বড় বাজেট, নির্বাচনের বাজেট

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২২:৫৭, জুন ০৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫১, জুন ০৬, ২০১৮

 

বাজেট ২০১৮-১৯সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার (৭ জুন) অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত (২০১৮-১৯) অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করবেন। ইতোমধ্যেই তিনি বাজেট পেশের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১২টায় জাতীয় সংসদের ২১তম অধিবেশনে এই বাজেট পেশ করবেন তিনি। এটি হবে তার ১২তম জাতীয় বাজেট। একইসঙ্গে বর্তমান সরকারের টানা ১০ বারের বাজেট ঘোষণার নতুন রেকর্ডও গড়বেন তিনি। এর আগে আবুল মাল আবদুল মুহিত এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। এর আগে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান তিন মেয়াদে ১২টি বাজেট দিয়ে শীর্ষে অবস্থান করলেও একটানা ৫টির বেশি বাজেট ঘোষণা করতে পারেননি সাইফুর রহমান। এবারের বাজেটকে অর্থমন্ত্রী নাম দিয়েছেন ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক বাজেট।  

এর আগে এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাজেট তৈরির কাজে সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব বাংলা টিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘এটি হবে নির্বাচনি বাজেট। তাই সেখানে নানা বিষয় থাকবে। বাজেট সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সেখানে নানা বিষয় সংযোজন-বিয়োজন হয়। এসব বিষয় সংসদে উপস্থাপনের আগে গোপন রাখাই উচিত বলে মনে করি। তাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মন্ত্রী।’

অর্থমন্ত্রীর পারিবারিক সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফুরফুরে মেজাজে আছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। একদিকে এটি হবে তার  ১২তম বাজেট,  অন্যদিকে টানা ১০ বারের বাজেট ঘোষণার রেকর্ড গড়ছেন তিনি।   

জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি মনে করলেই ভালো লাগছে। এটি একটি রেকর্ড। তার আগে কিন্তু এটি সৌভাগ্য।’

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যেই অর্থমন্ত্রীর কয়েকদফা স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরাও তার স্বাস্থ্যের প্রতি নজর রাখছেন। ইতোমধ্যেই মন্ত্রিপরষদ বিভাগ থেকে বাজেটের ডকুমেন্টস বহন করতে কালো ব্রিফকেস কেনা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর পোশাকও চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এদিন তিনি পরবেন সাদা পাজামার সঙ্গে সিল্কের কলারওয়ালা পাঞ্জাবি। এর ওপর ঐতিহ্যের মুজিব কোর্ট পরবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পায়ে দেবেন কালো চামড়ার ফিতাওয়ালা স্যান্ডেল।

জাতীয় সংসদে এবারও ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থাৎ পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী।

বেলা সাড়ে ১২টায় জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উত্থাপনের আগে সংসদ ভবনস্থ মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নতুন বাজেট অনুমোদন দেওয়া হবে। বৈঠকে মন্ত্রী-সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকবেন। এর পরপরই মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া নতুন বাজেটে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর করবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনিও বৃহস্পতিবার বঙ্গভবন ছেড়ে সংসদ ভবনস্থ রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে অফিস করবেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বাজেটের আকার হতে পারে ৪ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার কম-বেশি। যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের (৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা থেকে) প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। আগামী অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরে দেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে এনবিআরকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৭১ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি।

নতুন বাজেটে করদাতার সংখ্যা ৩০ লাখে পৌঁছানোর বিষয়টি জাতিকে জানাবেন অর্থমন্ত্রী। এটি প্রশংসার দাবি রাখে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৫ লাখ। 

আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছেন ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। গত নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে যাচ্ছে এমন আভাস দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।

প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির গড়হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশে রাখার টার্গেট নিয়েছে সরকার।  ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হয়েছে  ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

গত ১০ মে সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক কমিটিতে (এনইসি) অনুমোদন পাওয়া ১ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) পদ্মা সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রকল্পে বরাদ্দের বিষয়টি উল্লেখ থাকবে। এই এডিপির মধ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) আওতায় থাকবে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা, যা মূল এডিপি হিসেবে পরিচিত। বাকিটা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন প্রকল্প। সার্বিকভাবে এই  এডিপির আকার ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি

সরকারের অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ১০ মেগা প্রকল্পের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আর পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের জন্য রাখা হয়েছে যথাক্রমে ৪ হাজার ৩৯৫ কোটি ও ৩ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। নতুন এডিপির ২৬ শতাংশ বা সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে পরিবহন খাতে। রাস্তাঘাট নির্মাণ প্রকল্পেই সংসদ সদস্যদের আগ্রহ বেশি হওয়ায় আগামী এডিপিতে ১ হাজার ৪৫২টি প্রকল্প রয়েছে। এ ছাড়া এডিপিতে বরাদ্দহীন ও অননুমোদিত প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ৩৩৮টি। এসব প্রকল্প আগামীতে একনেক বৈঠকে পাস হবে।

আগামী বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় হবে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি। নতুন বাজেটে বেসরকারি খাতে পেনশন ব্যবস্থা চালু নিয়ে অর্থমন্ত্রী একটি রূপরেখা দেবেন বলেও জানা গেছে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, নতুন বাজেটে রোহিঙ্গাদের জন্য ৪৬০ কোটি টাকা বরাদ্ধ থাকবে। রাজস্ব বাজেট থেকে এই অর্থ জোগান দেওয়া হবে।

নতুন বাজেটে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট থেকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ১ লাখ ২০০ কোটি টাকা আয়কর এবং শুল্ক খাতে ৮৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আদায় করতে হবে এনবিআরকে।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভ্যাটের সর্বোচ্চ হার ১৫ শতাংশেই থাকছে। আগামী বাজেটে ভ্যাট হারের স্তর ৯ থেকে নামিয়ে ৫টিতে নামিয়ে আনা হবে পরবর্তী সময়ে এ স্তর তিনটিতে নামিয়ে আনা হতে পারে। তিনি আরও জানান, আসন্ন বাজেটে, সিগারেট ও মোবাইল কোম্পানির জন্য করপোরেট ট্যাক্স ৪৫ শতাংশেই অপরিবর্তিত থাকবে। এছাড়া ব্যাংকসহ নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সব কোম্পানির ক্ষেত্রে করপোরেট ট্যাক্সের সর্বোচ্চ হার হবে ৩৭ দশমিক ৫শতাংশ। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য করপোরেট কর বর্তমানে রয়েছে ২৫ শতাংশ। আর যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত নয়, সেগুলোর করপোরেট ট্যাক্স রয়েছে ৩৫ শতাংশ হারে। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত ব্যাংক কোম্পানিকে ৪০ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত নয়, এমন ব্যাংকগুলোকে ৪২ শতাংশ হারে করপোরেট ট্যাক্স দিতে হতো। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হবে না। তবে তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আছে। করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলে তা হবে ৩ লাখ টাকা। বর্তমানে বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা রয়েছে আড়াই লাখ টাকা। এবারের বাজেটে গুগল, ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন ইন্টারনেট থেকে আয়কে করের আওতায় আনার বিষয়ে ব্যাখ্যা থাকবে। যা বর্তমান আইনে নেই। এসব মাধ্যমে বর্তমানে বিজ্ঞাপনের ওপর সরকারকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয় না। 

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ