নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিএনপির যে প্রস্তুতি

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ০৯:৫৩, জুলাই ১৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৯, জুলাই ১৮, ২০১৭

নির্বাচন কমিশনএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেবে বিএনপি। ইতোমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু করার নির্দেশনা খালেদা জিয়া দিয়ে গেছেন। আগামী ৩০ আগস্ট নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংলাপকে সামনে রেখে প্রস্তাব তৈরির গবেষণার কাজ চলছে। এক্ষেত্রে ৩০ আগস্টের আগে খালেদা জিয়া দেশে ফিরলে তার উপস্থিতিতে বা না এলে প্রস্তাবগুলো বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে দেখিয়ে সম্মতি গ্রহণের পর চূড়ান্ত করবে বিএনপি। দলটির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে এসব সম্ভাবনার কথা জানান।

এদিকে, ইসি ঘোষিত আগামী নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে মঙ্গলবার (১৮ জুলাই) রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে বিএনপি। এ নিয়ে সোমবার চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির সিনিয়র সদস্যদের একটি জরুরি বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকেই সংবাদ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত হয়। বিএনপি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার নির্দেশ অনুযায়ী সিনিয়র নেতারা একসঙ্গে আলোচনা করেই সংবাদ সম্মেলনের বিষয়টি ঠিক করেন।

ইসির প্রস্তাব তৈরির গবেষণা শুরু হয়েছে

বিএনপির নির্ভরযোগ্য একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানান, আগামী ৩০ আগস্ট নির্বাচন কমিশনের সংলাপে অংশ নিতে পারে বিএনপি। তবে বরাবরই দলটি বলে আসছে, নির্বাচন কমিশনের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকার। ওই সরকারব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে একাদশ জাতীয় নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। সেক্ষেত্রে লন্ডন থেকে ফিরে সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেবেন খালেদা জিয়া।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ একজন সদস্য জানান, গত ১৩ জুলাই চেয়ারপারসনের বাসভবন ফিরোজায় অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেই ইসিকে দেওয়ার জন্য প্রস্তাব তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন খালেদা জিয়া। দলীয় প্রধান নির্দেশ দিয়ে গেছেন, কী কী প্রস্তাব থাকবে, এ নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে। এরপর তার উপস্থিতি বা তাকে যেকোনও উপায়ে দেখিয়ে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।

বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন নিয়ে গত বছরের ১৯ নভেম্বর খালেদা জিয়ার দেওয়া প্রস্তাবই মুখ্য হবে। ওই প্রস্তাবটিকে সামনে রেখেই আলোচনা শুরু হয়েছে দলে। নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণে ওই প্রস্তাবে খালেদা জিয়া ১৩টি ধারা উপস্থাপন করেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ধারাগুলো নতুন প্রস্তাবে উঠে আসবে।

খালেদা জিয়া তার প্রস্তাবে বলেছিলেন, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনই যথেষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সহযোগিতা প্রদান এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান ও নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা অসম্ভব।

তার প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য ধারাগুলো ছিল, ইসির নিজস্ব সচিবালয় গঠন করতে হবে। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে যারা  বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও অন্যান্য নির্বাচনি বিধি-বিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে তাদের তালিকা প্রণয়ন করে নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে বিরত রাখতে হবে। প্রেষণে নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত প্রকাশ্য রাজনৈতিক মতাবলম্বী নির্বাচনি কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে হবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় মাঠ পর্যায়ে কর্মরত জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের প্রত্যাহার করে নতুন কর্মকর্তা পদায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার প্রাক্কালে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় যেমন স্বরাষ্ট্র, অর্থ, তথ্য, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, পররাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর ৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে। সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বলবৎ থাকবে।

প্রস্তাবে আরও উল্লেখ ছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাস করতে হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রতিরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকালীন সময়ে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল (বিচারিক) ক্ষমতা দিয়ে সব নির্বাচনি এলাকায় টহলসহ ভোট কেন্দ্রে ও বিশেষ বিশেষ স্থানে মোতায়েনের ব্যবস্থা নেবে। ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ ও নতুন ভোটার নিবন্ধীকরণ করতে হবে।

‘প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী এবং জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের অবদান বিবেচনায় ভোটার তালিকায় তাদের অন্তর্ভুক্ত’ করার প্রস্তাবও ছিল খালেদা জিয়ার উপস্থাপিত ধারায়।

এছাড়া ছবিযুক্ত ভোটারতালিকা প্রণয়ন, হালনাগাদ, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ, ইসির কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল ক্ষমতা প্রদান করার ধারাও ছিল। একইসঙ্গে নির্বাচনের ন্যূনপক্ষে ০৭ (সাত) দিন আগে আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিদেশি পর্যবেক্ষক সংস্থা ও বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নাম ও তালিকা প্রকাশ করার প্রস্তাব সংযুক্ত ছিল বিএনপি প্রধানের প্রস্তাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যখন বিষয়ভিত্তিক আলোচনা হবে, তখন আমরা নির্দিষ্ট প্রস্তাব দেবো। এগুলো গবেষণা ও তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের ডাকা হলে লিখিতভাবে বিস্তারিত প্রস্তাব দেবো।

এ ব্যাপারে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়নি। আগে আলোচনা হবে পলিসিমেকারদের মধ্যে। এ বিষয়ে আমরা অন্ধকারে। ফলে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।’

রোডম্যাপে লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রোডম্যাপ নিয়ে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে বিএনপি। মঙ্গলবার দুপুর একটায় নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের সিনিয়র নেতারা এই প্রতিক্রিয়া অনুষ্ঠানে থাকবেন। সোমবার সন্ধ্যায় এ বিষয়ে গুলশানে কয়েকজন সিনিয়র নেতার বৈঠক হয়েছে।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিএনপির এক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘রোডম্যাপে তো লেবেল প্লেয়িং শব্দটি একবারও নেই। এটা কমিশনের আইওয়াশ। রোডম্যাপ তো দিবেই, এটা তাদের জব। ইসি একদলীয়ভাবে বা যে কোনও সরকারের অধীনেই হোক, তাকে তো নির্বাচন করতেই হবে। ফলে রোডম্যাপকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না।’

 স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘বেসিক প্রশ্নটি হচ্ছে, নির্বাচনকালীন সরকার কী হবে? ইসিকে তো সেই সরকারের অধীনেই কাজ করতে হবে। এই রোডম্যাপ কাজে লাগবে, নির্বাচনকালীন সরকার যদি রাজনৈতিক দলের না হয়। কিন্তু যদি একদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয় তখন কিভাবে এই রোডম্যাপটাকে ব্যবহার করবে নির্বাচন কমিশন সেই নির্দেশনা এতে নেই।’

আরেকজন সদস্য বলেন, ‘লেবেল প্লেয়িং বলে কিছুই নেই, শব্দটিই তো নাই এখানে। দায়ভার তো উনি (সিইসি) নিলেন না। সিইসি বলে দিলেন, শিডিউল ঘোষণার পর তাদের দায়িত্ব। তার মানে তারা তো গভর্মেন্টকে এলাউ করে দিলো, গভর্মেন্ট ক্যান এ্যাহেড।’

এরইমধ্যে সোমবার দুপুরে এবং গতকাল রবিবারও এক অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, ‘রোডই যখন নেই, তখন ম্যাপে কী হবে? নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করুন। অন্যথায় নির্বাচনি রোডম্যাপ সার্থক হবে না। সব ব্যর্থতার দায় আপনাদের নিতে হবে।’

 /এসটিএস/টিএন/

লাইভ

টপ