‘আঁখি-মিনহাজ এখন শুধুই ছবি’

Send
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশিত : ০৩:২৯, মার্চ ১৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৬, মার্চ ১৫, ২০১৮

আঁখি-মিনহাজের এসব ছবি এখন শুধুই স্মৃতি‘মা, মিনহাজ আর আমি ঘুরতে নেপাল যাচ্ছি। আর শাকিবকে বেশি বকাঝকা কোরো না, বাবাকেও বলো। তোমরা শাকিবকে সবসময় আদর করবা। নিজের যত্ন নিও, তোমরা ভালো থেকো।’
‘যাওয়ার আগে শেষ এই কথাগুলোই বলেছিল আঁখি’—বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন হাসিনা বেগম। তার মেয়ে আঁখি মনি নেপালে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিধ্বস্ত হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। সদ্যবিবাহিত আঁখি-মিনহাজ দম্পতি নেপালে যাচ্ছিলেন মধুচন্দ্রিমায়। সেই মধুচন্দ্রিমা যে তাদের জীবনের শেষ ভ্রমণ হবে, তা কে জানত!
হাসিনা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নেপাল যাওয়ার দিন সকাল ১০টার দিকে আমার মোবাইলে ফোন করেছিল। বললো, নেপালে ঘুরতে যাচ্ছে। আমি বললাম, মামনি তুমি সবসময় দোয়া পড়ো। বাইরে বেশি যেও না, সাবধানে থেকো।’
আঁখি-মিনহাজের বিয়ে হয়েছে মাত্র সপ্তাহ দুয়েক হলো। তাই নিয়ে আফসোস করতে করতে হাসিনা বেগম বলেন, ‘গত ২ মার্চ আঁখি আর মিনহাজের বিয়ে হয়েছে। নেপালে গিয়ে ওরা যে আর ফিরবে না, তা কে-ই বা জানত। আঁখি-মিনহাজ এখন আমাদের কাছে শুধুই ছবি হয়ে রইলো।’
আঁখির সঙ্গে তার মায়ের শেষ দেখা গত বুধবার (৭ মার্চ)। মা বলেন, ‘বিয়ের পর আঁখি শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়। ফোনে কথা হতো সবসময়। বুধবার ও বাসায় এসেছিল। লাগেজ ভরে সব জামাকাপড় নিলো। ওই সময়ই আঁখি জানায়, দেশের বাইরে যাবে। তবে নেপালের কথা বলেনি। ওই দেখাই যে শেষ দেখা হবে, তা কেমন করে বুঝব?’
বিয়ের বাজারগুলো এখনও ছড়িয়ে রয়েছে আঁখির বাড়িতেনেপালে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো আঁখি মনি ও তার স্বামী মিনহাজ বিন নাসিরের পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। বন্ধু-স্বজনরাও শোকে পাথর। কিছুতেই তারা মেনে নিতে পারছেন না এই নবদম্পতির মৃত্যু।
আঁখি মনির মা হাসিনা বেগম বলেন, ‘বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর শুনেই বারিধারার ইউএস-বাংলার অফিসে ছুটে যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি আমার মেয়ে-জামাই আর নেই। এই খবর শুনে মিনহাজের বড় ভাই মেরাজ আমেরিকা থেকে ছুটে এসেছে। ও কিছুতেই মানতে পারছে না ওর ছোট ভাই আর নেই।’
আঁখি মনির বাবা শফিকুল ইসলাম একজন ব্যবসায়ী। মা হাসিনা বেগম গৃহিণী। তাদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে। রাজধানীর রামপুরা টিভি রোডের ৩৩৭/১ বাড়ির দোতলায় থাকেন তারা। দুই ভাই বোনের মধ্যে আঁখি বড়, তার আদরের একমাত্র ছোট ভাইয়ের নাম শাকিব। হাসিনা বেগম জানান, আঁখি-মিনহাজের মরদেহ শনাক্তের জন্য আঁখির ভাই শাকিব ও মিনহাজের ভাই মেরাজ যাচ্ছেন নেপাল।
আঁখির বাবা শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংসারের দিকে আঁখির খুব খেয়াল ছিল। সব বিষয়ে আমাদের পরামর্শ দিত। ওর ছোট ভাই শাকিবকে খুব আদর করত, শাসনও করত। মাত্র তো ওর বিয়ে হলো। ২ তারিখে (২ মার্চ) বিয়ের পর ৩ তারিখে (৩ মার্চ) ছিল রিসিপশন। ও নিজে বিয়ের সব বাজার করেছে।’
মোবাইলে এই ছবি দেখেই এখন দিন কাটছে আঁখি মনির মা হাসিনা বেগমেরশফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘সবসময় হাসি-খুশি থাকত, সবাইকে মাতিয়ে রাখত। নিজেই সব ঘর গুছিয়ে রাখত আঁখি। সবার দিকে ছিল ওর খেয়াল। বন্ধুদের সঙ্গেও খুব ভালো সম্পর্ক ছিল ওর। সামাজিক বিভিন্ন কাজেও সবসময় এগিয়ে যেত। এমন প্রাণোচ্ছল একটা মেয়ে, সবাই ওকে খুব পছন্দ করত।’
আঁখি ও মিনহাজের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘বিডি লাইভ কমিউনিটি’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ চালাত আঁখি। ও নিজেই অ্যাডমিন ছিল। এই গ্রুপের মূল কাজ হলো— যেকোনও মানুষের প্রয়োজনে যে কাউকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। এই গ্রুপের মাধ্যমে প্রতিদিনই কেউ না কেউ রক্ত চেয়ে সহযোগিতা পাচ্ছেন। গত বছর এই গ্রুপের অ্যাডমিন ও মেম্বারদের সহায়তায় হবিগঞ্জ ও জামালপুরে বন্যার্তদের সাহয্য করা হয়।
আঁখি মনির বন্ধু কুশল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আঁখি সবসময় মানুষকে সহায়তা করতে চাইত। ও খুব মেধাবী ছিল। কেউ ভাবতেই পারছি না এমন একটি মেয়ে এভাবে সবাইকে ছেড়ে চলে যাবে।’
ধানমন্ডির বেসরকারি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ শেষ করেছেন আঁখি মনি। মিনহাজও পড়েছেন বিবিএ নিয়ে, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। মিনহাজের বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) নাসির উদ্দিন সারোয়ার মারা গেছে আগেই। মা সৈয়দা আফসানা নাসিরের সঙ্গে মহাখালী ডিওএইচএসের বাসায় থাকতেন মিনহাজ। তার বড় ভাই মেরাজ সপরিবারে থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার বাতাকান্দিতে। বারিধারায় টপক্লিন নামের একটি লন্ড্রির ব্যবসা চালাতেন মিনহাজ।
উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ (সোমবার) নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণ করতে গিয়ে বিধ্বস্ত হয় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট। এতে ৬৭ জন যাত্রীসহ আরোহী ছিলেন ৭১ জন। এর মধ্যে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৫১ জন নিহত হয়েছেন। ১০ জন বাংলাদেশি এখন কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় আজ বৃহস্পতিবার (১৫ মার্চ) রাষ্ট্রীয় শোক পালন করছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে নিহতদের মরদেহ শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, শনাক্ত করা লাশগুলো আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হতে পারে।
আরও পড়ুন-
বিমান বিধ্বস্ত: যেভাবে লাশ গ্রহণ করা যাবে
ক্যাপ্টেন আবিদ সত্যিই পদত্যাগ করেছিলেন!
নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে আজ রাষ্ট্রীয় শোক

নেপালে বিমান বিধ্বংসের ঘটনায় বেঁচে গেলেন লৌহজংয়ের শাহীন
হতাহতদের পরিবারকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী

/টিআর/চেক-এমওএফ/

লাইভ

টপ