‘বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন– অপেক্ষা করো, সময় আসছে’

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন
প্রকাশিত : ০৭:৪৭, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৩, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭

স্বাধীনতার অনেক আগেই পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সে (পিআইএ) কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র এয়ারলাইন্স স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি নিয়ে কথাও বলেন কয়েকজন কর্মকর্তা। তিনি বলেছিলেন, ‘অপেক্ষা করো, সময় আসছে’। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তান বিমান বাহিনী ও পিআইএতে কর্মরত বাঙালিরা মিলে ২৮ সেপ্টেম্বর গড়ে তোলেন স্বাধীন বাংলাদেশের বিমানবাহিনী আর স্বাধীনতার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। স্বাধীনতা যুদ্ধে ২৮ জন পাইলট, কর্মকর্তা, কর্মচারী শহীদ হন।

মুক্তিযুদ্ধে বিমান কর্মীরাস্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের। যদিও প্রাথমিকভাবে নাম রাখা হয়েছিল এয়ার বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল। এ সংস্থায় ছিলেন ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ বীর উত্তম। সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপচারিতায় মুক্তিযুদ্ধ ও এর আগের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ ঢাকা কলেজ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে ভর্তি হন ইস্ট পাকিস্তান ফ্লাইং ক্লাবে। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৬৭ সালে পান কর্মাশিয়াল পাইলট লাইসেন্স। পাইলট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করতে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সে (পিআইএ) আবেদন করেন। তখনও আকরাম আহমেদ বুঝতে পারেননি বাঙালিদের সঙ্গে পাকিস্তানিদের বৈষম্য কী পর্যায়ের হতে পারে।
আকরাম আহমেদ বলেন, ‘পিআইএ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল, সেটা দেখে আবেদন করেছিলাম। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার এক মাস পেরোলেও ফল প্রকাশ করেনি পিআইএ। তখন পিআইএর চেয়ারম্যান ছিলেন এয়ার মার্শাল আজগর খান; তিনি দুদিনের সফরে ঢাকা এসেছিলেন। হোটেল ইন্টারকনে উঠেছেন, সেই খবর পেয়ে পরীক্ষার খবর জানতে আমরা দুই-তিনজন বন্ধু গেলাম সেখানে। সারা সকাল বসে থেকে দুপুরে দিকে তাকে দেখে ছুটে গেলাম কাছে। জানালাম এক মাস পার হলেও ফলের কোনও খবর নেই। আজগর খান জানালেন তিনি করাচি ফিরে গিয়ে দেখবেন। তিনি যাওয়ার দুদিন পরে ফল প্রকাশ হয়; আমি টিকে যাই।’
আলাপচারিতায়  ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ বীর উত্তম১৯৬৮ সালের শুরু দিকে পিআইএয়ে যোগ দিতে করাচি যান আকরাম আহমেদ। এর পরই টের পেতে শুরু করেন বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানিদের নিগ্রহ ও বৈষম্যমূলক আচরণের ভয়াবহতা।
তিনি বলেন, ‘করাচি গিয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম পিআইএতে। এরমধ্যে এক সময় পিআইএর কর্মকর্তারা জানালেন, আমাদের মেডিক্যাল টেস্ট হবে, শুধুমাত্র তাদেরই যারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে গেছে। পরে হার্টে সমস্যা আছে বলে আমাকে মেডিক্যালে বাদ দিলো। আমি তখন খুব ঝগড়া করেছিলাম পিআইএর চিফ মেডিক্যাল অফিসারের সঙ্গে। এরপর সিভিল এভিয়েশনে থেকে আমার কর্মাশিয়াল পাইলট লাইসেন্স স্থগিত করে দেওয়া হয়। আমি যোগাযোগ করলে সেখান থেকে জানানো হয়, এয়ারফোর্সের মেডিক্যাল টেস্ট করতে হবে। সেটাতে কোনও সমস্যা ধরা পড়লো না, তাতেও কাজ হয়নি। তখন বলা হল, পাকিস্তান আপিল মেডিক্যাল বোর্ড ছাড়পত্র দিলেই আমি লাইসেন্স ফিরে পাবো। আমি করাচি থেকে রাওয়ালপিন্ডি গেলাম, এক সপ্তাহ সেই হাসপাতালে ছিলাম। তখন সেখানের রিপোর্টে কোনও সমস্যা ধরা না পড়ায় লাইসেন্স ফিরে পেলাম।’
আকরাম আহমেদ আরও বলেন, ‘লাইসেন্স ফিরে পেয়ে আবার গেলাম পিআইএতে। কিন্তু ফিরে যাওয়ার পর পিআইএর চিফ অব অপারেশন আমাকে বললেন, প্রশিক্ষণ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। পরের ব্যাচের প্রশিক্ষণ শুরু হলে আমাকে জানানো হবে। কিন্তু কিসের কী, আমাকে আর ডাকেইনি।’
পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে ১৯৬৯ সালে প্ল্যান্ট প্রটেকশন বিভাগে পাইলট হিসেবে যোগ দেন আকরাম আহমেদ। সেখানে ভিবার উড়োজাহাজ দিয়ে ফসলের ক্ষেত্রে ওষুধ ছিটানো হতো। সেই ভিবার উড়োজাহাজ চালাতেন আকরাম আহমেদ।
মুক্তিযুদ্ধে বিমানের কর্মীরাতিনি বলেন, ‘সেই সময়ে বাঙালি পাইলটরা সবাই মিলে চেষ্টা করল বাঙালি পাইলটদের একটা আলাদা অ্যাসোসিয়েশন করতে। ইস্ট পাকিস্তান পাইলট অ্যাসোসিয়েশন নামে এটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এটা করতে গিয়েও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। নানাভাবে বাধা দেওয়ার হয় যেন সংগঠন হিসেবে রেজিস্ট্রেশন না হয়। তখন সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন পেতে আদালত পর্যন্ত যেতে হয়। পরে আদালতের রায়ে ইস্ট পাকিস্তান পাইলট অ্যাসোসিয়েশন নিবন্ধনের সুযোগ পায়। এরপর আমারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করি। তাকে আলাদা এয়ারলাইন্স করার জন্য বললাম। বঙ্গবন্ধু আমাদের বলেছিলেন, অপেক্ষা করো, সময় আসছে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সমাবেশে আমরা অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে যোগ দিয়েছিলাম।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে আকরাম আহমেদ বলেন, ‘আমরা চিন্তা করলাম ভারত চলে যাবো। কয়েকবার যেতে চেষ্টা করেও যেতে পারিনি। আমি অফিস করছিলাম প্ল্যান্ট প্রটেকশনে। আমার অফিসের বস ছিল এক পাকিস্তানি মেজর। সে আমাকে নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। ভারত থেকে আমার বন্ধু ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন মে মাসের দিকে আমার বাসায় আসে। তখন আমি ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন সঙ্গে ভারতে চলে যাই।’
আকরাম আহমেদ বলেন, ‘আগরতলায় পৌঁছে টিচার্স ট্রেনিং সেন্টারে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এসব দেখাশোনা করতেন মতিয়া চৌধুরী ও পঙ্কজ ভট্টাচার্য। সেখানে মাসখানেক বসে বসেই সময় পার হয়ে গেলো। একদিন আমি খালেদ মোশাররফকে বললাম, দুই নম্বর সেক্টরে যোগ দিতে চাই। আগস্টের শেষদিকে আমাদের ক্যাম্পের সামনে ভারতীয় বিমানবাহিনীর ট্রাক এলো, আর আমাদের কয়েকজনের নাম ধরে খুঁজতে লাগলো। আমারা তাদের সঙ্গে কথা বললাম, তবে কোথায় যেতে হবে তখনও আামাদের কিছুই জানানো হয়নি। আমাদের নেওয়া হলো আগরতলা এয়ারপোর্টে, দেখলাম সেখানে ডাকোটা-৩ (ডিসি-৩) উড়োজাহাজ। সেই উড়োজাহাজ আমাদের নিয়ে সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে আকাশে উড়লো, তখনও আমরা জানি না কোথায় যাচ্ছি, কী হবে। তখন জানলাম, ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে আছি। সেখানে কয়েকদিনের মধ্যে স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ, ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোহাম্মাদ শামসুল আলম, ক্যাপ্টেন মুকিত, ক্যাপ্টেন বদরুল আলম, ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার, ক্যাপ্টেন খালেক, ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিনসহ আরও বাঙালি পাইলটরা এলেন।
রাখা হয়েছে রাস্তার নামআকরাম আহমেদ বলেন, ‘২৭ সেপ্টেম্বর আমাদের ব্রিফ করা হয়, সেখানে তৎকালীন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার, ভারতের পিসি লাল আসবেন। পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। এ বাহিনী গঠনের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে পুরনো দুটি বিমান ও একটি অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিলো একটি ডাকোটা-৩ (ডিসি-৩) এবং একটি অটার বিমান। এগুলোর কোনোটিই যুদ্ধযান ছিল না। আমাদের প্রথম পরিল্পনা ছিল তেজগাঁওয়ের রাডার স্টেশন গুঁড়িয়ে দেওয়া।
আকরাম আহমেদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার স্বাধীন দেশের বিমান বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পান। পাকিস্তান এয়ারফোর্স, পিআইএ এবং প্ল্যান্ট প্রটেকশনের বাঙালি পাইলট ও টেকনিশিয়ান যোগ দিলেন আমাদের সঙ্গে। ভারত আমাদের বিমান ও হেলিকপ্টারের জন্য মেশিনগান, রকেট, পড এবং জ্বালালি তেল দিলো।
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর আমাদের প্রশিক্ষণ শুরু হলো। ভারতীয় বিমান বাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার সঞ্জয় কুমার চৌধুরী, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সিএম সিংলাসহ বেশ কয়েকজন অফিসার আমাদের প্রশিক্ষণ দিতে লাগলেন। লো-ফ্লাই, নাইট ফায়ারিংসহ যুদ্ধের কৌশল আমাদের শেখানো হয়।’
৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারি ও নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেল ডিপোতে আক্রমণ করে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। এ অভিযানে অংশ নেন ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ। এ অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খুব লো লেভেলে ফ্লাই করে গেলাম। রাতের অন্ধকারে লো-ফ্লাই খুব কষ্টের। কিন্তু রাডার এড়াতে লো-ফ্লাই করতে হয়েছে। আমাদের টার্গেট চট্টগ্রামের পতেঙ্গার তেলের ডিপো। আমি আর শামসুল আলম উড়োজাহাজে, সঙ্গে এয়ারম্যান, গানম্যান ও বোম্বার। ফেনী জেলা ধরে আমরা এগিয়ে যাই। চাঁদের আলোয় ডিপো দেখতে পেয়ে রকেট ছুড়লাম। এরপর একইভাবে সেখান থেকে নিরাপদে ফিরে গেলাম। তবে সেটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ, আমাদের ল্যান্ডিং নির্দেশ ছিল কুড়িগ্রামে। ফুয়েল কম, ফলে ভুল পথে সময় নষ্ট হলে বিপদ। তবে আমরা নিরাপদে পৌঁছেছিলাম। এরপর আমরা বিভিন্ন সময় সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অপারেশন করেছিলাম।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিমান বাহিনীতে ফিরে না গিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যোগ দেন ক্যাপ্টেন আকরাম। বিমানের ফ্লাইট অপারেশনস পরিচালক পদ থেকে অবসরে যান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ডিসি-৩ বিমানটি দিয়ে দেয়। সেটি দিয়ে যাত্রা শুরু করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। একটি ট্রেনিং ফ্লাইটে ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিধ্বস্ত হয় ডিসি-৩ উড়োজাহাজ। এ দূর্ঘটনায় বীর উত্তম ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিন আহমেদ ও বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন আবদুল খালেক মারা যান। সেই ফ্লাইটে আমারও যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বসন্ত হওয়ায় আমার যাওয়া হয়নি।
বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ ) শাকিল মেরাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পিআইএ কর্মরত ২৮ জন বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তাদের স্মরণে কুর্মিটোলায় বলাকা ভবনের সামনে মুক্তিযুদ্ধ শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। এটি উদ্বোধন করা হয় ১৯৯৯ সালের ২৮ অক্টোবর।
মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছেন তারা হলেন, ফজলুল হক চৌধুরী, ক্যাপ্টেন আমিরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন সিকান্দার আলী, ক্যাপ্টেন এটিএম আলমগীর, ক্যাপ্টেন এনএন হায়দার, প্রকৌশলী আফসার হোসেন, এমএস আনোয়ার, তরিকুল আলম, আলী হোসেন চৌধুরী, এবি তালুকদার, মিজানুর রহমান, কাওসার আলী মোল্লা, আলী আশরাফ, শরিফুল আলম, এলবার্ট রোজারিও, স্টোর কিপার আলী আশরাফ, খুরশীদ আলম, এ আজিজ খয়রাতী, মীর সাহেব, লুৎফুর রহমান, রাম চরণ, মোহাম্মদ সাদেক, জামশেদ আলী, মোহাম্মদ ইসমাইল, এনায়েত হোসেন, সিকান্দার আলী, দর্শন আলী ও আনোয়ার।

/এএম/আপ এমও/

লাইভ

টপ