টাকার অভাবে ওমান থেকে ফিরতে পারছেন না নারী শ্রমিকরা

Send
এস এম আববাস ও সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ১০:০২, জুলাই ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৩, জুলাই ১৪, ২০১৮

 ফেরত আসা এক নারী শ্রমিক, ফাইল ছবিওমানের সেফহোমে আটকে থাকা ১৫ বাংলাদেশি নারী শ্রমিক টাকার অভাবে দেশে ফিরতে পারছেন না। শ্রমিকদের পরিবারের অভিযোগ, নিজ খরচে দেশে ফিরতে বলেছেন দূতাবাসের কর্মকর্তারা। এসব নারী শ্রমিকদের মধ্যে ১০ জনকে দেশে ফেরাতে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে একজন নিজ খরচে দেশেও ফিরেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ওমানে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বি‌তীয় সচিব (শ্রম) আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে নয়, তারা নিজেরাই দেশে ফিরতে চান। এর আগেও তারা নিজেরা মারামারি করেছে, পুলিশ তাদের সবাইকে আটক করেছে। দূতাবাস তাদের উদ্ধারও করেছে। সম্প্রতি ১০ জনকে দেশে ফেরানোর জন্য ব্র্যাকের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিষয়টি জানতে চাইলে আমরা জানিয়েছি— ফেরার প্রক্রিয়ায় রয়েছে তারা।’

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগাম প্রধান শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেফহোমে থাকা নারীদের আর্থিক অবস্থা ভালো না। দূতাবাস থেকে তাদের বলা হয়েছে, বিমান ভাড়ার টাকা দিলে তারা দেশে ফিরতে পারবে। তাদের পরিবার আমাদের কাছে আবেদন করেছে। আমরা তাদের ফেরত আনতে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছি।’

গত জুনের শেষ দিকে ওমান থেকে নিজ খরচে দেশে ফেরত আসেন নারায়ণগঞ্জের হোসনা বেগম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেফহোমের দুটি কোয়ার্টারে ৯৫ জন নারী শ্রমিক অবস্থান নেয়। তারা সবাই দেশে ফিরতে চাইলেও টাকার অভাবে ফিরতে পারছেন না। কেউ কেউ পাঁচ মাস ধরে রয়েছেন। দেশে ফেরত আসার সময় সেফহোমে ১৫ জন নারী শ্রমিক ছিল। আমি দেশ থেকে টাকা সংগ্রহ করে ৯০ রিয়াল জরিমানা দিয়ে এবং ৮০ রিয়ালে টিকেট কেটে দেশে ফিরে এসেছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে ফিরতে না পারা নারীদের অনেকেই আবার নতুন করে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছেন।হোসনা বেগম অভিযোগ করেন, ‘চুক্তি অনুযায়ী নিয়োগকর্তা তাকে প্রশিক্ষণ না দিয়েই কাজে পাঠায়। সে কারণে গৃহকর্তার নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাকে। এক মাস কাজ না করেই পালিয়ে আশ্রয় নেন সেফহোমে। তারপরেও তাকে জরিমানা দিতে হয়েছে।’

ফেরত আসা এক নারী শ্রমিক

ওমানের সেফহোমে থাকা নারী গৃহকর্মী শিরিনা আক্তারের বোন নারায়ণগঞ্জের মমতাজ আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার বোনের সঙ্গে গতকাল (বুধবার) কথা হয়েছে। সে দেশে আসার জন্য কান্নাকাটি করছে। দূতাবাস থেকে বলা হয়েছে, বিমানভাড়া দিয়ে তাকে দেশে ফিরতে হবে। কিন্তু তার কাছে এত টাকা নেই।’ তিনি জানান, দূতাবাসের কর্মকর্তা ছুটিতে দেশে যাবেন। সে কারণে তার দেশে ফেরা আরও দেরি হতে পারে। দ্রুত ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।

দূতাবাস গৃহশ্রমিকদের নিজ খরচে দেশে ফেরার কথা বলেছেন কিনা জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘একজন গৃহকর্মীকে ওমানে পৌঁছাতে দেড় লাখেরও বেশি টাকা খরচ করেন নিয়োগকর্তা। তিন মাসের আগে কেউ ফেরত যেতে চাইলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তখন জানায়- টাকা দিয়ে দেশে ফিরে যেতে হবে। এ অবস্থায় আমরা সমস্যায় পড়ি। শেষ পর্যন্ত যেকোনোভাবে তাদের দেশে ফেরত পাঠাই।’

জানা গেছে, ভাগ্য বদলাতে গত ৫ মার্চ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে একমাত্র সন্তানকে রেখে ওমান পাড়ি জমান নারায়ণগঞ্জের শিরিনা আক্তার। সেখানে যাওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই নিয়োগকর্তার মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। এরপর দেশে ফিরতে চাইলেও টাকার অভাবে ফিরতে পারেননি।

শিরিনের মতো যারা ফিরে আসতে চাইছেন তারা নির্যাতনের কারণে ফিরে আসছেন কিনা জানতে চাইলে দূতাবাসের কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘নির্যাতনের কারণে সবাই ফেরত যেতে চায় বিষয়টি ঠিক নয়। কেউ কেউ নির্যাতনের কারণে ফেরত যেতে চাইলেও বেশিরভাগই ‘ভালো লাগে না’ বলে চলে যেতে চায়। গৃহকর্মীরা এখানে (ওমানে) আসার পর কয়েকদিন যেতে না যেতেই ভালো না লাগলে তারা চলে যেতে চায়। অনেকেই বাচ্চা রেখে চলে আসে। ছেলের জন্য ফেরত যেতে চায়। বাংলাদেশিরা নিজেরা মারামারিতে ঝামেলা সৃষ্টি করে নিজেরাই চলে যেতে চায়। তখন নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যেতে দেয় না।  কারণ একজন গৃহকর্মী আনতে বাংলাদেশি দেড় লাখের বেশি টাকা লাগে। তখন এই টাকার দাবি করে তারা। এ সময় নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগ করেন গৃহকর্মীরা।

ফেরত আসা এক নারী শ্রমিক

এই দশ গৃহকর্মীর ফিরে আসার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘কয়েকদিন আগে এরা নিজেরা মারামারি করে। কিন্তু দূতাবাসকে তারা কেউ জানায়নি। একজন পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করলে সবাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। আমরা এই দশজনকে পুলিশের কাছ থেকে উদ্ধার করে সেফহোমে রাখি। এখন এরা ফেরত যেতে চাইছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওমানে গৃহকর্মীদের উদ্ধারে বাংলাদেশ দূতাবাসের কোনও এখতিয়ার নেই। তাই নির্যাতিতারা নিয়োগকর্তার বাড়ি থেকে সাধারণত পালিয়ে আশ্রয় নেন দূতাবাসের সেফহোমে। আবার অনেক সময় পুলিশের হাতে ধরাও পড়েন। সেক্ষেত্রে দূতাবাসের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করে তাদেরকে হেফাজতে নেওয়া হয়।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর দেওয়া তথ্যমতে, এ বছরের মে মাস পর্যন্ত ওমানে কাজের উদ্দেশ্যে গেছেন ৩৩ হাজার ৪০৫ জন গৃহকর্মী। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮১৪ জন নারী শ্রমিক রয়েছেন। ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত সর্বমোট ৬৯ হাজার ৪১৬ জন নারী শ্রমিক ওমানে কাজের উদ্দেশ্যে গেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী শ্রমিক ওমান গেছেন ২০১৫ সালে। এরপর থেকে ওমানগামী নারী শ্রমিকের সংখ্যা এক-চতুর্থাংশে নেমে আসে।

 

 

/ওআর/

লাইভ

টপ