নির্বাচনকালীন সরকার: কী আছে সংবিধানে

Send
এমরান হোসাইন শেখ
প্রকাশিত : ১৯:৪৩, জানুয়ারি ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:৩২, জানুয়ারি ১৪, ২০১৮

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বরারবই বলে আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। সেই সময় গঠিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার। সেই সরকার সহায়ক সরকারের ভূমিকায় থেকে নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচনকালীন সরকার বলে সংবিধানে কোনও বিধান নেই। নেই অন্তর্বর্তীকালীন বা সহায়ক সরকারের বিধানও। সেই হিসেবে বিদ্যমান সরকারই নির্বাচনের সময় চলমানভাবে দায়িত্ব পালন করে যাবে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় এ সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে সার্বিকভাবে সহায়তা করবে।

প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ আগাগোড়াই বলে আসছে নির্বাচনের সময় সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারই বহাল থাকবে। ওই সময় নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে সহায়তা করতে সরকার সহায়ক সরকারের ভূমিকা পালন করবে।

গত মাসে রামকৃষ্ণ মিশনের এক অনুষ্ঠানে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ বিষয়ে বলেন, ‘আগামী নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ীই হবে। নির্বাচন কমিশনকে সব ক্ষমতা দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার সে সময় সহায়ক সরকারের ভূমিকা পালন করবে। রুটিন দায়িত্ব পালন করবে। এই ব্যবস্থাতেই নির্বাচন হবে। এটাই আমাদের সংবিধানের নিয়ম।’ সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও দলের শীর্ষ নেতারাও ঘুরেফিরে একই ধরনের মন্তব্য করে আসছেন।

সবশেষ গত শুক্রবার সরকারের চার বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘কিভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তা আমাদের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বোতভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।’

এদিকে, সংবিধানের বিধানের কথা উল্লেখ করে সরকার সমর্থিত আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী একটি সরকার থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে আরেকটি সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। আর নির্বাচনের সময় আগের নির্বাচিত সরকারই তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে। এই দায়িত্ব পালনের বিষয়টি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় যে বিধান, জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তাই। এর অর্থ হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় সরকার যেভাবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখে জাতীয় ‍নির্বাচনের সময়ও বিদ্যমান সরকারই স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে।

তারা আরও বলছেন, নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এক্ষেত্রে সরকারের কর্তব্য হবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে সহায়তা করা। নির্বাচনের সময় সরকারের আকার ছোট করা বা কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিকে নিয়ে সরকার গঠনের কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। এমন কি টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। তবে,সরকারের আকার ছোট বা বড় করার এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে। এটা তার সাংবিধানিক ক্ষমতা। তিনি যেকোনও সময় তা করতে পারেন। তিনি চাইলে সেটা এখন যেমন করতে পারেন, নির্বাচনের আগেও করতে পারেন। এতে সংবিধানের কোনও ব্যত্যয় হবে না।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা জানান, নির্বাচন কারও অধীনে অনুষ্ঠানের কথা সংবিধানে নেই। জাতীয় নির্বাচনের সময় সরকারের ধরন পরিবর্তন হবে– এমন বিধানও নেই।

সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনসহ সব ধরনের নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন। তবে এ সময়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ইসির কাছে ন্যস্ত হতে হবে এমনটিও সংবিধানে উল্লেখ নেই। এ বিষয়ে সংবিধানে বলা আছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনীয় কর্মচারী নিযুক্ত করবেন। সরকারের নির্বাহী বিভাগ ইসিকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে।

সংবিধানের এই দুই বিধানের আলোকে সরকারের ইসিকে সহযোগিতা করা ও নির্বাচনকালে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইসির পরামর্শ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং নির্বাচনি বিধিমালার আলোকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের বদলি, পদায়নসহ কিছু কিছু কাজে সরকারকে কমিশনের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে–এমন উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন, নির্বাচনের সময় সরকারি প্রটোকল গ্রহণ, ডাকবাংলোসহ সরকারি স্থাপনার ব্যবহার বা এ জাতীয় কিছু কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ আরোপ থাকে।

আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা জানান, বর্তমান দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে ‘সর্বদলীয় সরকার’ গঠন করা হলেও এটির কোনও প্রয়োজন ছিল না। সব রাজনৈতিক দল যাতে নির্বাচনে অংশ নেয় সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই সরকার গঠন করেছিলেন।

ওই নেতাদের মতে, তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে তাদের মন্ত্রিসভায় স্থান দিতেই প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ওই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ওই সময় বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে মন্ত্রিসভায় তার দলের প্রতিনিধি দেওয়ারও প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু বিএনপি না আসায় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অন্য দলগুলোকে নিয়ে তিনি ওই সরকার গঠন করেন। আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, বাহ্যিকভাবে ওই সরকারটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচনকালীন সরকার’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও বাস্তবে সেটা ছিল স্বাভাবিক সরকারই।

সংবিধানের বিধান অনুসারে, বিদ্যমান সরকার ক্ষমতায় থাকতেই পরবর্তী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে গেলেও সরকারের ওপর তার প্রভাব পড়বে না। সংবিধানের ৫৭(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এই অনুচ্ছেদের কোনোকিছুই অযোগ্য করিবে না।’

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর অর্থ হচ্ছে যিনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি নতুন একজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকবেন। অর্থাৎ এ বিধান অনুসারে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বপদে বহাল রেখেই নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করবে। প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি তার সরকারের মন্ত্রিসভার ক্ষেত্রেও সংবিধানের একই বিধান।

সংবিধানের ৫৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিলে বা স্বীয় পদে বহাল না থাকিলে মন্ত্রীদের প্রত্যেকে পদত্যাগ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে; তবে এই পরিচ্ছেদের বিধানাবলী-সাপেক্ষে তাহাদের উত্তরাধিকারীগণ কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাহারা স্ব স্ব পদে বহাল থাকিবেন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইল আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংবিধানে সহায়ক সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোনও বিধান নেই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও এ ধরনের কোনও বিধান আছে বলে জানা নেই। সংবিধানে বলা আছে, কোনও সরকার নির্বাচন করবে না। নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন। আর নির্বাচনের সময় বর্তমান সরকারই দায়িত্বে থাকবে। সরকার ভোটের জন্য কর্মকর্তা নিয়োগসহ কমিশন যা চাইবে তা করতে বাধ্য থাকবে।’

দশম সংসদ নির্বাচনের মতো এবারও ‘সর্বদলীয় সরকার’ গঠনের প্রয়োজন হবে কি না এমন প্রশ্নে তৎকালীন এই মন্ত্রী বলেন, ‘ওই নির্বাচনে যাতে বিএনপি আসে–সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকার গঠনের কথা বলেছিলেন। এজন্য আমরা কয়েকজন পদত্যাগও করি। তবে এটার বাধ্যবাধকতা ছিল না। আর এবার এ ধরনের সরকারের কোনও প্রয়োজন হবে না। কারণ, যাদের নিয়ে ওই সর্বদলীয় সরকার গঠন হয়েছিল, তাদের প্রতিনিধি তো বর্তমান সরকারেই রয়েছেন।’

ভোটের আগে টেকনোক্র্যাট কোটার মন্ত্রীদেরও পদত্যাগের প্রয়োজন হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সরকার যেভাবে রয়েছে সেভাবেই চলবে। তাদের অতিরিক্তি দায়িত্ব থাকবে ইসিকে সহযোগিতা করা।’

আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক স ম রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচনকালীন সরকারের কোনও বিধান নেই। নির্বাচনের সময় বর্তমান সরকার স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করে যাবে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের সময় সরকারের আকার ছোট করতে হবে এমন কোনও বিধান নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী চাইলে সেটা করতে পারেন। তিনি চাইলে ছোট না করে সরকারের আকার বড়ও করতে পারেন। এতে সংবিধানের কোনও ব্যত্যয় ঘটবে না।’

বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়াও একই কথা বলেন। তিনি বলেন,‘সংবিধানে নির্বাচনকালীন বা সহায়ক সরকারের কোনও কথা নেই। সরকার যে অবস্থায় আছে, নির্বাচনের সময় সেই অবস্থায় দায়িত্ব পালন অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় যেমনটি থাকে, জাতীয় নির্বাচনের সময়ও সেইভাবে সরকার থাকবে।’

বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কোনও বিধান সংবিধানে নেই। ক্ষমতাসীন সরকারই নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করবে। এক্ষেত্রে সরকার চাইলে তার কোন কোন কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে। তবে বিরত যে থাকতেই হবে–এমন কোনও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই।’

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে স্পষ্ট করে বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার থাকবে। এর মানে হচ্ছে, নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশন স্বাধীন থাকবে এবং তাকে সহায়তা করতে কমিশন সরকারের কাছে চাইবে তা দিতে হবে। কিন্তু যে সরকার আগের নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছে সেই সরকারই দেশের ডে টু ডে রানিং থাকবে। এরপর নির্বাচনে যে জয়লাভ করবে তার কাছে ওই সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।’

‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে’ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বিষয়টি ক্ল্যারিফিকেশন দেখে জানাবেন বলে জানান।

 

/এএম/

লাইভ

টপ
x