রাখাইনের তমব্রু এখনও জ্বলছে (ভিডিও)

Send
আমানুর রহমান রনি, রাখাইনের তমব্রু থেকে ফিরে
প্রকাশিত : ২৩:৩৩, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৩, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৭

রাখাইনের তমব্রু এখন এক বিরান ভূমি। পোড়া মাটি, পোড়া ঘর তারপরও আগুন দেওয়া থামছে না সেখানে। কক্সবাজারে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নির্মম জীবনের চিত্র এখন সবার জানা। কিন্তু, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এখনও কী ঘটছে? হঠাৎ তা দেখার সুযোগ মিললো আমার। বৃহস্পতিবার কৌশলে পৌঁছে গিয়েছিলাম রাখাইনের তমব্রুতে। 

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের তমব্রুতে এখনও জ্বলছে বাড়িঘর

ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা দেড়টা। বালুখালী কাস্টমস গেট থেকে হেঁটে মিয়ানমার-বাংলাদেশ মৈত্রী সড়ক ধরে কর্দমাক্ত পথে হাঁটা শুরু করলাম। আধা কিলোমিটার হাঁটার পরেই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নে প্রবেশ সড়কে বিজিবির তল্লাশি চৌকি। সেখানে একজন বিজিবি সদস্যের সহায়তায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা নিলাম। এবার উদ্দেশ্য বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের সীমান্ত এলাকা। রিকশা চলতে লাগলো। আমার সঙ্গে নির্মল মং নামে এক আদিবাসী শিক্ষার্থী। সে উখিয়া কলেজে অ্যাকাউন্টিংয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ে। রোহিঙ্গাদের ভাষা বোঝার জন্য তাকে সঙ্গে নিলাম। তারও কাজ ছিল ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সনদ আনার। পথে দেখা হয় একটি অনলাইন গণমাধ্যমের ফটোগ্রাফার বিপ্লব দাদার সঙ্গে। তিনজন চেপে রিকশায় বসা। তিনজনে মিলে বিভিন্ন বিষয় কথা বলছি। রোহিঙ্গারা কেন পালিয়ে আসছে। নির্মল শিক্ষিত ছেলে তার কথা শুনতে ভালোই লাগছিল। ঘুমধুম বাজারের আগেই ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের সনদ আনতে রিকশা থেকে নেমে গেল নির্মল। এবার আমি আর বিপ্লব দা রিকশায়। আরাম করে বসলাম। অটোরিকশা চলল প্রায় আধাঘণ্টা। দূর থেকে রোহিঙ্গাদের বস্তি দেখছি। রিকশা যত চলছে তত কাছে যাচ্ছি। আবার বিজিবির তল্লাশি চৌকি। জোরে জোরে সালাম দিচ্ছি। বিজিবি সদস্যরা সালামের উত্তর দিচ্ছেন বেশ। আবার রিকশা চলতে লাগলো। পাহাড়ি পথ রিকশার গতি কমে আসে। রিকশা থেকে নেমে গেলাম। বয়স্ক রিকশাচালককে ব্যাটারিচালিত রিকশা ঠেলে সহযোগিতা করলাম। ঘুমধুম বাজার ছাড়িয়ে কিছুদূর গিয়ে একটি মসজিদ। সেখানে নামলাম।

নোম্যান্স ল্যান্ডের ধারে রোহিঙ্গা বস্তি। (ছবি-প্রতিবেদক)

এবার পায়ে হাঁটা পথ। হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতেই নাফ নদীর তীরে। সেখানেও বিজিবির কড়া পাহারা। ওপারে নোম্যান্স ল্যান্ডে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প। বিজিবির দুই সদস্য সামনে আগাতে নিষেধ করলেন। এরমধ্যে ঘড়ির কাঁটায় প্রায় আড়াইটা। মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। খোলা জায়গা। বিজিবির দুই সদস্যকে বললাম, সামনে একটু হেঁটে দেখি। তাদের কঠোর নজরদারিতে বাধ সাধলো বৃষ্টি, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তারা নিজেরাই আড়াল হলো। আমি আর দাদা গিয়ে একটা বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়ালাম। ওপারে রোহিঙ্গা শিশুরা খেলা করছে। ইশারায় তাদের কাছে ছাতা চাইলাম। এরমধ্যে ১০/১২ বছরের এক মেয়ে শিশু ঘর থেকে ছাতা নিয়ে নদীতে নামলো, তার গলা সমান পানি সাঁতরে ছাতা এনে দিলো। তাকে আদর করে নাম জিজ্ঞেস করলাম। সে হেসে জানালো তার নাম রেবেকা। ছাতা দিয়ে সাঁতরে আবার চলে গেল। ছাতা ধরে দুজনে বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বিপ্লব দাদার বাড়ি চট্টগ্রামে। তিনি রোহিঙ্গাদের ভাষা ভালো বোঝেন। নির্মল চলে যাওয়ায় তিনিই আমার ভরসা হলেন। তাই দাদাকেও খাতির করলাম অনেক। দাদা বিরক্ত হলো। আমি বললাম দাঁড়ান, কাজ হবে। প্রায় আধাঘন্টা বৃষ্টি। এরপর রোদ। এবার দূরে তাকিয়ে দেখছি বিজিবির সদস্যরা আমাদের অনুসরণ করে কিনা। দেখি তারা তাদের মতো আছেন। আমরা বাঁশঝাড়ের আড়ালে, তাই তারা ঠিকমতো দেখছেন না। এবার রোহিঙ্গাদের ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম, নদীর পানি কম কোথায়? এক রোহিঙ্গা ব্যক্তি তার টং ঘরের সামনে কোদাল দিয়ে কাজ করছিলেন, তার সঙ্গে তার ৮ বছরের ছেলেও রয়েছে। সে তার ছেলেকে একটু উত্তরে পাঠিয়ে দিলো। ছেলেটি নদীতে নেমে দেখালো পানি তার বুক সমান। এবার সেদিকে হাঁটলাম। আবার পেছনে তাকিয়ে দেখছি, বিজিবি অনুসরণ করে কিনা। মাথায় গামছা বেঁধে একটু রোহিঙ্গা সাজার চেষ্টা করলাম। জুতা আর ডায়েরি হাতে নিলাম। থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট গুছিয়ে যতোটা সম্ভব ভেজা এড়ানোর চেষ্টা করলাম। ডায়েরিটা দিলাম এক শিশুর কাছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সবাই তাকিয়ে আছে। নামলাম নাফ নদীর ঠাণ্ডা পানিতে। গরমে বেশ আরাম লাগছে। যদিও বৃষ্টিতে পানির রঙ মাটির মতো হয়ে গেছে। এগিয়ে দ্রুত নদী পার হয়ে ওপারে পৌঁছলাম। এবার বিপ্লব দাদাকে ডাকছি। আসেন। তার পায়ে জুতো। আমি ওপার গিয়ে তাকে কয়েকবার ডাকার পর সেও নামল। দ্রুত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢুকে পড়লাম আমরা। মিশে গেলাম তাদের সঙ্গে।

তমব্রুর ভেতরে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি

এবার রোহিঙ্গা পুরুষদের সঙ্গে কথা বললাম। মাথার ভেতরে ঘুরছে কিভাবে ঢুকবো? বয়স্ক কয়েকজন রোহিঙ্গা আমাদের যেতে বারণ করলেন। তবে তরুণ কয়েকজন বলল, যাওয়া যাবে, তবে মগের এলাকায় যাওয়া যাবে না। চার-পাঁচ তরুণ আমাদের সহযোগিতা করার জন্য এলো। তাদের দুজনের কাছে বারবার জানতে চাইলাম সমস্যা হবে কিনা? মগের কাছে কি কি অস্ত্র থাকে? রোহিঙ্গা গ্রাম থেকে মগের গ্রাম কতদূর। তাদের বর্ণনা শুনে মনে মনে একটা ম্যাপ আঁকলাম। এবার দুই রোহিঙ্গা তরুণ হামজাল ও খালেককে কাঁটাতার পেরিয়ে আগে পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখে আসতে বললাম। তারা দুজনে মোবাইল নিয়ে চলে গেল। তারা দুজনেই রবির সিম ব্যবহার করে। তারা হেঁটে প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে গেল। মগের এলাকার কাছ পর্যন্ত। আমাদের বলল সমস্যা নেই, আসেন। ভয় লাগছে এবার যাবো কি যাবো না? নিজেকে প্রশ্ন করলাম। যদি মিয়ানমার সেনাবাহিনী বা মগের সামনে পরে যাই? তখন কি করবে তারা? তাহলে কি ফিরে যাবো? এবার ভাবলাম ঝুঁকি নিতেই হবে। নিরাপরাধ রোহিঙ্গারা কেন ঢলের মতো বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে, তাদের ওপরে আসলেই কি হচ্ছে তার কিছু নমুনা নিজের চোখে দেখে আসতে হবে। সুযোগ যখন মিলেছে ফেরা উচিত হবে না। এবার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম, ওপারে মিয়ানমারের ভেতরে যাচ্ছি।  

রওনা হলাম আমরা। কিন্তু, মিয়ানমার সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া টপকাতে গিয়ে ভয় পেলাম, এমনভাবে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া যে, বিপদ বুঝতে পারলেও মানুষ তা থেকে দৌড়ে বের হতে পারবে না। আটকে যাবে। রোহিঙ্গারা গত ২৬ আগস্ট তামব্রুর দুই জায়গা থেকে কাঁটাতারের বেড়া কেটেছে। তবে তারপরও ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত বের হওয়া যাবে না। ওদিকে হামজাল আর খালেক ডাকছে তাদের ভিটেমাটি কিভাবে ধ্বংস করা হয়েছে সেই দৃশ্য দেখানোর জন্য। এবার আরও দুজন রোহিঙ্গাকে সঙ্গে নিলাম। একজন নুরুল আমিন (৪৮), অপরজন নূর আলম (৩৫)। তাদের মধ্যে নুরুল আমিনের বয়স বেশি হলেও বেশ সাহসী। তিনি বলতে লাগলেন কিছু হবে না, চলুন। রোহিঙ্গাদের কথায় বেশ সুর আছে। আমার ভালো লাগলো। কথার সুরে কাঁটাতারের বেড়া টপকালাম। আমি এখন মিয়ানমারে।

রওনা হলাম। পথে নুরুল আমিন একটি জায়গা দেখালো। ওখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী পাঁচদিন আগে চারটি মাইন পুঁতে রেখেছিল। পিচ ঢালাই করা এই পথেই মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি পাহারা দেয়। হাঁটছি আর ভাবছি এই বুঝি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গাড়ি আসছে। আমি একটু দ্রুত হাঁটলাম। প্রায় ২০ মিনিট হাঁটার পর দুইটা পাহাড় ডিঙ্গিয়ে ওপরে উঠলাম। পাহাড় থেকেই দেখা যায় সমতল চাষের জমি। যা বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে আন্দাজ করা যায় না। বিপ্লব দাদা আমার বেশ পেছনে। ছবি তুলছেন। দাদাকে ডাক দিলাম। আমি হাঁটছি দুজনের সঙ্গে। এরপরই রোহিঙ্গাদের ছোট্ট একটা গ্রাম। প্রায় অর্ধশত ঘর ছিল বোঝা যাচ্ছে। ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘরগুলো মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও মগরা পুড়িয়ে ও জ্বালিয়ে দিয়েছে।

মগদের লুটপাটের শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের একটি বাড়ি

রোহিঙ্গা দুই সহযোগীকে বাইরে পাহারায় রেখে একটি ঘরের ভেতরে ঢুকলাম। ঘরের ওপরে কিছু নেই। সব পুড়ে গেছে। মাটির ঘর তাই কাঠামোটা কেবল রয়ে গেছে। ঘরের ভেতরে শিশুদের জামা কাপড়, ধানের ঘোলা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাসন-কোসন। পাহাড়ের ওপর ছোট ছোট ঘর। একটির পর আরেকটি ঘর। সব ধংসস্তুপ হয়ে আছে। কোথাও কোনও মানুষ নেই। আমরা পাঁচজন। আমরা তখন প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে। ভয়ে ভয়ে আস্তে কথা বলছি―যদি মগরা দূর থেকে দেখে ফেলে। এবার মগের গ্রামের কাছে। সেখানেই মগদের ধানক্ষেতে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। একটি টিনশেড স্কুল দেখা যাচ্ছে। পাশেই মগ শিশুরা খেলছে। তারপর আরও একটি রোহিঙ্গা গ্রাম। সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দিছে। ওই গ্রামের গাছপালাগুলো পুড়ে লাল হয়ে আছে। বাড়িগুলো মাটির সঙ্গে মিশে আছে। রোহিঙ্গা নুরুল আমিন আর খালেক বারবার মগ ও মিলিটারির নৃশংসতার কথা বলতে লাগলো। সামনের দিকে হাঁটতে চাইলাম। তারা আর উত্তরে যেতে দিচ্ছে না। তাহলে মগরা চিনে ফেলবে। তাই এবার পূর্বের দিকে হাঠলাম। হাঁটতে হাঁটতে রোহিঙ্গা নারীদের কারুকার্যে তৈরি করা একটি মাটির ঘর চোখে পড়লো। বেশ ভালো লাগলো। খালেকের কাছে জিজ্ঞাস করলাম ঘরটা কার। তারা বলতে পারলো না। ঘরের ভেতরে সবই পড়ে আছে। কেবল মানুষগুলো নেই। কাঁঠাল গাছ, নারকেল গাছ, আঙ্গিনায় গরুর ঘর। দেখা গেল। আরও পূর্বের দিকে হাঁটতে লাগলাম। এবার আরও একটি পাড়া। এই পাড়ার মানুষগুলো খুব শৌখিন হয়তো। তাদের বাড়িতে প্রবেশ করার মুখেই একটা বাঁশের দরজা চোখে পড়লো। কিন্তু বাড়িটি ঠিক নেই। বাড়ির সামনে একটি ইস্কুটি পড়ে আছে। তাতে আঘাতের চিহ্ন।  ঘরের সামনে ধানের গোলা। গোলাগুলো খালি। মগেরা সব লুট করে নিয়ে গেছে। নুরুল আমিনের কাছে আমার মোবাইল ভিডিও মুডে দিয়ে রেখেছি। যেখানে ভিডিও করতে বলবো, সেখানেই ভিডিও করবে সে। আমি নোট করছি সব। এবার খালেক পেছন থেকে বার বার ডাকছে। এবার চলেন। মগরা এদিকে পাহারায় আসে। সে আর আমাদের নিয়ে আর ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। নিজেদের দেশ অথচ তাদের পালিয়ে থাকতে হচ্ছে। ভাবলাম, এ কেমন রাষ্ট্র! ঘড়িতে তখন বিকাল সাড়ে চারটার বেশি। গ্রামে দুই রোহিঙ্গার সঙ্গে দেখা হলো। যারা পালিয়ে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্থ ঘর দেখতে গিয়েছিল। তাদের সাক্ষাতকার নেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। নিজের মোবাইল হাতে নিয়ে তাদের দ্রুত কয়েকটা প্রশ্ন করলাম। তারা দেখালো পাহাড়ে বসে তমব্রুর বিশাল এক এলাকা। সেই তুলনায় জনবসতি খুবই কম। রাস্তাঘাট নেই। পাড়া বা গ্রামগুলো দূরে দূরে। শুধু সীমান্ত দিয়ে একটি রাস্তা। এই রাস্তা দিয়েই তাদের মংডু ও তামব্রু শহরে যেতে হয়।

একটি রোহিঙ্গা গ্রামের ভেতরে প্রতিবেদক

যে দুজন রোহিঙ্গার সঙ্গে তামব্রুর গ্রামে দেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন পূর্ব তামব্রু পাড়ার হোসেন। সে তার ঘর দেখিয়ে বলছে, মগরা সব লুট করে নিয়েছে। ঘটনার দিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে মগরা আসে। তারা গুলি করে। মগরা বাড়িঘরে আগুন দেয়, ভেঙে ফেলে। হোসেন তার পরিবারের আটসদস্য নিয়ে ২৬ দিন ধরে নোম্যান্সল্যান্ডে আছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সে তার বাড়ি দেখতে যায়। বাড়িতে কিছুই নেই। তবে তারপরও তাকে তার বাড়ি টানে। তিনি বলেন, ‘আমার ঘর, তাই দেখতে আসছি। এখানে মগের জন্য থাকা যাবে না। তাই পরিবার নিয়ে চলে গেছি।’

তামব্রুর উত্তরে দেখা হয় নুর ইসলাম নামে আরও এক রোহিঙ্গার সঙ্গে। সেও পালিয়ে গ্রামে গিয়ে তার ভাঙা ঘর দেখেছে। ঘরে কিছুই নেই। দ্রুত বের হয়ে আসার আরেকটি কারণ হলো, আমার যখন তমব্রুর পূর্বপাশের গ্রামগুলোতে তখন উত্তর দিকের একটি গ্রামে আগুন দিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সেই খবর পেয়ে আরও দ্রুত বের হলাম।

বেলা পৌনে পাঁচটার দিকে দ্রুত রোহিঙ্গা গ্রাম থেকে ফের নাফ নদীর দিকে রওনা হই। তবে কাঁটাতার পর্যন্ত বহুদূর। তাই হাঁটছি আর পেছনে তাকাচ্ছি। কেউ ধাওয়া দিলো কিনা। এবার প্রধান সড়ক ধরে হাঁটছি। দ্রুত হেটে আসার সময় বার বার ধংসস্তুপের কথা মনে পড়লো। কাঁটাতার থেকে বের হয়ে নিঃশ্বাস ছাড়লাম। তখন নাফের ওপারে অর্থাৎ নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের অনেকেই আমাদের অনুসরণ করছে। দ্রুত ক্যাম্পে ঢুকে পড়ি। এরপর বিভিন্ন বিষয় কথা হয় ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে। নাফ নদীতে এবার বৃষ্টির পানিতে আগের চেয়ে বেশি পানি। তাই পার হয়ে এপার আসার সময় ভিজে গেলাম। এবার গন্তব্য উত্তর পাশে যেদিকে আগুন দিয়েছে সেইদিক বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে দেখার চেষ্টা করবো।

আসার সময় ঘুমধুম বাজারে ডাল দিয়ে তিন তন্দুর রুটি খেয়ে নিলাম। আবার অটোরিকশায় উঠালাম। ২০ মিনিট চলারপর দেখি দাউদাউ করে তামব্রুর উত্তর পাশে আগুন জ্বলছে। গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়লাম। মোবাইল নিয়ে দৌড়। কিন্তু মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) পেছন দিক থেকে ডাকলো। আমার ঝুঁকি তারা নেবে না। এবার জঙ্গলে ঢুকলাম। সেখানে গিয়ে কাঁটাতারের পাশে দাঁড়ালাম। বাড়িটির মালিক নাসিমা খাতুন তখন বিলাপ করছেন। কিছুক্ষণ পরপরই তিনি জ্ঞান হারাচ্ছেন। তার মুখ থেকে লালা ঝড়ছে। তার সন্তানরা তাকে নিয়ে এবার দৌড় যাচ্ছে। তাদের বললাম মাথায় পানি দিতে। নাসিমা খাতুনের মাথায় পানি দিলো তার সন্তানদের কেউ। কিন্তু তার জ্ঞান তখনও ফেরেনি। আমি ভিডিও করলাম আগুনের। নিরাপত্তার কথা ভেবে ফিরে এলাম দেশে।

(দ্বিতীয় কিস্তি শুক্রবার)

ছবি ও ভিডিও: আমানুর রহমান রনি

( সম্পাদকের নোট: মিয়ানমারের রাখাইন থেকে নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল আসছে বাংলাদেশে। বাংলা ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদক আমানুর রহমান রনি এই নির্মমতার উৎসমূল মিয়ানমারের রাখাইনের তমব্রুতে গিয়ে দেখে এসেছেন। সাংবাদিকতার স্বার্থে ও মানবতার কারণেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।) 

 

/টিএন/

লাইভ

টপ