দুই মারমা বোনকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে রাজধানীতে নাগরিক সমাবেশ

Send
ঢাবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৯:৫১, জানুয়ারি ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৩, জানুয়ারি ২৬, ২০১৮

নাগরিক সমাবেশে বক্তারা (ছবি: সংগৃহীত)রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়িতে দুই মারমা বোনকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অনুষ্ঠিত হলো নাগরিক সমাবেশ। শুক্রবার (২৬ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় এর আয়োজন করে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম। সমাবেশে ওই ঘটনায় বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে সংহতি জানানো হয়।

এ সময় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস। তিনি বলেন, ‘আমরা খুব বিক্ষুব্ধ মন নিয়ে এখানে দাঁড়িয়েছি। কিছুদিন আগে সমাজবিজ্ঞানের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্ষনের সঙ্গে যৌনতার কোনও সম্পর্ক নেই। এটা নারীর প্রতি প্রতিশোধমূলক আচরণ। প্রতিটি দেশে যুদ্ধের সময় নারীরা ধর্ষিত হয়। কিছুদিন আগে মিয়ানমারেও তাই হয়েছে। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরাও আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে।’

অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌসের মন্তব্য, সংখ্যালঘুরা যদি ভালো থাকে তাহলেই বোঝা যায় একটি দেশ ভালো চলছে। তার প্রশ্ন, ‘কিন্তু বাংলাদেশে কি আদৌ সংখ্যালঘুরা ভালো আছে? আমাদের মনে রাখতে হবে— ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে বাংলাদেশ।’

ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় সরকার ও সেনাবাহিনীর কাছে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের আদিবাসীরা প্রতিনিয়ত নির্যাতন ও নিপীড়নের মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক আচরণের কারণে আদিবাসীরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। বাঙালি হিসেবে আমি লজ্জিত ও শঙ্কিত হই, যখন দেখি রক্ষক নিজেই হয়ে ওঠে ভক্ষক। আমরা জানাই।’

ঢাবির আরেক শিক্ষক অধ্যাপক মেজবাহ কামাল মনে করেন, ‘এসব বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদী উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে এগুলো ঘটানো হচ্ছে।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত শিগগিরই পাহাড় থেকে ৫০০’র বেশি অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবি জানান। এর মাধ্যমে পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব বলে মন্তব্য তার।

ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সহিংসতা ও শ্লীলতাহানির অভয়ারণ্য। সেখানে সাম্প্রদায়িকতা ও অন্ধ ধর্মান্ধতার মতো উগ্রতা বিরাজ করছে।’

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণের দাবি জানান বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। ‘ভুক্তভোগী পরিবারকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া, সব ধরনের হয়রানি আর হুমকি-ধামকি বন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের সুচিকিৎসা করা এবং যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘আদিবাসী নারীসহ সব নির্যাতনের বিচার দ্রুত ও যথাযথভাবে সম্পন্ন করার দাবি জানাই আমরা। একইসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে।’

অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আরডিসির জান্নাত-ই ফেরদৌসী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রেখা চৌধুরী, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তন্ময়, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক নিপন ত্রিপুরা, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রিবেং দেওয়ান, বিএমএসসি ঢাকা মহানগরের সভাপতি নু মং প্রু মারমা, আদিবাসী নারী প্রতিনিধি হেলি চাকমা, হাজং ছাত্র সংগঠনের অলক হাজং, সান্তাল স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ইলিয়াস মুরমু ও সোহেল হাজং।

বক্তারা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের আদিবাসীদের সামগ্রিক বাস্তবতা মোটেও ভালো নেই। আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগণের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন ও অত্যাচারের মাত্রা ক্রমে বেড়ে চলেছে। পাহাড়ে ও সমতলে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কিন্ত এসব ঘটনার যথাযথ প্রতিকার মিলছে না। ক্ষতিগ্রস্তরা পাচ্ছেন না ন্যায়বিচার। অনেক ক্ষেত্রে রক্ষক নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। দুই-একজনের কারণে কেন সবাই দোষী হবে?’

নাগরিক সমাবেশে সংহতি জানিয়েছে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, এএলডি, আইইডি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, নারীপক্ষ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন, জনউদ্যোগ, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যাক্টিভিজম, কাপেং ফাউন্ডেশন, আরডিসি, আদিবাসী কালচারাল ফোরাম, পিসিপি, বাগাছাস, গাসু, সাসু, জেএইউপি, আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, কুবরাজ, বাআছাসপ, বিএমএসসি, টিএসএফ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, জাতীয় হাজং ছাত্র সংগঠন, বাহাছাস ও হাসুকসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

গত ২২ জানুয়ারি গভীর রাতে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের ওড়াছড়ি গ্রামে অভিযান চালান সেনাবাহিনী ও আনসার সদস্যরা। এ সময় এক মারমা পরিবারের বড় বোনকে (১৮) ধর্ষণ ও ছোট বোনকে (১৩) যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। নির্যাতনের শিকার দুই বোনকে ২৩ জানুয়ারি রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

/এসআই/জেএইচ/

লাইভ

টপ