গ্রাহকের অজান্তে ইবিএল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে আমেরিকায় লেনদেন!

আমানুর রহমান রনি
০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:১৪আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:৩৫

ইস্টার্ন ব্যাংকের লোগো ঢাকায় অবস্থান করা ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল) এর এক গ্রাহকের অজান্তে তার আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডে আমেরিকার একটি শপিং মলে লেনদেন হয়েছে। এই ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় ভুক্তোভোগী ওই নারী গ্রাহক একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই নারীকে তার অর্থ ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এজন্য চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ সময় চেয়েছেন তারা।

গত ৩ সেপ্টেম্বর পঞ্চাশোর্ধ্ব ওই নারী ধানমন্ডি থানায় হাজির হয়ে একটি জিডি করেছেন। জিডি নম্বর ১৩৩। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘তিনি মিয়ানমার প্রবাসী। ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের ঢাকার ধানমন্ডি শাখায় তার একটি গ্লোবাল অ্যাকাউন্ট রয়েছে। যার একটি গ্লোবাল ইউএসডি কার্ডও আছে। তিনি গত ১১ আগস্ট ঈদের ছুটিতে মিয়ানমার থেকে ঢাকায় আসেন। গত ২৯ আগস্ট সকাল সাড়ে ৭টায় তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে ক্ষুদে বার্তা আসে। ক্ষুদে বার্তা পড়ে তিনি দেখেন, তার অ্যাকাউন্ট থেকে আট হাজার একশ বিরানব্বই ইউএস ডলার ট্রানজেকশন হয়েছে। অথচ তিনি ১১ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে আছেন। তিনি বিষয়টি ইস্টার্ন ব্যাংকের হেল্প লাইনে ফোন করে জানান। এমনকি তিনি ব্যাংকে একটি লিখিত অভিযোগ করেন।’

জিডির বিষয়টি ধানমন্ডি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন।
মিজানুর রহমান বলেন, ‘জিডি হওয়ার বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে এখনও আমার কাছে ফাইলটি আসেনি। তাছাড়া দেশের বাইরের ঘটনা তদন্তে আমাদের আসলে সেভাবে সক্ষমতা এখনও হয়ে উঠেনি। তারপরও আমরা সাধ্যমতো ব্যবস্থা নিবো। আইনগতভাবে যা করা দরকার তা করবো।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তোভোগী ওই নারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি দেশে থাকি না। এই মোবাইল ফোন নম্বরটি কেবল দেশে আসলেই আমি ব্যবহার করি। সেই নম্বরেই ম্যাসেজটি এসেছে। আমি যদি দেশের বাইরে থাকতাম, তাহলে হয়তো কখনও টের পেতাম না। কারণ লেনদেনের আপডেট কেবল মোবাইলের ক্ষুদে বার্তায় আসে।’

ওই নারী গত মে মাসে আমেরিকাতে গিয়েছিলেন। তবে আমেরিকার যে মেগাশপে তার ক্রেডিটকার্ড দিয়ে লেনদেন করা হয়েছে, সেখানে তিনি কোনও কিছু কেনাকাটাও করেননি। তাহলে কীভাবে তার ক্রেডিটকার্ড জালিয়াতি হলো? তাও তিনি বুঝচ্ছেন না। ইবিএল ব্যাংক কৃর্তৃপক্ষের কাছে তার লিখত অভিযোগে তিনি অবিলম্বে টাকা ফেরত চেয়েছেন। এছাড়াও ক্রেডিট কার্ডের নিরাপত্তার বিষয়টি তিনি উত্থাপন করেছেন।

এর আগেও দেশের এনসিসি ব্যাংকের এক গ্রাহকের ক্রেডিট কার্ড থেকে এভাবে দেশের বাইরে লেনদেন হয়েছে। ওই সময় তিনিও দেশেই ছিলেন। এভাবে কার্ড বন্ধ করে গ্রাহক দেশে থাকলেও বিদেশে ওই কার্ড ব্যবহার করে লেনদেন হচ্ছে। বিষয়টি বুঝতেও পারছে না ব্যাংক। লেনদেন হওয়ার পর গ্রাহকের মোবাইলে এসএমএস আসার বিষয়ে ব্যাংকে অভিযোগ করলে ব্যাংক সেটি বুঝতে পারছে না। এভাবে হাজার হাজার ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। অবশ্য ব্যাংকের দাবি, গ্রাহকের ভুলে কার্ডের তথ্য চুরি করে হ্যাকাররা এ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনের প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কার্ড বন্ধ থাকলে কোনোভাবে লেনদেন সম্ভব নয়। তবে হ্যাক করে কার্ডের তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশ করে অনেক কিছু করা সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখের বেশি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করা আছে। এসব কার্ড দিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে লেনদেন করা হয়। এছাড়াও এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলন, পস মেশিনে ব্যবহার ও ই-কমার্সে লেনদেন করা হয় ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে।

২০১৭ সালের মার্চে ঢাকায় ‘আন্তর্জাতিক এটিএম কার্ড জালিয়াত চক্রের’ সন্দেহভাজন ১১ সদস্যকে আটক করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে বিশেষ ধরনের প্রিন্টার, বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম কার্ড, প্রায় এক হাজার সাদা কার্ড, কার্ড পাঞ্চ করার ছয়টি মেশিন উদ্ধার করা হয়। কার্ড জালিয়াতির প্রক্রিয়া তুলে ধরে র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদেশি কার্ড জালিয়াত চক্রটি ইন্টারন্যাশনাল এটিএম কার্ড হ্যাকের পর পিন নম্বর সংগ্রহ করে। পরে সেই পিন নম্বর বাংলাদেশের এ চক্রের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এরপর বিশেষ মেশিনের মাধ্যমে সেই পিন নম্বর দিয়ে কার্ড তৈরির পর টাকা তুলে নেয় বা বড় বড় শপিংমলের কার্ড পাঞ্চ করার মেশিনের (সুইপ মেশিন) মাধ্যমে পণ্য ক্রয় বা নগদ টাকা নিয়ে থাকে।

অপরদিকে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেও দেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতি করে চক্রটি অর্থ হাতিয়ে নেয়। এই ঘটনায় ঢাকা মহানগরের একাধিক থানায় মামলা হয়। গ্রেফতার করা হয় দেশি বিদেশি অন্তত ১৫/২০ ব্যক্তিকে। এসব জালিয়াতির মধ্যে ইবিএল ব্যাংকের গ্রাহকরা ছিল। ওই সময় ইবিএল ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা জানান। তখন কর্মকর্তারা জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছিলেন, ২১টি কার্ড ব্যবহার করে গ্রাহকের টাকা অন্য কেউ তুলে নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন তারা। জালিয়াত চক্র ব্যাংকের গুলশান এলাকার দুটি বুথে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে গ্রাহকের তথ্য চুরি করেছে। পরে ওই তথ্য ব্যবহার করে ক্লোন কার্ড দিয়ে অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পেয়ে প্রাথমিকভাবে ওই ২১টি এটিএম বুথ বন্ধ করা হয়। পরে ওই দুই বুথে ব্যবহার করা সব কার্ডই বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসব কার্ডের মালিকদের নতুন করে এটিএম কার্ড দেওয়া হয়।

এবিষয়ে ইবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী রেজা ইফতেখার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ধরণের ঘটনা ঘটতেই পারে। অনেক সময় স্কিমিং হয়। তবে কেন ঘটছে? ওই গ্রাহক কোথায় কার্ডটি ব্যবহার করেছে, তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব না। আমরা অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করবো। এতে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ সময় লাগবে। তদন্তের পর আমরা বিষয়টি সম্পর্কে বলতে পারবো।’

 

/এআরআর/আইএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের
বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের
৪ বছরের মধ্যেই ১.৫ ডিগ্রি উষ্ণতার সীমা ছাড়াতে পারে বিশ্ব
৪ বছরের মধ্যেই ১.৫ ডিগ্রি উষ্ণতার সীমা ছাড়াতে পারে বিশ্ব
কবিতায় হেমন্তের ঘ্রাণ ।। পর্ব—৪
পোলিশ আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবকবিতায় হেমন্তের ঘ্রাণ ।। পর্ব—৪
ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা 
ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা 
সর্বাধিক পঠিত
প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে তুলে নেওয়া হলো সেই সড়কের ইট 
প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে তুলে নেওয়া হলো সেই সড়কের ইট 
সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের আছে আইডি কার্ড, চিনতে পেরেছে পরিবার
সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের আছে আইডি কার্ড, চিনতে পেরেছে পরিবার
বিএসএফের পুশইনের পর সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের পরিচয় মিলেছে
বিএসএফের পুশইনের পর সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের পরিচয় মিলেছে
লাশের গোপনাঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করে তোপের মুখে নারী চিকিৎসক
লাশের গোপনাঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করে তোপের মুখে নারী চিকিৎসক
৫৪ কেজিতে এক মণের দিন শেষ
৫৪ কেজিতে এক মণের দিন শেষ