শহীদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ গেজেট হয়নি আজও

Send
জামাল উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৫:৪৬, মার্চ ২৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৯, মার্চ ২৫, ২০১৮

বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও শহীদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ গেজেট হয়নি। সম্প্রতি এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে পুলিশ সদর দফতর। যেসব শহীদ পুলিশ সদস্যের নাম গেজেটভুক্ত হয়নি তাদের তালিকা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সঙ্গে দেখা করেছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা। মৌখিকভাবে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাসও দিয়েছেন মন্ত্রী। পুলিশ সদর দফতরের ডিসিপ্লিন অ্যান্ড প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড (ডিএন্ডপিএস) বিভাগের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) আবিদা সুলতানা এ তথ্য জানিয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

পুলিশের এই কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘আমরা শহীদদের তালিকা গেজেটভুক্ত করার কাজে হাত দিয়েছি। এটি বড় একটি দায়িত্ব। তবে অনেক পুলিশ সদস্য আছেন, যারা শহীদের তালিকায় নেই। কোনও কারণে এই অপূর্ণতা রয়ে গেছে। সেজন্য আমরা কাজ শুরু করেছি। আশা করছি, এ মাসের মধ্যে তালিকাটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে পারবো আমরা। এটা বাস্তবায়ন হলে আমরা সফল হবো।’

পুলিশ সদর দফতর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়—১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের হিসাব অনুযায়ী, পূর্ব পাকিস্তানে পুলিশের ৩৩ হাজার ৯৯৫ জন সদস্য কর্মরত ছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার পুলিশ সদস্য পাকিস্তান সরকারের আনুগত্য অস্বীকার করে কর্মস্থল ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। আর মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে শহীদ হন ১ হাজার ১০০’র বেশি পুলিশ সদস্য। এছাড়া বহু পুলিশ সদস্য আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। নির্মম নির্যাতনের শিকার হন অনেকে।

এ পর্যন্ত শহীদ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ৭৫১ জনের নাম সংগ্রহ করতে পেরেছে পুলিশ সদর দফতর। তাদের কিছু নাম বিভিন্ন সময় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে বেশিরভাগ সদস্যের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি শহীদদের তালিকায়। কারণ, বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটের রিজার্ভ অফিসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আগুন লাগিয়ে দিলে তথ্য পুড়ে যাওয়ায় প্রকৃত তথ্য ও সংখ্যা উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি।

শহীদ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে একজন ডিআইজি, চারজন পুলিশ সুপার, একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, একজন ডেপুটি পুলিশ সুপার (ডিএসপি), একজন সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার (এসডিপিও), ১২ জন পুলিশ পরিদর্শক ও ৮১ জন উপ-পুলিশ পরিদর্শক রয়েছেন। সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীক খেতাব পেয়েছেন ছয় পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয় বাংলাদেশ পুলিশকে।

খেতাবপ্রাপ্ত পুলিশ মুক্তিযোদ্ধারা হলেন মাহবুব উদ্দিন আহম্মদ, শহীদ আবদুল মান্নান, শহীদ তৌহিদ আলী, মমিন উল্লাহ পাটোয়োরী, কাজী জয়নাল আবেদীন ও মো. সোলায়মান।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মাহবুব উদ্দিন আহম্মদ যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহুকুমায় এসডিপিও হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার নেতৃত্বে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখায় বীর বিক্রম খেতাব দেওয়া হয় তাকে।

শহীদ আবদুল মান্নান পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার রাঙামাটি পুলিশ লাইনে কর্মরত থাকাকালে ২৬ মার্চ যুদ্ধে যোগ দেন। পরে ইপিআর বাহিনীর সঙ্গে কালুরঘাট যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধরত অবস্থায় রাউজান থানার মদিনাঘাট এলাকায় পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন আবদুল মান্নান। ১৯৯৭ সালে বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয় তাকে।

শহীদ তৌহিদ আলী রাজশাহী জেলা পুলিশ লাইনে কর্মরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ২৩ এপ্রিল পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অভয়নগর ব্রিজ এলাকায় যুদ্ধে শহীদ হন তিনি। তাকেও বীর বিক্রম খেতাব দেওয়া হয়। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে মমিন উল্লাহ পাটোয়ারী, কাজী জয়নাল আবেদীন ও মো. সোলায়মান বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন।

পুলিশ সদর দফতরের ডিঅ্যান্ডপিএস বিভাগের মহাপরিদর্শক আবিদা সুলতানা বলেন, ‘একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে রাজারবাগে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে পুলিশ। তখন তারা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সারাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের সংবাদ পাঠান। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের যে গৌরবময় ভূমিকা ছিল, সেই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে খুব বেশি প্রকাশ্যে আসেনি। বলা যায়, প্রায় ৪০ বছর পর এ নিয়ে আমরা পুলিশের পক্ষ থেকে জোরেশোরে কাজ শুরু করেছি। আগেও কাজ হয়েছে, তবে এত বেশি ছিল না। এখন আমরা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থায় আসতে পেরেছি।’

পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ২০১২ সালের জুন থেকে ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ও দীর্ঘ ৯ মাসের রক্ত সংগ্রামে পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরাই এর লক্ষ্য।

২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি নবনির্মিত ভবনে বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পুলিশ সদর দফতরের অধীন একটি ইউনিট হিসেবে এই জাদুঘরের নিজস্ব জনবল (একজন পুলিশ সুপারসহ মোট ১৮ জন) রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্মারক সংরক্ষিত আছে জাদুঘরটিতে।

পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক বাংলা ট্রিবিউনকে আরও জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের গৌরবময় ভূমিকার বিষয়টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে (চতুর্থ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি) ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন করা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে ছাত্রছাত্রীদের কাছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড পাঠ্যপুস্তকটি বিতরণ করেছে।

/জেএইচ/চেক-এমওএফ/

লাইভ

টপ