‘জামায়াতের সঙ্গে জোট কেন গঠন করলেন’

Send
শেখ শাহরিয়ার জামান
প্রকাশিত : ২০:০৮, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:২৯, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮

 

 

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ভবন ধসে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির কারণে বৈশ্বিক পট পরিবর্তন ঘটার একমাসের মধ্যে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি জামায়াত-জোট ক্ষমতায় আসে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একিউএম বদরুদ্দোজা প্রথম সাক্ষাতে প্রথম যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হন তা হচ্ছে ‘আপনারা জামায়াতের সঙ্গে জোট কেন গঠন করলেন?’ ৯/১১-র স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সে সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

তারিক এ করিম বলেন, ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরে বিএনপি-জামায়াত সরকার তাকে  মার্চিং অর্ডার (দেশে ফিরে আসার নির্দেশ) পাঠায়।এ চিঠি পাওয়ার পর দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই তাকে ঢাকা থেকে আরেকটি নির্দেশ পাঠিয়ে বলা হয় নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলের মধ্যে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করতে। পরপর দু’ধরনের নির্দেশ পেয়ে তিনি কী করবেন তা বুঝতে না পেরে ঢাকায় ফোন করে তার করণীয় জানতে চান। ঢাকা থেকে বৈঠকের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তিনি জানান, এরপর তিনি উভয়ের মধ্যে বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। ওই বৈঠকে বসে কলিন পাওয়েল প্রথম যে প্রশ্নটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদরুদ্দোজা চৌধুরী (বি.চৌধুরী)কে করেছিলেন তা হচ্ছে,‘আপনারা জামায়াতের সঙ্গে জোট কেন গঠন করলেন?’ এর উত্তরে বি.চৌধুরী জানান,‘আমরা জামায়াতকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাই এবং সেজন্য তাদেরকে আমরা সঙ্গে রেখেছি।’’

তারিক এ.করিম আরও বলেন,‘কোনও সন্দেহ নাই,বৈঠকের আগে কলিন পাওয়েল এ বিষয়ে হোম ওয়ার্ক করেছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সন্ত্রাসী ঘটনার পরে বৈশ্বিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপরেও পড়ে। যখনই আমি প্রেসিডেন্ট বুশের ভাষণে শুনেছি ‘সন্ত্রাসীরা সেখানেই থাক, আমরা তাদের শিকারের মতো খুঁজে বের করবো’ তখনই আমি বুঝেছি এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আছে এবং মুসলিম দেশ হিসাবে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে পারে।’’

তিনি জানান, ১১ সেপ্টেম্বরের পরের দিন জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলের এক বৈঠকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়। সেই সময়ে নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্য হিসাবে বাংলাদেশও এর নিন্দা জানায়।

তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুরু আসলে এর পরের বছর থেকে শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের তদানীন্তন রাষ্ট্রদূত জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ওই সন্ত্রাসী হামলা পরবর্তী এক বছর দুইদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশেষ নিবন্ধন কর্মসূচিতে আরও ২৪টি   দেশের সঙ্গে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করলো তখন এখানে সবাই হতাশ হয়ে পড়লো।

এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে উত্তর কোরিয়া বাদে সবগুলো দেশ ছিল মুসলিম প্রধান।

২০০২ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রদূতের চাকরি ছেড়ে দেন তারিক এ করিম। বিশেষ নিবন্ধন কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বলেন,এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক একটি প্রতিক্রিয়া ছিল। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিবেচ্য ছিল ‘পরবর্তীতে দুঃখিত হওয়ার চেয়ে এখন নিরাপদে থাকা ভালো।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ হতাশ হলেও ওই সিদ্ধান্তকে পাল্টানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছিল তদানীন্তন সরকার। সেই সময়ে যারা সেখানে কর্মরত ছিলেন তারা দিনরাত পরিশ্রম করতেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন,সংসদ সদস্য এবং সুশীল সমাজের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখতেন যাতে করে বাংলাদেশকে ওই তালিকা থেকে মুক্ত করা হয়। তবে ওয়াশিংটন কখনই বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ শিথিল করেনি। বরং অনেকে ছিল যারা বাংলাদেশের প্রতি সহানুভুতিশীল ছিল।

সেই সময়ে বাংলাদেশি কূটনীতিকরা স্টেট ডিপার্টমেন্ট, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগন, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন। এছাড়া প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সিনেটর ও কংগ্রেস সদস্য এবং সুশীল সমাজের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করতেন তারা বলেও জানান তারিক।

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সবসময় উদ্বেগ প্রকাশ করা হতো বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার বিষয়ে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হতো মাদ্রাসা এবং সন্ত্রাসের মধ্যে সম্পর্ক আছে এমন কোনও প্রমাণ নেই। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র চাইতো ইরাকে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করুক কিন্তু এই প্রস্তাবে ঢাকা কখনোই রাজি হয়নি।

 

 

/এসএসজেড/টিএন/

লাইভ

টপ