জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেজের কাজ কতদূর?

জামাল উদ্দিন
২৮ অক্টোবর ২০১৮, ১২:১২আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৮, ১৫:৩০

ডিএনএ অধিদফতরের অভাবে ও অভিজ্ঞ লোক না থাকায় ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) ডাটাবেজ তৈরি করা যাচ্ছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কবে নাগাদ এ ডাটাবেজ করা যাবে, তাও বলতে পারছেন না কেউ। অপরাধী শনাক্ত, ক্লু-লেস মামলার ক্লু-উদ্ধার এবং বিভিন্ন জটিল মামলার নিষ্পত্তিতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ২০০৬ সালে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাল্টিসেক্টরাল প্রকল্পের অধীনে ‘ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন থেকেই এই ল্যাবরেটরি ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের কাজ করে আসছে। এসব ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের ডাটাবেজ করা গেলে অপরাধী শনাক্ত, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব নিরূপণ ও মৃতদেহ শনাক্ত করার সহজ হবে।

সরকার ‘জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেজ’ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় চার বছর আগে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে ডিএনএ বিল-২০১৪ পাস করে। কোনও ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও এর বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নির্ধারণ, ডিএনএ নমুনা ও প্রোফাইলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি স্থাপন, জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠা ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে জাতীয় সংসদে এ আইন পাস করা হয়। কিন্তু সেই ডাটাবেজ ও ডিএনএ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর প্রতিষ্ঠা হয়নি আজও।

এদিকে, বিভিন্ন জটিল মামলার তদন্তে সহায়তা ও অপরাধমূলক কাজের তদন্ত সহজ করতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি ফরেনসিক ল্যাব। যেখানে আদালতের নির্দেশে সিআইডির এ ল্যাব থেকে বিভিন্ন জটিল মামলার সমস্যা নিরসনে আলামতের ডিএনএ প্রোফাইলিং করা হয়। এতে তদন্তকাজের বড় অগ্রগতি হয়। অপরাধী শনাক্তেও খুব একটা বেগ পেতে হয় না। পুলিশের মামলা ছাড়াও সরকারের অন্যান্য বিভাগ থেকেও কোনও মামলা বা ঘটনার ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের নির্দেশনা এলে সিআইডির এই ফরেনসিক ল্যাব থেকে করে দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠা হলে অপরাধী শনাক্ত ও দ্রুত মামলার নিষ্পত্তিসহ ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। এতে মামলার তদন্তের সময় কমে যাবে। আমেরিকার মতো দেশে বছরে ৩ লাখ সহিংস ঘটনা ঘটে। ডিএনএ ডাটাবেজ থাকার কারণে তাদের তদন্ত ব্যয় ১০ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। আমাদের দেশে জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেজ হলে মামলার তদন্ত ব্যয় বছরে ১০০ কোটি টাকা কমিয়ে আনা সম্ভব।

ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে বিভিন্ন মামলার চার হাজার ৪৫৩টি ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে। যার মধ্যে সর্বাধিক দুই হাজার ৩৬৫টি ধর্ষণের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এরপরই রয়েছে এক হাজার ৩৪১টি বংশপরিচয়, ৩২০টি টিস্যু ট্রান্সপ্লান্ট, ২৫৭টি হত্যাকাণ্ডের, ১০০টি পরিচয় শনাক্ত, ৪৮টি ইমিগ্রেশন, ১৮টি সহোদর শনাক্ত, তিনটি মৃতদেহ শনাক্ত ও একটি অপরাধী শনাক্তকরণ সংক্রান্ত মামলার নমুনা। ল্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, এই ল্যাবরেটরিতে প্রতিদিনই নতুন নতুন ডিএনএ নমুনা আসছে। কিন্তু ল্যাবের ফ্রিজগুলো ওভারলোড হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আনা নমুনাগুলো ভালোভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। ল্যাবের ইক্যুপমেটগুলো ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে কেনা। এগুলোর আউটপুট নষ্ট হয়ে গেছে, মেরামত করা প্রয়োজন। অর্থাভাবে মেরামত করা যাচ্ছে না। জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেজ হলে নমুনা সংরক্ষণে এ ধরনের সমস্যা হতো না।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাল্টিসেক্টরাল প্রকল্পের অধীনে এরইমধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির প্রধান ড. শরীফ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘দেশে জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেজের জন্য অবকাঠামোর উন্নয়ন, দক্ষ কারিগরি জনবল নিয়োগ, প্রয়োজনীয় ইক্যুইপমেন্ট ক্রয়, ল্যাবরেটরি তৈরি, ডিএনএ পরীক্ষার ব্যয় ও ডিএনএ-এর নমুনা সংগ্রহে পরিবহন ব্যয়সহ প্রায় ২০০ কোটি টাকার দরকার। ডাটাবেজ হলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। এতে তদন্তের সময় কমবে এবং তদন্তব্যয়ও কমবে। ডাটাবেজ স্থাপনের খরচ মাত্র দুই বছরেই উঠে যাবে। তাই এ ব্যাপারে সরকারের এখনই উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’

ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি থেকে করা ডিএনএ প্রোফাইলের চারটি ইনডেক্সের সমন্বয়ে জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠা করার কথা। কিন্তু কেন এই ডাটাবেজ এখনও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি, জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অভিজ্ঞ জনবল না থাকায় ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদফতর করা এখনও সম্ভব হয়নি। কাজ চলছে। যা মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন আছে। একটি পূর্ণাঙ্গ অধিদফতর প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনায় আলাদা লোকবল ও গবেষণাগার লাগবে। অধিদফতর না হওয়ায় জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেজ এখনও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া ডিএনএ ডাটাবেজ স্থাপনের অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। ফলে বাইরের দেশের অভিজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এজন্য সিঙ্গাপুরের সঙ্গে কথা হচ্ছে। অধিদফতর হলে প্রাতিষ্ঠানিক সার্পোট পাওয়া যাবে। এসব কারণেই ডিএনএ ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠায় দেরি হচ্ছে। কবে নাগাদ এ ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠা হবে সেটাও বলতে পারেননি এই প্রকল্প কর্মকর্তা।’

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ফরেনসিক ল্যাবরেটরির বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (ফরেনসিক) রুমানা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘আমাদের ডিএনএ ল্যাবে পুরোদমেই কাজ করছি। রিপোর্ট করছি। মামলার প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে ডিএনএ ফাইল করে দিচ্ছি। প্রতি মাসে গড়ে ৮০টির মতো মামলার তথ্য-উপাত্ত আসে। সেগুলোর ডিএনএ প্রোফাইল করে দিচ্ছি।’

অপরাধীদের ডিএনএ প্রোফাইল করা হচ্ছে কিনা, জানতে চাইলে রুমানা আক্তার বলেন, ‘জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আলামত আসলে আমরা সেগুলো করে থাকি। যে মামলারই ডিএনএ প্রোফাইল করার জন্য বলা হয়, সেটাই আমরা করে দেই। সন্তানের পরিচয়ের জন্য বাবা-মায়ের আলামত এলে সেটা করে দেই। এছাড়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর ডিএনএ প্রোফাইলও করি। পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব নির্ধারণ করে থাকি। সারা দেশের পুলিশের জন্য একটাই ল্যাব। সরকারি যেসব মামলা আসে, সেগুলোর কাজও করে দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রজেক্টের আওতায় রয়েছে আরেকটি ডিএনএ ল্যাব রয়েছে। সেটার সঙ্গে অবশ্য আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। সেটা কোন পর্যায়ে আছে, তাও জানি না। তবে পুলিশের ডিএনএ ল্যাব পুরোদমেই চলছে। আমাদের মামলাগুলো আমরাই করি। এখানে নিয়মিতই মামলার আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অভিমত দিয়ে যাচ্ছি। এটি মামলা তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’ তাদের অভিমতের ওপর ভিত্তি করেই তদন্ত ও বিচার কাজের সহায়ক হিসেবে মামলার একটা ভালো ফল বা সাফল্য এসে থাকে বলেও তিনি জানান।

 

/এমএনএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
২০১৯ সালের পর নকআউটে হারেনি আর্জেন্টিনা
২০১৯ সালের পর নকআউটে হারেনি আর্জেন্টিনা
চাঁদাবাজি-মারধর: সাভারের বহিষ্কৃত সেই ছাত্রদল নেতা কারাগারে
চাঁদাবাজি-মারধর: সাভারের বহিষ্কৃত সেই ছাত্রদল নেতা কারাগারে
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সিসার চালান, নেপথ্যে দুই সহোদর
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সিসার চালান, নেপথ্যে দুই সহোদর
খামেনির শেষ বিদায়ে তেহরানে কারা, আমন্ত্রণ পাননি যারা
খামেনির শেষ বিদায়ে তেহরানে কারা, আমন্ত্রণ পাননি যারা
সর্বাধিক পঠিত
খামেনির শেষ বিদায়: চার মাস কীভাবে সংরক্ষণ করা হলো মরদেহ
খামেনির শেষ বিদায়: চার মাস কীভাবে সংরক্ষণ করা হলো মরদেহ
এএসপি ফজলুর রহমান গ্রেফতার
এএসপি ফজলুর রহমান গ্রেফতার
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মন্তব্য করা সেই প্রধান শিক্ষককে বরখাস্ত
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মন্তব্য করা সেই প্রধান শিক্ষককে বরখাস্ত
আ.লীগের উপদেষ্টা বিএনপিতে যোগ দিয়ে বললেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই বিএনপি’
আ.লীগের উপদেষ্টা বিএনপিতে যোগ দিয়ে বললেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই বিএনপি’
বাবার শেষ বিদায়ে থাকছেন না মোজতবা খামেনি
বাবার শেষ বিদায়ে থাকছেন না মোজতবা খামেনি