রাখাইনের তমব্রুতে দুই ঘণ্টা (ভিডিও)

Send
আমানুর রহমান রনি, রাখাইনের তমব্রু থেকে ফিরে
প্রকাশিত : ১৪:৩৩, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৮, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭

রাখাইনের তমব্রুতে রোহিঙ্গাদের ঘরের ধ্বংসাবশেষ (ছবি: আমানুর রহমান রনি)প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যখন আমি রাখাইনের তমব্রুতে ঢুকি তখন দুপুর ২টার একটু বেশি। কাঁটাতারের বেড়া ডিঙানোর সময় মন জুড়ে কেবল আতঙ্কের ঝড়। তবে মিয়ানমারের সীমানায় প্রবেশ করে নিজের চোখে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি দেখার আগ্রহ ঝুঁকির মাত্রা নিয়ে ভাবার সময় বেশি দেয়নি। আরও তথ্যের জন্য, চাক্ষুষ প্রমাণের জন্য সামনে এগিয়ে যাওয়াই তখন মূল লক্ষ্য।

পাহাড়ি পথ ধরে যতই হাঁটছি রোহিঙ্গাদের পোড়া গ্রামগুলো চোখের সামনে চলে আসছে। নিজের চোখে দেখছি তাদের পোড়া বাড়ি-ঘর। দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না, সত্যি আমি রাখাইনে! রোহিঙ্গাদের একটি পাড়া বা গ্রাম থেকে আরেকটি পাড়ার দূরত্ব অনেক। মাঝে পাহাড়, ধানক্ষেত। তবে প্রতিটি রোহিঙ্গা গ্রামেই একসঙ্গে আবার ছোট ছোট অনেক ঘর। যখন যে গ্রামে প্রবেশ করেছি, সেখানেই ঘরের ধংসস্তূপ নাড়িয়ে দেখার ইচ্ছা হচ্ছিল খুব। রোহিঙ্গারা কী রেখে এসেছে? তাদের কী কী পুড়েছে, কী কী লুট হয়েছে? এসব জানার চেষ্টা করছিলাম। তবে সময় নষ্ট হবে, আরও বেশি গ্রাম দেখা হবে না ভেবে ধংসস্তূপ আর ঘেঁটে দেখিনি। যা চোখের সামনে পড়েছে, তাই দেখছি শুধু।

আমি যেসব গ্রামে প্রবেশ করেছি সেসব গ্রামে রোহিঙ্গাদের ঘরগুলো মাটির ঝুপড়ি ঘর। টিলায় টিলায় ঘর। টিলায় ও পাহাড়ে হওয়ার কারণে দুইটি গ্রাম দেখার পরই হাঁপিয়ে যেতে হয়। তার ওপর দ্রুত ওঠা, দ্রুত দেখা। সবমিলিয়ে আমিও হাঁপিয়ে যাচ্ছিলাম। তবে চেষ্টা ছিল, যত দ্রুত সম্ভব কম সময়ে বেশি গ্রাম দেখা।

তমব্রুর পুরো এলাকায় জনবসতি খুবই কম। রোহিঙ্গারা নিজেরাই দিকের নাম এবং পাহাড়ের পরিচয়ে গ্রামের নাম রেখে থাকে। এভাবেই তারা এলাকা চেনে। আমরা তমব্রুতে প্রবেশ করেই প্রথমে উত্তর দিকের গ্রামগুলোয় যাই। দূর থেকে কাছে মনে হলেও গ্রামগুলো অনেক দূর। প্রায় ২০ মিনিট হাঁটার পর প্রথম একটি পাড়া চোখের সামনে। দৌড়ে ঢুকলাম ওই পাড়ায়। যে দুই রোহিঙ্গা আমার সঙ্গে ছিল তারা পেছনে পড়লো। একা হয়ে যাওয়ায় একটু ভয়ও পেলাম। দাঁড়ালাম একটু। ওখানে রোহিঙ্গাদের ঘরগুলো ছনপাতার আর মাটির। ঘরের ওপরে কিছুই নেই। পোড়া, ভাঙ্গা সুনসান নীরবতা। আমি একা, হলিউডের ভূতুরে ছবির কথা মনে পড়লো। মনে হলো কোনও এক রক্তপিপাসু এই গ্রামের সব রোহিঙ্গাকে খেয়ে ফেলেছে। এখানে এখন আমি একাই বেঁচে আছি! আমাকেও একটু পর ওই পরিত্যক্ত মাটির ঘর থেকে বের হয়ে কেউ খেয়ে ফেলবে!রাখাইনের তমব্রুতে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি

ভাবছি আর পেছনে তাকাচ্ছি। একটু পর দেখলাম আমার রোহিঙ্গা দুই সহযোগী নূর ইসলাম ও নূর আলম চলে এসেছেন। এবার সাহস হলো। তারপরও ভাবছি মিয়ানমার সেনাবাহিনী মাটির ঘরের দেয়ালের ওপাশে ওঁৎ পেতে বসে আছে নাকি? আমি ঢুকলেই গুলি করবে! মগরা বড় দা নিয়ে আছে নাকি, আমাকে গলা কেটে মারবে! আতঙ্কের এরকম দৃশ্যই খেলছিল মাথার ভেতর।

ভাবতে ভাবতেই মাটির ঘরগুলোর ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে ভেতরে দেখছি। ঘরের ওপরে কোনও ছাউনি না থাকায় ভেতরে অনেক আলো। তাই স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে সেখানে কেউ নেই। এবার ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলাম। মাটির এরকম ঘর এর আগে এতোটা পরখ করে দেখিনি। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। ঘরের ভাঙা দেয়ালে হাত দিয়ে দেখছি। মেঝেতে ছড়ানো ছিটানো সব আসবাবপত্র খুঁটিয়ে দেখেছি। তবে ঘরটি কার তা জানা গেল না। তবে অনুমান করা গেলো, এই ঘরে একাধিক শিশু সন্তান ছিল। তাদের জামা কাপড়, গৃহকর্ত্রীর কাপড়, কর্তার পাঞ্জাবি- সব এলামেলো। তবে দামি কোনও জিনিস নেই। আমার সঙ্গে থাকা নূরুল আলম আমাকে বললেন, ‘মিলিটারি গ্রামে প্রবেশ করে গুলি করে। তখন রোহিঙ্গা সব বের হয়ে যাওয়ার পর মগরা আগুন দেয়, লুট করে। এই ঘরের জিনিসপত্র মগরা হয়তো লুট করেছে। তাই কোনও কিছু নেই।’

সঙ্গী এই দুই রোহিঙ্গা জানান,  এই গ্রামটিতে আগুন দেওয়া হয়েছে গত ২৬ আগস্ট। এরপর কয়েক দফায় বৃষ্টি হয়েছে। তারপরও পোড়া ক্ষত বোঝা যাচ্ছে। ঘরের দেয়াল ভেঙে আছে। দ্রুত ছবি তুললাম। এই ঘর থেকে বের হলাম। এবার সামনের দিকে বের হয়ে আরও কিছু ভাঙা ঘর দেখলাম। সব ঘরের একই অবস্থা। উত্তর দিকে হাঁটছি ধ্বংস হয়ে যাওয়া আরেকটি গ্রামের উদ্দেশ্যে। তবে সঙ্গের দুই রোহিঙ্গা আমাকে আটকে দিলো। কারণ মগপাড়া, যাওয়া যাবে না। তাই সেখান থেকে ফিরে আসলাম। তাদের সঙ্গে এবার পূর্বদিকে যেতে বলল। কারণ সেদিকে মগ বা মিলিটারি নেই। রওনা হলাম সেদিকে।রাখাইনের তমব্রুতে রোহিঙ্গাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি (ছবি: আমানুর রহমান রনি)

পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমেই সেই গ্রামটি। কিছু ঘর এখনও দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে পৌঁছাতে একটু কষ্ট, তাই হয়তো মিলিটারি এই পূর্বদিকের গ্রামটিতে আগুন দিতে পারেনি। এই ঘরগুলো মাটির হলেও বেশ বড়। একটির পর একটি ঘর। সব ঘর খালি। জিনিসপত্র নেই। সব লুট হয়েছে। গোয়াল ঘর শূন্য পরে আছে, গরু মগরা নিয়ে গেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে নিজেই একটু ভিডিও করলাম। আস্তে আস্তে কথা বলছি। সতর্ক থাকতে হচ্ছে, মগরা এসে পরে কিনা! দূরে খেয়াল রাখতে বললাম সহযোগীদের।

এই গ্রাম থেকে বের হয়ে আরও নিচের দিকে গেলাম। সেখানে গিয়ে যা দেখলাম তা ভয়াবহ। এই রোহিঙ্গা গ্রামটিতে কিছুই নেই। সব ঘর মাটির সঙ্গে। সমতল ভূমিতে গ্রামটি। গ্রামের পাশেই মগরা ধানক্ষেতে কাজ করছে। পাহাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখছি। তবে আমাকে সামনে যেতে দিচ্ছি না রোহিঙ্গা নূরুল আলম ও ইসলাম। আমার প্রতি এতো খেয়াল দেখে তাদের ওপর বিশ্বাস হতে লাগলো এতোক্ষণে। এর আগে অবশ্য ভয় হচ্ছিল, যদি তারাই আমাকে আটকে দেয়, মোবাইল আর মানিব্যাগের টাকা ছিনিয়ে নেয়! পাহাড়ে আমাকে মেরে ফেললেও তো কেউ দেখবে না!

এই তিন গ্রাম দেখতে দেখতে আমাদের ততক্ষণে দেড় ঘণ্টা শেষ। আমরা সীমান্ত থেকে মিয়ানমারের প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে। দেশে ফিরে আসবো ঠিক করছি মনে মনে। তখনও শেষ সময়ে আরেকটু দেখে নেওয়ার লোভ। আরেকটু পূর্বদিকে একটি গ্রাম দেখা যাচ্ছে। সেদিকে এগোই। এগিয়ে একটি ছোট্ট টিলার ওপরে তিনটি ঘর দেখলাম। উঠলাম সেখানে। ঘরগুলো ভাঙা। খোলা ধানক্ষেত। ওপরে দাঁড়ালে দূর থেকে আমাদের দেখা যাবে। মগরা দেখে ফেলবে। তাই নিচে নেমে আসলাম। মগরা ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের পরিত্যক্ত বাড়িঘর ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে। এসব কথা বলতে বলতে বের হয়ে আসছি সীমান্তের দিকে। আমাদের সঙ্গে যারা ছিল তাদের আসতে বললাম। একসঙ্গে পাঁচজনের একটি ছবি তুললাম পাহাড়ের আড়ালে। কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসি সীমান্তের দিকে...

(তৃতীয় কিস্তি শনিবার)

ছবি ও ভিডিও: আমানুর রহমান রনি।

(সম্পাদকের নোট: মিয়ানমারের রাখাইন থেকে নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল আসছে বাংলাদেশে। বাংলা ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদক আমানুর রহমান রনি এই নির্মমতার উৎসমূল মিয়ানমারের রাখাইনের তমব্রুতে গিয়ে দেখে এসেছেন। সাংবাদিকতার স্বার্থে মানবতার কারণেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।)

আরও পড়ুন-  রাখাইনের তমব্রু এখনও জ্বলছে (ভিডিও)

 

/এআরআর/এফএস/

লাইভ

টপ