‘আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজে বাড়াতে হবে সহনশীলতা’

Send
তাসকিনা ইয়াসমিন
প্রকাশিত : ০৩:২৩, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৮, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৮

আত্মহত্যানিজের অপরাধে বাবা-মাকে স্কুলে ডেকে এনে অপমান করায় গত সোমবার (৩ ডিসেম্বর) আত্মহত্যা করেছে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারী। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন শিক্ষার্থী বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছেন।
চিকিৎসকদের ফেসবুকভিত্তিক সংগঠন প্লাটফর্ম -এর তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের শুরুতে সারাদেশে মেডিক্যাল কলেজের পাঁচজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।  এমন পরিস্থিতিতে আত্মহত্যা প্রতিরোধে সমাজকে আরও সহনশীল ও দায়িত্বশীল হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আত্মহত্যাকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তা রোধে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে সরকারকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) -এর তথ্যে, বিশ্বে প্রতিবছর ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। বিশ্বে  ১৫-২৯ বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বের কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ আত্মহত্যা করছে। প্রতি একজনের আত্মহত্যা অপর প্রায় ২৫ জনকে আত্মহত্যা প্রবণতার দিকে নিয়ে যায়। আত্মহত্যা প্রতিরোধের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। উন্নত দেশগুলোতে ৯৫ ভাগ আত্মহত্যা মডেলিংয়ে ভালো ক্যারিয়ার গড়ার আকাঙ্ক্ষার কারণে হয়, অনুন্নত দেশগুলোতে এই হার মাত্র ৮ ভাগ। ২০১৬ সালের তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, ৭৯ ভাগ আত্মহত্যা মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যা বংশানুক্রমিক, স্বভাবগত, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। কখনও আতঙ্ক বা হারানোর  সমন্বিত কারণে অনেকে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মো. তাজুল  ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আত্মহত্যা তো দুই ধরনের হয়। পরিকল্পিত ও আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যা। সাধারণত টিন-এজ গ্রুপই আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যা করে। এই বয়সে আবেগ বেশি থাকে, ক্রোধ থাকে, অল্পতেই হতাশ হয়ে পড়ে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের মেয়েটির হয়ত স্কুলে পড়ার চাপ ছিল। এ কারণে সে যদি দেখে যে নকল করলে ভালো করা যাবে সেজন্য চাপ থাকলে তারা এ কাজ করতে পারে। এরপর তার মা-বাবাকে ডেকে নিয়ে শিক্ষক  বকাঝকা করেছেন। এটা তো তার জন্য একটা বড় ধরনের অপমান। আবার তাকে বলা হয়েছে, তোমাকে টিসি (ছাড়পত্র)দেওয়া হবে। অর্থাৎ সে মনে করলো যে, টিসি দেওয়া মানে আমার জীবনের সব শেষ। এই যে অপমান, হতাশা, চাপ এই বিষয়গুলো আবেগতাড়িত আত্মহত্যার কারণ।’

ব্রাইটার টুমোরো ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট শিপ্রা জামান জয়শ্রী আত্মহত্যার সামাজিক কারণগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সমাজে যখন নির্যাতন বাড়ে, পারিবারিক নির্যাতন বাড়ে তখন আত্মহত্যাও বাড়ে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোনও নীতিমালা থাকলে এটা হতো না। শিক্ষকদের যদি আমরা মানসিক স্বাস্থ্য সচেতন করতে পারতাম তাহলে এই বিপদটি ঘটতো না।  তিনি বলেন, ভিকারুননিসার মতো একটি নামকরা প্রতিষ্ঠান এখানে যদি এই অবস্থা হয় তাহলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কি ঘটছে? এটা খুব উদ্বেগের।’

আত্মহত্যা প্রতিরোধ প্রসঙ্গে ডা. মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আত্মহত্যার কারণ যেমন বহুবিধ, প্রতিরোধও সেভাবেই করতে হবে। অতিরিক্ত চাপ অথবা অপমান করার মতো সুযোগ যেন না থাকে। আমরা যেন সব জায়গায় মানুষকে সম্মান করতে শিখি, মর্যাদা দিতে শিখি, সেটা আমাদের দেখতে হবে। অসম্মানের সংস্কৃতি তো আমাদের দেশে হওয়া উচিত না। টিন-এজ বয়সীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হতাশা সহ্য করার ক্ষমতাও বাড়াতে হবে। আমাদের সমাজ ও পরিবারের কাঠামোর ভেতরে এমন কিছু উপাদান বের করতে হবে যাতে আমাদের সমাজটা আরও বেশি সহনশীল,  মর্যাদাপূর্ণ ও আরও সহযোগিতাপূর্ণ হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা, আক্রমণ এবং অপমান এগুলো যেন কম হয়। 

শিপ্রা জামান জয়শ্রী বলেন, আমাদের অসুস্থ সমাজকে সবাই মিলে সুস্থ করতে হবে। প্রত্যেকের পাশের মানুষকে সজাগ হতে হবে, মানবিক মূল্যবোধ বাড়াতে হবে। মানুষগুলো যদি একটু ভালো হয়, তারা অন্য মানুষের মানসিকতা বোঝে তাহলে আত্মহত্যা কমবে।

অারও পড়ুন: শান্তিনগরে ভিকারুননিসার শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

                 ভিকারুননিসার অধ্যক্ষসহ ৩ শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা

 

/জেজে/ওআর/

লাইভ

টপ