

টাকা কীভাবে পরিশোধ করতে হয় জানতে চাইলে সানজিদা বলেন, ‘সার্টিফিকেট নিতে হলে নির্ধারিত মোট মূল্যের অগ্রিম অর্ধেক টাকা পরিশোধ করতে হয়। অর্ডার করার অন্তত ১ মাস পরে প্রতিষ্ঠানের মালিক নিজেই ক্রেতাকে মোবাইল ফোনে অফিসে ডেকে বাকি টাকা নিয়ে তা সরবরাহ করেন। টাকা নেওয়ার আগে ওই সার্টিফিকেট স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ঢুকে সেটি ভেরিফাই করিয়েও ক্রেতাকে দেখিয়ে দেন।’

মাধ্যমিকের অরিজিনাল সার্টিফিকেট এ প্রতিষ্ঠান দেয় জানালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা অসম্ভব! আর এটা তো রীতিমতো প্রতারণা।’

মালিহা গ্রুপ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কার্ড

কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠান দাবি করছে, সার্টিফিকেট অরিজিনাল দেওয়া হয়। তারা শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইটে সার্টিফিকেট ভেরিফাই করেই কেবল ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা নেয়। এমন তথ্য জানানোর পর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, ‘তাদের দাবি অনুযায়ী এটা অসম্ভব। কারণ, একজন শিক্ষার্থী নিয়মানুযায়ী দুই বছর পড়াশোনা করে পরীক্ষা দেবে, তারপর তার রেজাল্ট বের হবে। রেজাল্টের পর একমাত্র আমরাই সার্টিফিকেট দিয়ে থাকি। তবুও শিক্ষাবোর্ডের কোনও কর্মকর্তা এই সার্টিফিকেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিনা এমন সঠিক অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেবো। আপনারা আমাদেরকে সহযোগিতা করুন।’

উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি না হয়েই কীভাবে পরীক্ষা দিতে পারে এ সঙ্গে অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এটাও সম্ভব নয়। কারণ এখন আমরা অনলাইনে আবেদন নেই। কোন কলেজে কোন শিক্ষার্থীরা ভর্তি হলো তার তালিকা আমাদের কাছে থাকে। যে ভর্তি হয়নি তার পরীক্ষা দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। এছাড়া বছরের মাঝামাঝিও কেউ ভর্তি হতে পারে না।’

এডুকেশন হেল্পলাইনের কাস্টমার সার্ভিস অফিসার সানজিদা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সার্টিফিকেট বেচাকেনায় মৌসুমি ছাড়েরও ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে ঈদ উপলক্ষে চলছে ছাড়। ছাড়ের মৌসুম শেষ হবে ঈদের আগেই (২২ জুন)। ঈদের পর থেকে প্রতি সার্টিফিকেটে ২০ হাজার টাকা বেড়ে যাবে বলেও জানান তিনি।

এডুকেশন হেল্প লাইনের সনদ বিক্রি প্রতিনিধি সানজিদা ও হ্যাপী

শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মাধ্যমে শিক্ষাবোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট পায়, কিন্তু আপনারা সেটা কীভাবে দেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে হ্যাপী নামে অন্য তরুণী বলেছেন, ‘আমরা মূলত থার্ড পার্টি হিসেবে কাজ করি। যেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা সার্টিফিকেট দেন, তাদের সঙ্গে আমাদের স্যারের চুক্তি আছে। তিনি সেই চুক্তি অনুযায়ীই সার্টিফিকেট করিয়ে দিতে পারেন। যেমন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের চুক্তি আছে।’

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মোকাদ্দেম হোসেনের কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেউ যদি সার্টিফিকেট দিতে পারবে এমন দাবি করে, প্লিজ আপনি নিজে ওই সার্টিফিকেট একটা কিনুন। প্রয়োজনে আমি টাকা দেবো। দেখতে চাই তারা আসলেই কীভাবে দেয়। এটা যদি সত্যি হয়, প্লিজ তাদের ঠিকানা দেন। আমি নিজে কথা দিচ্ছি, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবো।’

এমন অবৈধ্য বাণিজ্য করছেন আপনারা, এতে কোনও সমস্যা হয় না? জানতে চাইলে কাস্টমার সার্ভিস প্রতিনিধি সানজিদা বলেন, ‘আমাদের স্যারের অনেক লম্বা হাত। সমস্যা হবে কী করে? সমস্যা যেন না হয় সেই ব্যবস্থা করাই আছে। তা না হলে কি ১২ বছর ধরে এখানে অফিস নিয়ে কাজ করতে পারি?’

প্রতিষ্ঠানটির কাছে পাওয়া ভিজিটিং কার্ডে মালিহা গ্রুপের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও মালিকের নাম পরিচয় জানা গেছে। মালিক নিজের পরিচয় উল্লেখ করেছেন তিনি সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড. মো. জিয়াউর রহমান। তবে তাকে অফিসে পাওয়া যায়নি।

মালিহা গ্রুপের অফিসের ভেতরে

অফিসটির তরুণী কর্মীরা জানান, জিয়াউর রহমান অফিসে খুব কমই আসেন। কখন আসেন তাও তারা জানেন না। তিনি খুবই ব্যস্ত মানুষ, তার অনেক ব্যবসা আছে, আবার তিনি সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামেও অফিস করেন। ভিজিটিং কার্ডে তার যে ফোন নম্বর দেওয়া, সেখানে কল করলে রিসিভ করেন ওই অফিসের তরুণী কর্মীরাই। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির অন্য একটি ভিজিটিং কার্ডে মালিক জিয়াউর রহমানের নাম ভিন্ন। সেখানে তার পরিচয় উল্লেখ করতে গিয়ে লেখা হয়েছে ড. সোহেল!

এদিকে চট্টগ্রামের অবস্থিত সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির  রেজিস্ট্রার ড. মনতাজুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের কোনও পদ নেই। এছাড়া জিয়াউর রহমান নামেও কেউ এখানে কর্মরত নেই।’

সার্টিফিকেট বাণিজ্যের বিষয়ে ড. মনতাজুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একসময় সাউদার্ন-এর অনেক শাখা-ক্যাম্পাস ছিল। সরকার সেই শাখাগুলো বন্ধ করে দিলে আমাদের এখন বর্তমান বৈধভাবে চট্টগ্রামেই কার্যক্রম চলছে। ওইসব শাখা ক্যাম্পাসগুলোর কারণে সাউদার্নের অনেক ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। এমনকি এখনও হচ্ছে। ফলে আমরা খুবই সতর্ক, কোনও অবৈধ কাজ ও অনিয়ম যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে না হয় সেদিকে খেয়াল রেখেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছি।’

সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির  রেজিস্ট্রার আরও  বলেন, ‘সাউদার্নের নাম ভাঙিয়ে যিনি এই অবৈধ ব্যবসা করছেন তার পরিচয় ও ঠিকানা সঠিকভাবে পেলে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।’ ঠিকানা ও পরিচয় দিয়ে সহযোগিতা করতেও অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

/আরএআর/ জেএইচ/

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ