প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান: পুড়ে যাওয়া লাশের চেহারা স্বজনরাও চিনবেন না

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৮:১০, মার্চ ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৩২, মার্চ ১৩, ২০১৮

সাংবাদিক ভদ্র শর্মা ও আশিক কাঞ্চন‘অনেক লাশের চেহারা ৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে। সেই চেহারা স্বজনদেরও চিনতে কষ্ট হবে। আমি সোমবার (১২ মার্চ) থেকে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখেছি—কী ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য।’ নেপাল প্রবাসী আশিক কাঞ্চন টেলিফোনে বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘শনাক্ত করা কঠিন হলে লাশ নিয়ে যাওয়াও কঠিন হবে। এর জন্য ১৫ পৃষ্ঠার একটি ফরম পূরণ করতে হবে। সব তথ্য থাকতে হবে স্বজনদের কাছে।’

আশিক কাঞ্চন নেপালে প্রবাসী বাংলাদেশি তরুণ, কাজ করেন উইন্ডমিল কোম্পানিতে। এছাড়া বাংলা ট্রিবিউনের কথা হয় নেপালি সাংবাদিক ভদ্র শর্মার সঙ্গে, যিনি ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন, ‘বিধ্বস্ত বিমানটির দিকে তাকিয়ে দেখি—এটি টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। বেশিরভাগ অংশই পুড়ে গেছে। সেখানে ছেঁড়া কাগজ, সিটের ছিন্নভিন্ন টুকরো, পোড়া কাপড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।’

সোমবার (১২ মার্চ) অবতরণের সময় নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় হতাহতদের ৪৬ জন স্বজনকে মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) সকালে বিশেষ ফ্লাইটে নেপালে নিয়ে গেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

সংস্থাটির জেনারেল ম্যানেজার (মার্কেটিং অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) কামরুল ইসলাম জানান, ৬৭ যাত্রী ও চার জন ক্রু নিয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে বিমানটি। যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশি ৩২ জন, নেপালি ৩৩ জন, মালদ্বীপের একজন, চীনের একজন  ছিলেন।

ঘটনাস্থলের প্রথম অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘শুরুতেই ভেবেছিলাম সব যাত্রী মারা গেছেন। অন্তত বিমানটি দেখে তা-ই মনে হয়েছিল। কারণ, সেখানকার ঘাসও পুড়ে ছাই। কিন্তু কিছু যাত্রী নিজেরাই জানালা ভেঙে ফেলতে সক্ষম হন এবং বেরিয়ে আসেন। কেউ কেউ ইঞ্জিনে আগুন লাগার আগেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। সে কারণেই তারা বাঁচতে পেরেছেন।’

পরের ৪/৫ ঘণ্টার অনুভূতি জানাতে গিয়ে সাংবাদিক ভদ্র শর্মা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেটা ভয়াবহ ছিল। যাত্রীদের স্বজনেরা হাসপাতালে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কোথায় আছে জানতে চাইছেন। কেউ কেউ মৃত্যু সংবাদ শুনে মাটিতে বসে আর্তনাদ করছেন। তবে হাসপাতালগুলো তাদের সর্বোচ্চটা করেছে।’

ঘটনার পরপরই সেখানে পৌঁছাতে পারার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি সেসময় ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি ছিলাম। আমার সঙ্গে নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকও ছিলেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত বিমানবন্দরে ছুটে যাই। প্রথমে পৌঁছেই দেখি বিধ্বস্ত বিমানের ইঞ্জিন থেকে আগুন বেরুচ্ছে। কাছাকাছি পৌঁছাতেই নাকে লাগে প্লাস্টিকের পোড়া গন্ধ। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।’

আশিক কাঞ্চন জানান, আমি কাল থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে  গিয়েছি। নিহতদের ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়ে তাদের স্বজনদের খুঁজে বের করেছি। হাসপাতালগুলোতে বাংলাদেশি যাদের নেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা জীবিত আছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে নিজের তাগিদেই আমি এই কাজটি করেছি। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আসলে বসে থাকা যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) সকালে মহারাজগঞ্জ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে গিয়েছি। সেখানে জানতে পারি ময়নাতদন্ত করে তারপর স্বজনদের লাশ দেখানো হবে। অনেক লাশের এমন অবস্থা আমি সোমবারেই দেখেছি যে কাছের আত্মীয়রা চিনবেন কিনা সন্দেহ। নিহতদের দাঁত, জন্মদাগ, অলঙ্কার, শেষ পরিধেয় বস্ত্র এসব দেখে চিহ্নিত করতে হবে।’

আশিক কাঞ্চন বলেন, ‘বেলা আড়াইটার পর আত্মীয়রা সেখানে আসেন বাংলাদেশ থেকে এবং তারা প্রথমে দূতাবাসে যান। এরপর আহতদের দেখতে কেউ কেউ গিয়েছেন কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং বাকিরা মহারাজগঞ্জ হাসপাতালে গেছেন। নিকটাত্মীয় যারা নেপালে এসেছেন, ময়নাতদন্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের ধৈর্য ধরে থাকতে হবে। এদের প্রত্যেককে ১৫ পৃষ্ঠার একটি ফরম পূরণ করতে হবে। ফরমে অনেক খুঁটিনাটি তথ্যাদি দরকার হবে।’

 

/ইউআই /এপিএইচ/চেক-এমওএফ/

লাইভ

টপ