টেকনাফে ভাড়া থাকছেন রোহিঙ্গারা (ভিডিও)

Send
আমানুর রহমান রনি, টেকনাফ থেকে
প্রকাশিত : ১২:৫৫, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৯, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৭

বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকা রোহিঙ্গা পরিবারজীবন বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া থাকছেন। স্থানীয়রা তাদের কাছে বাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন। পলিথিন ও বাঁশ দিয়ে রাস্তার পাশে ঘর করে সেগুলো ভাড়া দিচ্ছেন। অনেকে আবার জায়গা ভাড়া নিচ্ছেন। টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এই তথ্য পাওয়া গেছে। ভাড়ার বিষয়টি রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা অকপটে স্বীকারও করেছেন।

স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৈরি ঘরের ভাড়া একহাজার টাকা। আর ঘর জমির মালিক তৈরি করে দিলে তার ভাড়া দুই হাজার টাকা।

গত এক সপ্তাহ ধরে টেকনাফের হোছনিপাড়া,নয়াবাড়ি,পাহাড়ার কাটা,উছনি প্রাং ও হ্নীলা এলাকায় ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে। রোহিঙ্গা পরিবারগুলো কেউ মাসের জন্য,  কেউ সপ্তাহের জন্য বাড়ি ভাড়া নিয়েছে।

নয়াবাড়ি পুলিশ গেটের আলিশা মার্কেটের নিচে ছয়টি খালি দোকান ভাড়া নিয়েছে রোহিঙ্গারা। শাটার লাগানো দোকানগুলোর প্রতিটিতে একাধিক রোহিঙ্গা থাকেন। গত এক সপ্তাহ ধরে তারা এই দোকানে আছেন। কেউ দুই হাজার,কেউ আড়াই হাজার টাকায় দোকানগুলো ভাড়া নিয়েছেন। এদেরই একজন হাজেরা খাতুন (৩৪)। রাখাইন রাজ্যের ম্যারুল্লা শিকদারপাড়া এলাকায় তার বাড়ি। মিয়ানমারে তার স্বামী গাছ কাটার কাজ করতেন। সাত ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে এই দোকানে তার পরিবার ভাড়া থাকেন। মাসে দুই হাজার টাকা ভাড়া দেবেন এই চুক্তিতে তারা সেখানে উঠেছেন।

মো.জোবায়ের হোসেন নামে এক কিশোর বলে, তার বাবার ইমাম হোসেন ও মা জোহরা খাতুন। মংডুর ম্যারুল্লা থেকে তারা এসেছে। ওই মার্কেটে তারাও ভাড়া নিয়েছে দুটি খালি দোকান। দুই পরিবারের ৩৪ জন সেখানেই রাতে থাকেন। দিনের বেলা রাস্তায় ত্রাণের জন্য বসে থাকেন। তারা ক্যাম্পে যাবে আরও পরে। জোবায়েরের পরিবারে ১০ জন আছে। তারা এখনও ভাড়ার টাকা দেয়নি। যাওয়ার সময় ভাড়া দিয়ে যাবেন। এই মার্কেটে তারা পাঁচদিন ধরে আছেন।

আজিদা (২৫) নামে এক নারী বলেন, ‘আমি আড়াই হাজার টাকায় ভাড়া থাকি। এক রুমে চারজন থাকি। স্বামী ও দুই বাচ্চা নিয়ে এই রুমেই থাকি। বাবা-মাকে এখনও খুঁজে পাইনি। আমরা কয়েকদিন পরে ক্যাম্পে যাবো।’

মার্কেটের মালিক মোহাম্মদ আলী। তিনি মার্কেটের অদূরে একটি বাড়িতে থাকেন। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

ওই মার্কেটে একটি জুয়েলারি ও কয়েকটি মোবাইল রিচার্জের দোকান রয়েছে। তারও ভাড়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে রোহিঙ্গারা সেখানে কয়েকদিন থাকার পর চলে যাবে বলে জানান। কারণ দোকানগুলো সব ভাড়া হয়ে গেছে। শিগগিরই সেগুলো চালু হবে।

টেকনাফের মোছনি এলাকায় রোহিঙ্গাদের একটি নিবন্ধিত ক্যাম্প রয়েছে। ২৫ আগস্ট থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা অনেকেই এই ক্যাম্পের পাশের এলাকায় সেতারা বেগম নামে এক রোহিঙ্গা স্থানীয়ের জায়গায় ঘর করে থাকেন। এজন্য স্থানীয় হাবীবুর রহমানকে একহাজার করে টাকা দিতে হবে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘ঘর তৈরি করে দিলে দুই হাজার টাকা, আর যদি ঘর আমরা তৈরি করি, তাহলে মাটি ভাড়া একহাজার টাকা দিতে হবে।’

নূর বেগম (৪০) নামে এক নারী তৈরি করা ঘরে থাকেন। তাকেও দিতে হবে দুই হাজার টাকা ভাড়া।

মংডুর দ্রং এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে পালিয়ে এসেছেন ইনূচ আলী (৪০)। মংডুতে তিনি কৃষিকাজ করতেন। আত্মীয়-স্বজন মিলে তারা তিন পরিবারের ২৫ জন এসেছেন। বর্তমানে মোছনিপাড়ার ফরিদ আলমের বাড়িতে ভাড়া থাকছেন। প্রতিমাসে তাদের দুই হাজার করে ভাড়া দিতে হবে।

ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন ফরিদ আলম। তিনি বলেন, ‘ঘরের দুই রুম ভাড়া দিয়েছেন। দুই হাজার করে।’

নৌকায় রমরমা বাণিজ্য

রোহিঙ্গা পারাপারে জেলেদের মাছ ধরার নৌকা এখন বেশি ব্যস্ত। প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাফনদী পার হয়ে জেলে নৌকায় টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে আসছেন। গত এক সপ্তাহে কোস্টগার্ড অন্তত ৮টি নৌকা পোড়ানোর পরও রোহিঙ্গা পারাপার থামছে না। শাহপরীর দ্বীপের বিভিন্ন চরে রোহিঙ্গাদের নামিয়ে দেয়। বিনিময় জেলেরা গরু অথবা নগদ টাকা নেয়। কখনও গরু বা নগদ টাকা দিতে না পারলে নারীদের স্বার্ণালংকার রেখে দেয় তারা। শাহপরীর দ্বীপের জেলে পাড়ার জেলে হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে নদীতে মাছ ধরা পড়ছে না। তাই তারা রোহিঙ্গা পার করছেন। রোহিঙ্গারা দুঃখে আছে,তাদের সহযোগিতা করছেন।’

টেকনাফের হালিখালী-ভাঙাঘাট-শাহপরীর দ্বীপে পারাপারেও ব্যস্ত মাঝিরা। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ও স্পিড বোটে করে প্রতিদিন বিরামহীনভাবে রোহিঙ্গাদের পার করা হচ্ছে। যানবাহনেও জায়গা পাচ্ছে না স্থানীয়রা। পাওয়ার টিলারেও টানা হচ্ছে রোহিঙ্গা। রাতে ট্রাকে ট্রাকে রোহিঙ্গা টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে চিন্তিত স্থানীয়রাএবারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে কখনোই প্রবেশ করেনি। টেকনাফ ও উখিয়ার এমন কোনও জায়গা নেই রোহিঙ্গা প্রবেশ করেনি। রোহিঙ্গাদের ভিড়ে এখন স্থানীয়দের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এতো রোহিঙ্গা দেখে অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত। কেউ কেউ বলেছেন,এরা কম মজুরিতে সব কাজ করবে। তখন স্থানীয় মজুরদের বেকার থাকতে হবে।

দেলোয়ার হোসেন নামে এক অটোচালক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দশ হাজার টাকাতেও এবার এক বস্তা চাল পাওয়া যাবে না। এতো মানুষের ভিড়ে সবকিছুর দাম চড়া হবে।’

প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ পোস্টে হামলা চালায় সে দেশের একটি বিদ্রোহী গ্রুপ। এতে ১২ পুলিশ সদস্যসহ বহু রোহিঙ্গা হতাহত হয়। এ ঘটনায় রাখাইন রাজ্যে অভিযানের নামে সাধারণ মানুষ হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে আগুনসহ নানা নির্যাতন শুরু করে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। এরপর থেকে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন।

জাতিসংঘের তথ্য মতে, তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তবে স্থানীয় সূত্রগুলোর ধারণা এই সংখ্যা আরও বেশি।

 

 আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে নিরাপত্তা পরিষদে ‘বিরল ঐকমত্য'

/এআরআর/এসটি/

লাইভ

টপ