‘ঢাকা লিট ফেস্ট বাংলাদেশের এক অভাবনীয় অর্জন’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২১:৩৫, নভেম্বর ০৯, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫৭, নভেম্বর ০৯, ২০১৭

‘সীমানাই যখন কেন্দ্র’ শীর্ষক বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ দেশি-বিদেশি সাহিত্যিকদের এক বিশাল মিলনমেলা। এ মেলায় প্রতিবছর সীমানা পেরিয়ে একই কেন্দ্রে মিলিত হন দেশি-বিদেশি সাহিত্যিক ও সাহিত্যপ্রেমীরা। সাহিত্যকে ঘিরে এই আয়োজন পরিণত হয় উৎসবে, যেখানে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির বিনিময় হয়। সাহিত্যের যে কোনও সীমানা হয় না, সেটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই উৎসবে। আবার এই উৎসবকে ঘিরেই বিদেশি সাহিত্যিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্য, বাংলাদেশের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে। সাহিত্য নিয়ে বার্ষিক এই আয়োজন নিয়ে বিভিন্ন দেশের সাহিত্যিকদের মধ্যে আগ্রহও তৈরি হচ্ছে। ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ তাই বাংলাদেশের জন্য এক অভাবনীয় সাফল্য ও অর্জন।
বৃহস্পতিবার (৯ নভেম্বর) বিকালে অনুষ্ঠিত ‘সীমানাই যখন কেন্দ্র’ শীর্ষক বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকিতে বক্তারা এসব কথা বলেন। ১৬ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া সপ্তম ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’কে সামনে রেখে এই বিশেষ বৈঠকির আয়োজন করা হয়।
মুন্নী সাহামুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বৈঠকিতে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক আনিসুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কবি শামীম রেজা, দৈনিক আমাদের অর্থনীতির নির্বাহী সম্পাদক ও কবি মাসুদা ভাট্টি, ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায্ সিদ্দিকী ও আহসান আকবার, কথাসাহিত্যিক অদিতি ফাল্গুনী এবং বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল।
বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেলবৈঠকির শুরুতেই ‘সীমানাই যখন কেন্দ্র’ শিরোনামের যথার্থতা উল্লেখ করে বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল বলেন, ‘সাহিত্যের কোনও সীমানা নেই। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, আমার দেশেরই একদম প্রত্যান্ত অঞ্চলের কোনও লেখক যদি কিছু লিখেন, তখন তার লেখা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে যায় এবং তিনি বাংলাদেশকেই প্রতিনিধিত্ব করেন। আবার বিদেশি কোনও লেখক অথবা সাহিত্যিক কিন্তু নিজেও তার নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘‘ঢাকা লিট ফেস্ট এমনই একটি সাহিত্য সম্মেলন যেখানে দেশি-বিদেশি অনেক লেখক-সাহিত্যিক আসেন, আসবেন। তারা নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। এই যে লেখক-সাহিত্যিকদের মিলনমেলা, এটাকেই বলা হচ্ছে ‘সীমানাই যখন কেন্দ্র’।’’
ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায্‌ সিদ্দিকীলিট ফেস্টের বিভিন্ন আয়োজন সম্পর্কে জানিয়ে লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায্ বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা লিট ফেস্ট। এটা অত্যন্ত চমৎকার একটি আয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লেখক-সাহিত্যিকরা এসে যোগ দেবেন এই আয়োজনে। তিন দিনের এই উৎসবে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত থাকবে বিভিন্ন সেশন, লেখকদের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, শিশুদের আনন্দের জন্য বিভিন্ন ধরনের আয়োজন। একদম বিনামূল্যে যোগ দেওয়া যাবে এই উৎসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নামে লিট ফেস্ট হলেও এখানে বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা হবে, ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হবে। এছাড়াও থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ সুন্দর সুন্দর পরিবেশনা ও সেশন। আমি বিশ্বাস করি, কেউ তিন দিনের এই লিট ফেস্টে এলে চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ফিরে যেতে পারবেন।’
ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক আহসান আকবারলিট ফেস্ট আয়োজন করতে গিয়ে বিদেশি লেখকদের আমন্ত্রণ জানানোর অভিজ্ঞতা জানিয়ে লিট ফেস্টের আরেক পরিচালক আহসান আকবার বলেন, ‘বিদেশি কোনও লেখক বা সাহিত্যিককে আমন্ত্রণ জানালে তাদের প্রথম রিয়্যাকশনটাই থাকে খুবই পজিটিভ। তারা অনেক খুশি হন। তারা বলেন, বাংলাদেশ নামক দেশ থেকে আমাদেরকে খুঁজছেন? তারা এটাকে খুবই ইতিবাচকভাবে নেন। তারা তখন বাংলাদেশ সম্পর্কে আরও জানতে চান।’
এই আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এর আগেও যে বাংলাদেশে বিদেশি লেখকরা আসেননি, তা নয়। তারা এসেছেন, সেটা বিচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু লিট ফেস্টের এই আয়োজনের মাধ্যমে সবাই একসঙ্গে বসবেন, আড্ডা দেবেন, গল্পও করবেন। লেখকরা ব্যক্তিগতভাবে এলে এই মিথষ্ক্রিয়ার জায়গাটি তৈরি হয় না। এসব কারণেই ঢাকা লিট ফেস্টের গুরুত্ব এত বেশি। এর আগে এই আয়োজনে যারা এসে ঘুরে গিয়েছেন, তারা আবারও লিট ফেস্টে যোগ দিতে আগ্রহী বলে জানান।’
সাহিত্যিক অদিতি ফাল্গুনীএদিকে, এবারের লিট ফেস্টে নাজেরিয়ার কবি ও লেখক বেন ওক্রি আসছেন বলে উচ্ছ্বাস জানিয়েছেন সাহিত্যিক অদিতি ফাল্গুনী। তিনি বলেন, ‘আমি এবারের লিট ফেস্ট নিয়ে খুবই আনন্দিত। কারণ এই আয়োজনে আমার স্বপ্নের লেখক বেন ওক্রি আসছেন। ঢাকা লিস্ট ফেস্টের মাধ্যমে আমার স্বপ্নের লেখককে দেখতে পাবো— এটা যে কতটা আনন্দের, বলে বোঝাতে পারব না। ছোটবেলায় ব্রিটিশ কাউন্সিলে তার বই পড়েছিলাম। তখন থেকেই আমি তার ভক্ত। তাকে এবার সামনাসামনি দেখতে পাওয়াটা আমার জন্য বিশেষ কিছু।’
বৈঠকিতে বেন ওক্রির একটি উপন্যাসের প্রথম কয়েকটি লাইন পাঠ ও অনুবাদ করে অদিতি বলেন, ‘তিনি (বেন ওক্রি) মূলত একজন কবি। তবে কবিতার পাশাপাশি তিনি ফিকশনও লিখেন। তার লেখা খুবই ম্যাজিক্যাল। ছোটবেলা থেকেই তার বই পড়ছি, পড়ে বারবার অবাক হয়েছি। আমার পছন্দের এই লেখককে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য লিট ফেস্টের আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই।’
সাহিত্যিক আনিসুল হকদেশি-বিদেশি লেখক-সাহিত্যিকদের মিলনমেলা লিট ফেস্টে দেশি লেখকদেরও বিদেশি লেখকদের সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাহিত্যিক আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘অতিথিপরায়ণ হিসেবে আমাদের সুনাম তো রয়েছেই। লিট ফেস্টে আসা বিদেশি লেখকদেরও অনেক সমাদর করা হয়। তারা মুগ্ধ হয়ে ফিরে যান। আমি বলতে চাই, এই আয়োজকদের কাছে একজন বিদেশি লেখক যেমন সেবা বা আপ্যায়ন পান, দেশের একজন লেখককেও যেন সেই একই ধরনের সেবা বা আপ্যায়ন করা হয়। ধরুন, গ্রাম থেকে একজন লেখক এসেছে লিট ফেস্টে। তাকেও যেন বিদেশি একজন লেখকের সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।’
ঢাকা লিট ফেস্ট সম্পর্কে নিজের অনুভূতির কথা তুলে ধরে আনিসুল হক বলেন, ‘আমার কাছে যেকোনও উৎসবই ভালো লাগে। তার ওপর যদি সাহিত্যি উৎসব হয়, সেটা তো আরও ভালোলাগার বিষয়। এরও ওপরে সেই আয়োজনে আন্তর্জাতিক আবহ যুক্ত হলে তো কথাই নেই। ঢাকা লিট ফেস্ট এমনই একটি আয়োজন। এই আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে যেসব বিদেশি লেখকরা আসেন, তারা এখান থেকে মুগ্ধ হয়ে ফিরে যান। তাদের পরবর্তী লেখায় বাংলাদেশের নাম থাকলে সেটা তো আমাদের অনেক বড় পাওয়া।’
দৈনিক আমাদের অর্থনীতি পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ও কবি মাসুদা ভাট্টিবৈঠকিতে দৈনিক আমাদের অর্থনীতির নির্বাহী সম্পাদক ও কবি মাসুদা ভাট্টি বলেন, ‘আমার কাছে ঢাকা লিট ফেস্টের গুরুত্ব দুইটি জায়গায়। মূলত আমরা এখন খুবই বস্তুবাদী একটি সময়ে আছি, খুবই কমার্শিয়াল সময়ে বাস করছি। আমরা আলোচনা করি টাকার হিসাব নিয়ে; আমরা আলোচনা করি জঙ্গিবাদ নিয়ে; আমরা আলোচনা করি কোথায় কতজন মানুষ মারা যাচ্ছে, সেটা নিয়ে। কিন্তু কেউ সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করি না। আর সেই কাজটিই গর্বের সঙ্গে করে যাচ্ছে ঢাকা লিট ফেস্ট। দেশের অনেক টানাপড়েনের মধ্যেও এমন একটি লিট ফেস্ট বাংলাদেশে আয়োজন করা হয়— এটি খুবই ইতিবাচক উদ্যোগ।’
তিনি আরও বলেন, ‘লিট ফেস্টের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— বাংলাদেশকে বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্বের কাছে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়। সেটা হতে পারে অর্থনৈতিক, হতে পারে রাজনৈতিক। কিন্তু বাংলাদেশ এখন বিভিন্ন জায়গায় ইতিবাচক পরিচিতি লাভ করছে। বাংলাদেশের সাহিত্য বেশ খানিকটা পিছিয়ে ছিল। এখন সেই চিত্র বদলেছে। আমি মনে করি, সাহিত্যও একটি কমোডিটি। এখানেও আমরা অনেকখানি অর্জন করতে পেরেছি। একই কমিউনিটিতে সব সাহিত্যিককে একত্রিত করতে পারি। এটা গর্বের একটি বিষয়।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কবি শামীম রেজাঢাকা লিট ফেস্টকে কেন্দ্র করে অন্য দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের দেশের সংস্কৃতির বিনিময় ঘটছে বলে বৈঠকিতে মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কবি শামীম রেজা। তিনি বলেন, ‘গত সাত বছর ধরে এই সাহিত্য উৎসবের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতির বিনিময় আমরা করতে পারছি। এটা আমাদের অনেক বড় একটি অর্জন। এর মাধ্যমে ক্রমেই আমরা সাফল্য পাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা লিট ফেস্টের অন্যতম আকর্ষণ হলো বিদেশি সাহিত্যিকদের লেখার অনুবাদ। এই অনুবাদে পাঠকরা অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। এই ফেস্টকে কেন্দ্র করে এখন অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ভাষার উপন্যাস অনুবাদ করছে। এর মধ্যে ঢাকা ট্রান্সলেশন সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। এছাড়াও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানই এই কাজগুলো করে যাচ্ছে। আর এগুলো লিট ফেস্টকে সামনে রেখেই শুরু হয়েছে। এছাড়া ক্রমেই আমরা আমাদের আয়োজনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠছি। যেটুকু দুর্বলতা আছে, তা আগামীতে আর থাকবে না।’ সব মিলিয়ে ঢাকা লিট ফেস্ট এক অভাবনীয় সাফল্য বলে মনে করেন এই কবি ও শিক্ষক।
বৈঠকিটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয় এটিএন নিউজে। এছাড়া, বাংলা ট্রিবিউনের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ থেকেও সরাসরি সম্প্রচার করা হয় বৈঠকি। বৈঠকির খবর পড়তে চোখ রাখুন বাংলা ট্রিবিউনে।
আরও পড়ুন-

‘সীমানাই যখন কেন্দ্র’ শীর্ষক বৈঠকি শুরু
সাহিত্যের কোনও সীমানা নেই: জুলফিকার রাসেল

লিট ফেস্টকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতির বিনিময় ঘটছে: শামীম রেজা
লিট ফেস্টে আমার স্বপ্নের লেখককে দেখতে পাবো: অদিতি ফাল্গুনী
বিদেশি লেখকদের আমন্ত্রণ জানালে তারা খুব খুশি হন: আহসান আকবার
লিট ফেস্টে এলে চমৎকার অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যেতে পারবেন: সাদাফ সায্‌
দেশি লেখকদেরও যেন বিদেশি লেখকদের সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়: আনিসুল হক

অনেক টানাপড়েনের মধ্যেও লিট ফেস্ট আয়োজনের বিষয়টি ইতিবাচক: মাসুদা ভাট্টি

/আরএআর/টিআর/

লাইভ

টপ