নির্বাচনের জন্য প্রশাসন প্রস্তুত

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২৩:৩২, নভেম্বর ০৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৮, নভেম্বর ০৯, ২০১৮

সরকার ও নির্বাচন কমিশন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে মাঠ প্রশাসনসহ কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে পুরোপুরি প্রস্তুত করা হয়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যেই মাঠ প্রশাসনে যেসব কর্মকর্তার মেয়াদ শেষ হয়েছে, তাদেরকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পদায়ন করা হয়েছে অধিকতর দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তাদের। জেলা পর্যায়ে ডিসি (জেলা প্রশাসক) বা এসপিদের (পুলিশ সুপার) নিয়োগ ও বদলি প্রায় শেষ পর্যায়ে। নির্বাচনের আগে খুব প্রয়োজন না হলে এ দুটি পদে আর কোনও নিয়োগ-বদলী নাও হতে পারে। একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের (ইউএনও) ক্ষেত্রেও। তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসনের এসব পদে কোনও বদলি বা নিয়োগের প্রয়োজন হলে নির্বাচন কমিশনের পরামর্শ নিতে হবে। তবে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে যেকোনও কর্মকর্তাকে নিয়োগ বা বদলি করতে পারবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যেই সচিব পদে বেশকিছু রদবদল করা হয়েছে। যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগে দায়িত্বরত সচিবদের অবসরে যাওয়ার সময় হয়েছে, তারা অবসরে চলে গেছেন। সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নতুন সচিবদের। ৩০ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে নতুন সচিব নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এদিকে, বৃহস্পতিবার (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সিইসি আগামী ২৩ ডিসেম্বর ভোটের তারিখ ঘোষণা করেন। তাই প্রথা অনুযায়ী নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতেই সাজানো হচ্ছে প্রশাসন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের বেশ কয়েকজন সচিব নিয়মিত অবসরে যাচ্ছেন। গত ১৮ অক্টোবর অবসরোত্তর ছুটিতে গেছেন পিএসসি’র সচিব আকতারী মমতাজ। গত ২৩ অক্টোবর অবসরে গেছেন ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মাহফুজুর রহমান। ওইদিনই অবসরে যাওয়ার কথা ছিল সাবেক অর্থ সচিব মুসলিম চৌধুরীর। কিন্তু অবসরে যাওয়ার আগেই গত ১৫ জুলাই সরকার তাকে পাঁচ বছরের চুক্তিতে কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) পদে নিয়োগ দিয়েছে। ভূমি সচিব আবদুল জলিল গত ২০ অক্টোবর, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব কাজী শফিকুল আজম ২৭ অক্টোবর ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব অপরূপ চৌধুরী ৩১ অক্টোবর অবসরে গেছেন। ২ নভেম্বরে অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও আবেদন করে আগাম অবসর নিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান। তিনি হাইকোর্টের বিচারপতির পদমর্যাদায় পাঁচ বছরের জন্য দুদক কমিশনার হয়েছেন।

একইভাবে বাংলাদেশ সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. আবদুর রব হাওলাদার ৩০ নভেম্বর অবসরে যাবেন। ওইদিনই অবসরে যাবেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব সিরাজুল হক খান ও বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বোস। এছাড়া, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফয়জুর রহমান চৌধুরী ১৫ ডিসেম্বর, তথ্য সচিব আবদুল মালেক ৩০ ডিসেম্বর, ২৪ ডিসেম্বর বিসিএস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর (সচিব) মোশারফ হোসেন, ৩০ ডিসেম্বর প্রতিরক্ষা সচিব আখতার হোসেন ভুইয়া, সংস্কৃতি সচিব মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ ও ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন আহমদ অবসরে যাবেন।

ইতোমধ্যেই সরকার এসব মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে নিয়োগ দিয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর জাতীয় যাদুঘরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. মাকছুদুর রহমান পাটোয়ারীকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এস এম আরিফ-উর-রহমানকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও এন সিদ্দীকা খানমকে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়ের সচিব এবং সরকারি যানবাহন অধিদফতরের পরিবহন কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদকে ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত সচিব পদ মর্যাদায়) হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।  

এর একদিন পরেই অর্থাৎ ১ নভেম্বর জনপ্রশান মন্ত্রণালয় থেকে পেট্রোবাংলার চেয়ারারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আবুল মনসুর মো. ফায়জুল্লাহকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একইভাবে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সিনিয়র সচিব এস এম গোলাম ফারুককে স্থানীয় সরকার বিভাগে এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব জাফর আহমেদ খানকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব পদে বদলি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক দুটি আদেশে এই রদবদল করা হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও  জানা গেছে, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবুল কাশেমকে জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত সচিব পদমর্যাদায়) এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সত্যব্রত সাহাকে বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত সচিব পদমর্যাদায়) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে সরকার বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক (সচিব) মো. আসাদুল ইসলামকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব এবং জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক (সচিব) মো. কামাল উদ্দিন তালুকদারকে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আর কোনও পদে নিয়োগ ও বদলির সম্ভাবনা নেই। তবে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে—  বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহম্মদ শফিউল আলমের অবসরে যাওয়ার কথা এ বছরেই, তাকে একবছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

অনেকেই বলছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে কর্মকর্তাদের খুশি করতিই সম্প্রতি প্রশাসনে পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিবের পর সর্বশেষ গত ২৪ অক্টোবর উপ-সচিব পদে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। সিনিয়র সহকারী সচিব ও সমমর্যাদার ২৫৬ কর্মকর্তাকে উপ-সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর আগে ২৯ আগস্ট ১৬৩ কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব এবং ২০ সেপ্টেম্বর ১৫৪ কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

কয়েকদিনের ব্যবধানে শিক্ষা প্রশাসনে একহাজার ৬১৭ শিক্ষক পদোন্নতি পেয়েছেন। অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের পর গত ৩১ অক্টোবর সহকারী অধ্যাপক পদে প্রভাষক ও সমপর্যায়ের ৬৩৪ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর আগে ১০ সেপ্টেম্বর ৪০৯ জনকে অধ্যাপক এবং ২৫ অক্টোবর ৫৭৪ জনকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। গত ২১ অক্টোবর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ২৪০ জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে (গ্রেড-১১) সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (গ্রেড-১০) পদে পদোন্নতির সুপারিশ করে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। গত ১৭ সেপ্টেম্বর পদোন্নতি পান সরকারি হাইস্কুলের ৪২০ জন সহকারী শিক্ষক। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৯৬ জনকে সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং ৫২ জনকে জেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে পদায়ন করা হয়। ১৫০ জন চিকিৎসককে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দিয়ে গত ২ অক্টোবর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হয়।

এদিকে, সুপার নিউমারারি (সংখ্যাতিরিক্ত পদ সৃষ্টি) ভিত্তিতে ৪৯৫ জনের পদোন্নতি চাওয়া হয় পুলিশ সদর দফতর থেকে। এর মধ্য থেকে ২৩০ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। গত জুলাই মাসে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে পুলিশ বিভাগে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্যের একটি চিত্র তুলে ধরে চিঠি পাঠানো হয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। গত ২২ অক্টোবর কৃষি ডিপ্লোমাধারী উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও সমমানের পদধারী কর্মকর্তাদের জাতীয় বেতন স্কেলের ১০তম গ্রেডে (আগের দ্বিতীয় শ্রেণি) উন্নীত করে সরকার। আগে তারা ১১তম গ্রেডে (তৃতীয় শ্রেণি) বেতন পেতেন।

এপ্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘প্রশাসনে নিয়োগ ও বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেই নিয়োগ ও বদলি করা হয়েছে।’

/এসআই/এপিএইচ/

লাইভ

টপ