‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার-অপব্যবহারের স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতে হবে’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২১:৩৫, অক্টোবর ১২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫৪, অক্টোবর ১২, ২০১৭

‘সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি’ শীর্ষক বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি (ছবি- সাজ্জাদ হোসেন)একবিংশ শতাব্দীতে এসে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের জীবনকে অনেকভাবেই সহজ করে তুলেছে— এটা সত্যি। কিন্তু এর বিপরীত দিকও আছে। এসব মাধ্যমের প্রতি আসক্তি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছে, যে এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মানসপটে। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার ও অপব্যবহারেরও প্রতি স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতে হবে।
বৈঠকি সঞ্চালনা করেন মুন্নী সাহাবৃহস্পতিবার (১২ অক্টোবর) বিকালে অনুষ্ঠিত ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি’ শীর্ষক বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকিতে বক্তারা এসব কথা বলেন। শুক্রাবাদে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিওতে বৈঠকি শুরু হয় বিকাল সাড়ে ৪টায়। মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করে এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজেও এটি লাইভ দেখানো হয়।
বৈঠকির আলোচনায় অংশ নেন সংগীতশিল্পী মাকসুদুল হক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়কারী আবদুল্লা আল মামুন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সালাহ উদ্দিন কাওসার বিপ্লব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবায়দা নাসরিন, বাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম ও বাংলা ট্রিবিউন সম্পাদক জুলফিকার রাসেল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবায়দা নাসরিনবৈঠকিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ফলে মানুষ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পায়। আর যেহেতু সবাই প্রতিক্রিয়া পেতে পছন্দ করে, তাই সেই সুযোগকেই মানুষ ব্যবহার করছে। এছাড়া অন্যদের কাছে নিজের গুরুত্ব বাড়ানো, রাজনৈতিক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও কারও দোষ-ত্রুটি নিয়ে কথা বলা, মজা করার যে প্রবণতা— এগুলোই কাজ করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের মূল ভিত্তি হিসেবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফিতে যারা জড়িয়ে পড়ে, তাদের বেশিরভাগই কিশোর-কিশোরী। এসব কিশোর-কিশোরীরা যেহেতু পরিবারের খুব কাছে থাকে, ফলে পরিবারকেই খেয়াল রাখতে হবে তাদের সন্তান কী করছে। কিভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে, সে সীমা লঙ্ঘন করছে কিনা, এগুলো পরিবারকেই দেখতে হবে। পরিবার থেকেই তার শিক্ষাটা সবার আগে দরকার।’
সংগীতশিল্পী মাকসুদুল হকসংগীতশিল্পী মাকসুদুল হক বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী নিজে বলতে পারে না সে আসক্ত কিনা। তবে কতটা সময় ব্যবহার করলে সেটাকে আসক্তি বলে, সেটা নির্ধারণ করাও কঠিন। এই আসক্তি তখনই বোঝা যায় যখন কেউ কেবল এইসব নিয়েই চিন্তা করেন এবং এর মধ্যেই ডুবে থাকেন। তবে আসক্তি নেতিবাচক নাকি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা দেখা জরুরি। আর এর জন্য সেটা কিভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেই জ্ঞানও থাকা দরকার।’
বিএসএমএমইউ মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সালাহ উদ্দিন কাওসার বিপ্লববৈঠকিতে বিএসএমএমইউ মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সালাহ উদ্দিন কাওসার বিপ্লব বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার যদি আমাদের আশপাশের মানুষকে অথবা পরিবার-পরিজনকে বিরক্ত না করে, তাহলে সেটাকে আসক্তি বলা যায় না। আবার এমনও হতে পারে, কেউ হয়তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একাধারে ব্যবহার করে যাচ্ছে এবং কোনোভাবেই এর থেকে বের হতে পারছে না। এটাকে আসক্তি বলা যায়।’
সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক দিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এগুলোর অনবরত ব্যবহারে শারীরিক, মানসিক সমস্যা হয়। তবে যেকোনও আসক্তিই অসুস্থতা। আর এ থেকে বের হতে সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে শিক্ষা নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও পারিবারিক শিক্ষাও সেক্ষেত্রে জরুরি।’
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়কারী আবদুল্লা আল মামুনবৈঠকিতে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়কারী আবদুল্লা আল মামুন বলেন, ‘মানসিক তৃপ্তি তখনই আসে, যখন আমার মানসিকতার সঙ্গে মিলে যাওয়া জিনিস সামনে আসে। আমার রুচির সঙ্গে মিলে যাওয়া জিনিসকে আমি চাইলেই সামনেই পাচ্ছি, এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। একই রুচির মানুষেরা সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রুপ বা ঘরানা তৈরি করছেন। এসব গ্রুপে নিজের রুচির সঙ্গে মিলে যাওয়া কনটেন্টই বারবার আসছে সামনে। এভাবেই তৈরি হচ্ছে আসক্তি।’
বাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলামবাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করার জন্যও সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষাটা খুবই প্রয়োজন। কিভাবে এই মাধ্যমকে কেউ ব্যবহার করবে, সেটাও তাকে আগে শিখতে হবে। যেমন— পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে কাউকে হয়তো ২৪ ঘণ্টার যেকোনও সময়ই ফেসবুকে বা অনলাইনে থাকতে হয়। পেশার প্রয়োজনের বাইরে কিন্তু তিনি ফেসবুক বা অনলাইনে থাকতেও পারেন, নাও থাকতে পারেন। তখন না থাকতে পারাটাই প্রমাণ করে তিনি সামাজিক মাধ্যমে আসক্ত নন।’
তিনি আরও বলেন, ‘একা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার বাড়াচ্ছি আমরা। আর সেটাই পরিণত হচ্ছে আসক্তিতে। এতে করে আমাদের ভার্চুয়াল জগতে হয়তো যোগাযোগটা বাড়ছে। কিন্তু বিপরীতে পারস্পারিক যোগাযোগটা কমছে। আমরা ভাবছি, এটা এক ধরনের সামাজিক যোগাযোগ। আসলে কিন্তু এটা তা নয়। বরং প্রকৃত সামাজিক যোগাযোগটাই কমছে।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীদের ঝুঁকির প্রসঙ্গ টেনে উদিসা বলেন, ‘নারীরা সবসময়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তবে আমি দেখেছি, কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তারা এই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। উঠতি বয়সী, অর্থ্যাৎ ১৩ বছরের আশপাশের মেয়ে বাচ্চাদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে সারারাত জেগে থাকে। দেখা যায়, তারা পরের দিন স্কুলে গেলেও পড়ালেখায় মনোযোগী থাকে না। এই বয়সটা তো মূলত একটি সম্পর্ক তৈরি হওয়ার বয়স। এই বয়সে একটি পার্টনার খোঁজার প্রবণতা তৈরি হয়। এটা করতে গিয়ে সে হয়তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না যে সে কার সঙ্গে সম্পর্ক করছে। আর এই বয়সে সঠিকভাবে পার্টনার খোঁজার মতো ম্যাচিউরিটিও থাকে না। ফলে সে একটি ভুল পথে পা দেয়।’
বাংলা ট্রিবিউন সম্পাদক জুলফিকার রাসেলবৈঠকিতে বাংলা ট্রিবিউন সম্পাদক জুলফিকার রাসেল বলেন, ‘আসক্তি বলতে বোঝায় যে, কেউ যখন সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে। কোনও ব্যক্তি তার পছন্দের জিনিসকেই বারবার খুঁজে থাকে, সেটাই এক ধরনের আসক্তি। তবে মানুষ কী ধরনের নিউজ বা লেখা বেশি সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি খুঁজে থাকেন, এ ধরনের কোনও স্টাডি বা প্রতিবেদন এখনও নেই। আবার কোন ধরনের নিউজের প্রতি মানুষ বেশি আকৃষ্ট, এ ধরনের গবেষণা প্রতিবেদনও নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে অনেকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কম থাকে। তখন সে সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধু খোঁজে। এগুলোও আসক্তির কারণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া একসময় ছিল যোগাযোগের মাধ্যম। এর মাধ্যমে দূরে থাকা পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করা যায় বলে এর গ্রহণযোগ্যতা ছিল অনেক বেশি। তখন থেকেই এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবেই নিয়েছি। তবে বর্তমানে এর মাত্রা একটু বেড়েছে। শেয়ার করা কিছুতে যত বেশি লাইক, তত বেশি ভালোলাগা কাজ করে সবার মধ্যে। নিউজ শেয়ার করা হলে সেটারও প্রসার বাড়ছে। আবার এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। উসকানি দিতে চায়— এমন ব্যক্তি বা নিউজ পোর্টাল ভুল তথ্য, বা ভুল খবর হেডলাইন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে, তখনও সেটাও ছড়িয়ে পড়ে দ্রুতগতিতে। আবার অনেকে ওইসব নিউজের হেডলাইন পড়েই কমেন্ট করে বসছেন, নিউজটি খুলে পড়েনও না।’
আরও পড়ুন-
‘প্রকৃত সামাজিক যোগাযোগ কমছে’


‘রুচির মিল থেকেই তৈরি হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি’

‘সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি’ শীর্ষক বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি শুরু

‘সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা থেকেই তৈরি হয় আসক্তি’

‘পুঁজিবাদ দিয়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তিকে ব্যাখ্যা করতে হবে’
‘কতটা সময় ব্যবহার করলে সেটাকে আসক্তি বলে, তা নির্ধারণ কঠিন’
‘সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বের হতে না পারলে সেটাকে আসক্তি বলা যায়’

/আরএআর/টিআর/

লাইভ

টপ