দুর্ঘটনায় বীমার টাকা পান না ভুক্তভোগীরা

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১০:১৯, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৩, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৮

সড়ক দুর্ঘটনাদুর্ঘটনায় ভুক্তভোগীদের আর্থিক সুবিধা দিতে লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক করা হলেও অধিকাংশই বীমার টাকা পান না। মূলত ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, যানবাহন মালিক ও ভুক্তভোগীদের অনীহার কারণে তারা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তবে প্রভাবশালী বাস মালিকরা এ সুবিধা পান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন গড়ে ১৫-২০ হাজার মানুষ। যার মধ্যে এক তৃতীয়াংশ মানুষ নিহত ও দুই তৃতীয়াংশ আহত হন। এসব ভুক্তভোগীর আর্থিক সুবিধা দিতে সরকার ‘অ্যাক্ট লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স’ বাধ্যতামূলক করে। কিন্তু নানা জটিলতা, অনীহা ও অনিয়মের কারণে এর কোনও সুবিধাই পান না তারা।

বীমা আইন অনুযায়ী,সড়ক দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ির ঝুঁকি গ্রহণকারী বীমা কোম্পানি নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেবে। এক্ষেত্রে নিহতের পরিবার ২০ হাজার, আহতরা ৫-১০ হাজার এবং সম্পত্তি নষ্ট হলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেবে বীমা কোম্পানি।

আইন অনুযায়ী, প্রতিটি যানবাহনের দুর্ঘটনা বা ঝুঁকির বিপরীতে ‘অ্যাক্ট লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স’ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। তাছাড়া এই বীমা না করলে যানবাহনের নিবন্ধন লাইসেন্স দেওয়া হয় না। এমনকি বীমা না করা থাকলে জরিমানা আদায়সহ মামলা দেয় ট্রাফিক। কিন্তু আদায় করা টাকার কোনও অংশই ভুক্তভোগীরা পান না।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির ২০১৭ সালের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে চার হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জন নিহত এবং আহত হন ১৬ হাজার ১৯৩ জন। বীমা আইন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে নিহত সাত হাজার ৩৯৭ জনের পরিবার ১৪ কোটি ৭৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা। আর আহতদের সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা করে মোট আট কোটি ৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পরিশোধ করার কথা। অথচ তারা কেউ বীমা বাবদ টাকা পাননি।ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে শনিবার বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ

এ বিষয়ে বাংলাদেশ গ্রীন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাইফুদ্দিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারের সদস্যদের থানায় অভিযোগ করতে হয়। কারণ,ক্ষতিপূরণ পেতে পুলিশের রিপোর্ট লাগে। কিন্তু কেউ অভিযোগও করেন না, আমরা রিপোর্টও পাই না। তাহলে বীমা দাবি পরিশোধ করবো কী করে? তবে যারা থানায় অভিযোগ করেন এবং রিপোর্ট সংগ্রহ করেন আমরা তাদের দাবি দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর থানায় অভিযোগ না করার বড় কারণ হলো বীমার দাবি মাত্র ২০ হাজার টাকা। এই সামান্য টাকার জন্য কেউ এগুতে চায় না। আবার আইন অনুযায়ী,চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং যানবাহনের আপডেট কাগজপত্র না থাকলে সংশ্লিষ্টরা বীমা কোম্পানি দাবি পরিশোধ করতে পারে না। সে কারণেও টাকা পাওয়া যায় না।’

এই ইন্স্যুরেন্স কর্মকর্তা বলেন,‘আইনে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তরা ২০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ পাবেন। যখন এই আইনটি করা হয়েছে তখন ২০ হাজার টাকার অনেক মূল্য ছিল। এখন এ টাকা দিয়ে কিছুই হয় না। সে জন্য কেউ ক্ষতিপূরণ চান না। যদি ক্ষতিগ্রস্তদের আগ্রহ বাড়াতে হয় তাহলে আইন সংশোধন করে বীমার প্রিমিয়াম ও বীমা দাবি আরও বাড়াতে হবে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বীমা দাবি পেতে অনেক ঝামেলা হয় এবং সময় লাগে। বড় পরিবহন মালিকরা দেনদরবার করে কিছুটা পান।’

তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ফার্স্ট ও থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স হয়ে থাকে। ফার্স্ট পার্টি ইন্স্যুরেন্সে পরিবহন মালিকরা দ্রুত টাকা পান। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো তাদের হয়রানি করে না। আর থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স মূলত যাত্রী, চালক ও হেলপারদের জন্য। এক্ষেত্রে যাত্রীরা অভিযোগ করলেও যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন তা সরবরাহ করতে পারেন না। ফলে তাদের টাকা পরিশোধ করা হয় না।’

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন,‘বীমা কোম্পানির কাছে বীমা দাবি পাওয়া যায় না। এ জন্যই কেউ অভিযোগ করতে চান না। আর কেউ অভিযোগ করলে তাকে বিভিন্ন দফতরে দফতরে ঘুরতে হয়। একটা ক্লেইম (দাবি) প্রমাণ করতে থানা-পুলিশ থেকে শুরু করে যেসব তথ্যের প্রয়োজন তা জোগাড় করতে ৩০/৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। তাই মাত্র ২০ হাজার টাকার জন্য কেউ ৩০/৪০ হাজার টাকা খরচ করবে না। তাছাড়া অনেকেই বিষয়টি জানেন না। সে কারণেই এই টাকা কোম্পানিগুলোর কাছেই থেকে যায়।’

 

/এসএনএইচ/টিএন/আপ-এফএস/

লাইভ

টপ