ভূমিহারা মানুষের আশ্রয়ের আকুতি! (ভিডিও)

Send
শাহেদ শফিক, ঢালচর থেকে ফিরে
প্রকাশিত : ১২:০২, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১১, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯

ভূমিহারা মানুষের আশ্রয়ের আকুতি!

জলবায়ুর পরিবর্তন আর মেঘনার করাল গ্রাসে সর্বস্ব হারিয়ে প্রতিবছর উদ্বাস্তু হচ্ছেন নদীপারের হাজার হাজার মানুষ। এসব ভাসমান মানুষের বেশিরভাগেরই ঠিকানা এখন মেঘনার বুকে জেগে ওঠা নতুন চর, বেড়িবাঁধ কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে। এমনই একটি চরের নাম ঢালচর। তবে এই চরে আশ্রয় নিলেও তাদের জীবনে স্বস্তি নেই, অর্ধ শতাব্দী ধরে তাদের লড়াই করতে হচ্ছে দস্যু, লুটেরা, ভূমিখেকোদের সঙ্গে। নোয়াখালী ও ভোলার মাঝামাঝি মেঘনার বুকে জেগে ওঠা এই চরে নেই প্রশাসনের সরাসরি তদারকি। নামমাত্র পুলিশ ক্যাম্প থাকলেও প্রভাবশালীদের ইচ্ছায় চলে এখানকার আইন-কানুন।  চরটি সরেজমিন ঘুরে ৬ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ পড়ুন প্রথম পর্ব।

‘খোদার জমিন ধনীর দখলে গেছে আইনের জোরে, আমাগো জমিন অইব যেদিন আইনের চাকা ঘোরে।’ কবি নির্মলেন্দু গুণের ক্ষেতমজুরের কাব্যে’র এমন আহাজারি যেন নোয়াখালীর হাতিয়া ও মনপুরা উপজেলার মাঝামাঝি স্থান ঢালচরের বাসিন্দাদের। উত্তাল সাগরের ভয়াল ছোবলে সহজ-সরল এই মানুষগুলোর জীবন যেখানে সংগ্রামের আরেক প্রতিচ্ছবি, সেখানে আরেক দল মানুষ তাদের উচ্ছেদ করে বানিয়েছেন ‘অট্টালিকা’। যাদের উচ্ছেদ করা যায়নি তাদের ওপর চলছে হামলা-মামলা, ধর্ষণসহ অমানুষিক নির্যাতন। পাশাপাশি সরকারি এই খাস জমিতেও বসানো হয়েছে নিজেদের জারি করা ‘খাজনা’।

ঢালচর

সেই ষাটের দশকের দিকে নদীভাঙনের কবলে পড়ে শত শত ভূমিহীন পরিবার মেঘনার বুকে জেগে ওঠা এই চরে আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে এই চরটিতে বসবাস করছে সাড়ে চার হাজারের বেশি ভূমিহীন পরিবার। তাদের অভিযোগ, হাতিয়া ও মনপুরা উপজেলার কিছু প্রভাবশালী লোক এই চরের খাস জমি থেকে তাদের উচ্ছেদ করার চেষ্টা করছে। এরইমধ্যে অনেক ভূমিহীনকে উচ্ছেদ করে তারা চর দখলও করেছে। গড়ে তুলেছে মাছের বড় বড় প্রজেক্ট। স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সরকারের একজন সাবেক প্রভাবশালী সচিব এর সঙ্গে জড়িত।

ভূমিহীনদের অভিযোগ, তাদের উচ্ছেদ করার জন্য বিভিন্ন সময় জলদস্যু ও বনদস্যুদের লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। হামলা-মামলা দিয়েও নির্যাতন করা হয়েছে। উচ্ছেদ কিংবা ভোগের জন্য নারীদের ধর্ষণ কিংবা সম্ভ্রমহানি ঘটানো এখানে কোনও ব্যাপারই না, এমনকি ফাঁড়ির পুলিশরাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটাচ্ছে অহরহ। বছর বছর কেড়ে নেওয়া হচ্ছে ভূমিহীনদের উৎপাদিত সোনার ফসল। নির্যাতনে টিকতে না পেরে এরই মধ্যে অনেকেই চর ছেড়ে পালিয়েছেন। এরপরও যারা একখণ্ড খাস জমি পাওয়ার আশায় বিচ্ছ্ন্নি এই চরটিতে শত জুলুম সহ্য করে টিকে আছেন, সরকারিভাবে তাদের কেউ কোনও জমি বুঝে পাননি, পাবেন তারও নিশ্চয়তা কেউ দেয় না। তবুও তাদের চোখে দূরের বাতিঘর, একদিন সেখান থেকে কেউ আলো নিয়ে এসে তাদের স্বপ্নগুলো আলোকিত করে যাবেন।6

১৯৮৫ সাল থেকেই এই চরে বসবাস করে আসছেন ৭৫ বছর বয়সী চৌধুরানী। চরে বসবাসের দীর্ঘ জীবনে জলদস্যু বাহিনীর পাশাপাশি ভূমিদস্যুদের নির্মম নির্যাতনের সাক্ষী তিনি। নিজের ভাষায় তিনি সেসব নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনের কাছে। বলেন, ‘আঙ্গো হোলাইনেরে মাছিরে খাবা, মশারে খাবা (আমাদের ছেলেমেয়েদের মাছি খায়, মশা খায়)। বাগানে বাগানে হোলাইনে রাতে রাত কাটা দিনে দিন কাটা (বাগানে বাগানে ছেলেমেয়েরা রাতে রাত কাটায়, দিনে দিন কাটায়)। কী হাপে খাইবে না হোকে খাইবে এদিকে চা না (সাপে খাবে কী জোঁকে খাবে সেদিকে খেয়াল নেই)। এখন আন্নেরা আছেন আর ওপরে আল্লাহ আছেন (এখন আপনারা আছেন আর ওপরে আল্লাহ আছেন)।’

এসব কে করে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কামাল চৌধুরী ও সজিবে (সচিব)।

সচিব কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মনপুরার সচিব।

অশীতিপর এই বৃদ্ধা বলেন, ‘আমার হোলারে দুইবার ধরি নেয় (আমার ছেলেকে দুইবার ধরে নিয়েছে)। আঁর আমার হোলা নিদোষী (আমার ছেলে নির্দোষ)। আমি ভিক্ষা করে টিয়া তুলি আঁর হোলা ছুডাই আনছি (আমি ভিক্ষা করে টাকা তুলে ছেলেকে ছাড়াই এনেছি)। অর (সচিব) লাই শান্তি হাই না (ওর কারণে শান্তি পাই না)। অ আঙ্গোরে শান্তি দেয় না (ও আমাদের শান্তিতে থাকতে দেয় না)। রাইত অইলে হোলাইনে বাগানে থাকে (রাত হলে সন্তানরা বাগানে আশ্রয় নেয়)। আই মা হয়্যা হাসর নাসর করি (আমি মা হয়ে শুধু আহাজারি করি)। অ  হিয়ানতোন এক বন্দুক চা, দেশ বেক্কান কাঁপি যা (ও সেখান থেকে গুলি ছোড়ে, এতে সারাদেশ কেঁপে ওঠে)। ডরে কলিজা কাঁপি, মনে কয় মাডি হাডুক, মাডির ভিতরে ঢুকি যাই (ভয়ে কলিজা কেঁপে ওঠে, মন চায় মাটি ফেটে যাক, আমি সেই মাটিতে ঢুকে পড়ি)। বো বেডি সবার কাঁন্দনে হাসর নাসর হয়ে যায় (গৃহবধূ ও মেয়েদের কান্নায় আহাজারির রোল পড়ে যায়)।ঢালচর

দীর্ঘশ্বাস ফেলে এই বৃদ্ধা বলেন, ৩৩টি বছর বন ও জলদস্যুদের সঙ্গে যুদ্ধ করেও সরকারের একখণ্ড খাস জমির মালিক হতে পারছেন না। অথচ এই জমির মালিক হওয়ার সংগ্রামে তাকে বহুবার সম্ভ্রমহানির শিকার হতে হয়েছে। হামলা মামলা ও অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে স্বামী-সন্তানসহ সবাইকে। কোটিপতি ভূমিদস্যুর টাকা আর ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের অনৈতিকতার কাছে হারতে হারতে তিনি এখন নিঃস্ব। কষ্টে উপার্জিত টাকায় তৈরি করা দীর্ঘদিনের বসতভিটা এখন চোখের নোনাজলে ভাসিয়ে দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে এই বৃদ্ধা।

তিনি জানান, প্রভাবশালীদের নির্যাতন আর নিজের দুঃখ-কষ্টের কথা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিসহ বহু মানুষকে জানালেও কেউ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিনিধিকে পেয়ে আবারও দিলেন কিছু ঘটনার খোলামেলা বর্ণনা। তার সম্ভ্রমহানি ঘটানো ও ধর্ষিত হওয়ার সেসব ঘটনার বর্ণনা ও হাহাকার শুনতে শুনতে চোখের জল মুছতে থাকেন পরিবার ও প্রতিবেশীদের অনেকেই। কিন্তু, এই অশীতিপর নারীর হাহাকার ৩৩ বছরেও পৌঁছায়নি প্রশাসনের কর্তা বা রাজনীতিকদের কান পর্যন্ত।

বৃদ্ধার বয়ান থেকে কামাল চৌধুরী ও মনপুরার সচিবের নাম শুনে নোটবুকে টুকে রাখি। ‘প্রভাবশালী’ এসব মানুষ কতটা প্রভাব খাটাচ্ছেন তা জানার আগ্রহ জাগে। তবে তাদের বক্তব্য শুনে মনে হয়, প্রভাবশালীদের প্রতিপত্তির কাছে একরকম অসহায় এখন নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়া ও ভোলার মনপুরা উপজেলার মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত ঢালচরের এই চৌধুরানীদের জীবন। এমন পরিণতি শুধু চৌধুরানীর নয়, তার মতো ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন আসমা খাতুন, জোলেখা বেগম, বিলকিছ আরা বেগম, মরিয়ম বিবিসহ অনেকেই। এমন নির্যাতন আর বাস্তবতার মধ্যেই এখনও তাদের থাকতে হয়। এরা এখন বসবাস করছেন ঢালচরে। নদীভাঙার কারণে সর্বস্ব হারিয়ে বিগত ৬০ বছর ধরে প্রকৃতি, ভূমিদস্যু ও জলদস্যুদের সঙ্গে যুদ্ধ করে একখণ্ড খাস জমিতে বেঁচে থাকার আশায় স্বপ্ন বোনার চেষ্টা করছেন তারা।

ভূমি বাঁচাতে গিয়ে ডাকাতদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তার মতো আরেক বিধবা রোকেয়া বেগম। সেই এক বিকেলে অস্ত্রের মুখে ঘর থেকে উঠিয়ে নেওয়ার পর আর আজও  ফিরে আসেননি স্বামী। স্বামীর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে কেটে গেছে দীর্ঘ ১৪টি বছর। এর বিচারও পাননি কারও কাছে। চরের দস্যুদের নির্মম তাণ্ডবের শিকার হয়ে তিনি এখন বিধবা। থাকেন এক ছেলে ও দুই কন্যাসন্তান নিয়ে। উপার্জন করার কেউ না থাকলেও সংসারে সব দেখার দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে। তাই অন্যের ক্ষেতে বদলা (ক্ষেতমজুর) বা কারও ঘরবাড়িতে কাজ করেই চলছে তার সংসার।1

রোকেয়ার এই দুর্বলতাকে দস্যুবাহিনীর পাশাপাশি ব্যবহার করতে চেয়েছে পুলিশও। তাই বারবার তার ওপর চলে অমানুষিক ও শারীরিক নির্যাতন। বাংলা ট্রিবিউনের কাছে সেই নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। নিজের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে রোকেয়া বেগম কেঁদেছেন বহুবার। তিনি বলেন, ‘এই চরে এসেছি আমার দুইটা ছেলে ও একটা মেয়েকে নিয়া। আমার বাড়ি নদীতে ভেঙে গেছে। সচিবে (সাবেক জ্বালানি সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরী) যখন পুলিশ ক্যাম্প দিয়েছে, ওইখান থেকে আমার কাছে লোক পাঠায়ে বলে, তুমি পুলিশের ভাত পাক (রান্না) করবা। তিন মাস কাজ করার পর আমাকে বলে এই চরে হাতিয়ার কে কে আছে তা দেখাই দেওয়ার জন্য। আমি বলেছি তাদেরকে তো আমি চিনি না। আমি রাতে রান্না করতে গেলে আমার ওপর অত্যাচার করে। আমারে নষ্ট করে। আমার সামাজিকতা আছে, আপনারা আমার বিচার করেন। তা না হলে আমি ওছখালী যাবো মামলা করার জন্য। পুলিশ রাতে-বেরাতে, সব সময় আমাকে অত্যাচার করে। আমি ওদের জন্য টিকতে পারি না। তারা বলে, ওদের সাথে খারাপ কাজ করলে আমাকে রাখবে, না হয় রাখবে না। যারা কামাল চৌধুরীর আন্ডারে (অধীনে) কাজ করে হেদেরকেও (তাদের) জানাইছি। তারাও বলে, এমন হলে থাকতে পারবে, না হয় পারবে না। আমার জামাই নাই। কী করবো?’

কিছুক্ষণ থেমে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের নির্মম এক ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি। বলেন, ‘এক রাতে ক্যাম্পে ভাত পাক করতে গিয়া তিনজন পুলিশ আমার ওপর ঝাঁপায়ে পড়ে। আমি রাজি না। ওরা ছাড়ে না। নির্যাতন করার কারণে আমার নয় হাজার টাকা ওষুধ খরচ গেছে। জোরে ব্লাড (রক্ত) ছুডেছে। কেউ একটু ধরতেও আসেনি।’ বলতে বলতেই শিউরে উঠে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

‘আমি একটা টাকাও দিতে পারিনি। দিদার ডাক্তারের (স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তার) দোকান থেকে ওষুধ নিয়েছি। আমার স্বামী নেই। সব সময় পুলিশ আমাকে অত্যাচার করে। আমি থাকতে পারি না। কালাম বাতাইন্না আর হারুনরা মিলেই আমাদের ওপর অত্যাচার করে। আমি চরে বসবাসকারী হাতিয়ার মানুষের বিষয়ে তাদেরকে তথ্য দিতাম। না হলে আমি চরে থাকতে পারবো না’- বলেন রোকেয়া।

এবার তার কাছে প্রশ্ন করে আমরা জানতে পারি অভিযুক্ত কালাম বাতাইন্না আর হারুনের পরিচয়। জলদস্যু হিসেবে ঘুরে বেড়ানো এই বাহিনী তাদের কাছে পরিচিত ডাকাত হিসেবে। সহায়হীন এই নারীদের সম্ভ্রমহানির ক্ষেত্রে পুলিশ-ডাকাত যেন এক মেরুতে এসে দাঁড়ায়। তাই রাত হলে ডাকাতদের ভয়ে থাকেন ঢালচরের নারীরা। এমন ডাকাতদের হাতে সম্ভ্রম খোয়ানোর আরেক রাতের বর্ণনা দেন রোকেয়া। তিনি বলেন, ‘এক রাতে তারা আমার ঘরে ঢোকে। ডাকাত বুঝে আমি চিৎকার করতে গেলেই তারা আমার মুখ চেপে ধরে। আমি আর কিছুই বুঝতে পারিনি। আমার মেয়েরা ঘুম থেকে উঠে দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছি।

প্রতিকারহীন এসব মানুষের চিৎকারে চরের বাতাস হাহাকার তুললেও নরপশুদের অত্যাচার থামে না। তাই নীরবে সব যন্ত্রণা সহ্য করে আসছেন তারা দীর্ঘদিন ধরে শুধু একখণ্ড জমি পাওয়ার আশায়। কিন্তু, প্রশাসন আর প্রভাবশালীদের চক্করে সে আশায়ও যেন গুড়েবালি!

রোকেয়া বলেন, ‘ চরে এসেছি শুধু একটু আশ্রয়ের জন্য। এখন যদি এখানেও না থাকতে পারি তাহলে আর কী করবো। পাশে নদী আছে, সেখানে ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া আর আমাদের কোনও উপায় নাই।’

সম্প্রতি উপকূলীয় এলাকার এই চরে গেলে স্থানীয় ভূমিহীনরা এভাবেই তাদের কষ্টের কথা জানান এ প্রতিবেদকের কাছে। জানাতে থাকেন আশ্রয়ের জন্য একখণ্ড জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার আকুতি।

সরকারি কর্মকর্তা নই, গণমাধ্যমের কর্মী–এ পরিচয় দিলেও তারা যেন তাতেই আশ্রয় খোঁজেন। নিজেদের একজন ভেবে এ প্রতিনিধিকে টেনে নিয়ে যান ঢালচরের মসজিদ মার্কেটে। সেখানে অভূতপূর্ব, অদ্ভুত এক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। সাংবাদিক এসেছে এমন খবর ছড়ালে কিছুক্ষণের মধ্যেই শত শত নারী পুরুষ জড়ো হয়ে যান। তারা দাবি করতে থাকেন, তাদের ওপর যারা নির্যাতন চালাচ্ছে তাদের বিচারের আওতায় আনতে নির্যাতনের ঘটনাগুলো যেন গণমাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এরপর দূরের শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দ্রোহ দেখাতে একসঙ্গে স্লোগানে মুখরিত করেন ঢালচরের মসজিদ মার্কেট এলাকা। যেন বিজয় বুঝি সামনেই, আরেকটু যুদ্ধ হলেই পৌঁছে যাবেন সবাই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। জান গেলেও জমি দেবো না পণ করে তাদের কণ্ঠ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। সে কণ্ঠধ্বনিকে উড়িয়ে মেঘনার অপর পারে নিয়ে যেতে চায় দমকা বাতাস। এরই মধ্যে এক বৃদ্ধ এসে অনুনয় করেন, ‘বাবা, ঢালচরের খাস জমি যেন প্রভাবশালীরা দখল করতে না পারে, যেন আমাদের মধ্যে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়, সেই কথাটা একটু লিখবেন, সরকারের কাছে আমাদের এই আবেদনটুকু পৌঁছে দেবেন বাবা।’

এই আকস্মিক মানববন্ধন শেষ হলে চর ঘুরে দেখতে দেখতেই তাদের অনেকের সঙ্গে কথা হয়। এ সময় এগিয়ে আসেন ষাটোর্ধ্ব এক নারী। জলদস্যু, ভূমিদস্যুদের আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা এই নারীর নাম শাহেনা আক্তার। তিনি শরীরের কিছু ক্ষত দেখিয়ে বলেন, ‘আরও আছে, দেখাতে পারবো না। ওরা আমার ওপর অত্যাচার করেছে। আরও অনেক মা-বোনের ওপর অত্যাচার করেছে। এখনও করে।’ তার শরীরে এ ক্ষত লজ্জার, এ ক্ষত ভীতির! অঝোরে কাঁদলেন তিনি। তার কান্নায় চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চরের নির্যাতিত অন্য নারীরাও। তারাও মনের কোণে লুকিয়ে রেখেছেন এমন যন্ত্রণার আঘাত। কিন্তু কাকে বলবেন? এ তো লজ্জার! অপমানের!

শাহেনা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনের কাছে বর্ণনা করেন নির্যাতনের ভয়াবহতা। বলেন, ‘চর দখল করার জন্য মনপুরার কামাল চৌধুরীর লোকেরা আমাদের পিটিয়ে কয়েকবার গরু-ছাগল সব নিয়ে গেছে। আমার হাত ভেঙে রেখে গেছে। এখনও ভাঙা হাত নিয়ে আছি। কোনো কাজ করতে পারি না।’

এ সময় পাশে দাঁড়িয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন জোলেখা বেগম। বলার শুরুতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, ‘চরে কোনও তরুণী থাকতে পারে না। মনপুরা আর হাতিয়ায় প্রভাবশালীরা ডাকাত বাহিনী লাগিয়ে লেলিয়ে দেয়। লজ্জার বিষয়! কাউকে কিছুই বলতে পারি না আমরা। বললে বিচার পাই না। হতে হয় সমাজছাড়া।’

আরও কয়েকজন নারী-পুরুষ সমস্বরে অভিযোগ জানান, ‘বহুবার উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপি সাহেবকে জানিয়েছি। তারাও আমাদের কোনও সাহায্য করেন না। পুলিশকে দেখিয়ে দিয়ে দায় সারেন। কিন্তু পুলিশ কোনও সহযোগিতা করে না।’
এ সময় স্ত্রীকে নির্যাতনের কাহিনি জানালেন এনায়েত উদ্দিন নামের এক প্রৌঢ়। বলেন, হাতিয়ার সাহেবানী এলাকায় আমাদের বাড়ি ছিল। নদীভাঙনের কারণে ১৯৯০ সালের দিকে এই চরে এসে থাকতে শুরু করি। বড় লজ্জার কথা। নতুন বিয়ে করে স্ত্রীসহ চরে আসার পর এক রাতে পাশের বাগান থেকে একদল ডাকাত এসে দুইটা ফায়ার করে। আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। এরপর প্রথমে আমার ঘরের দরজা লাথি দিয়ে ভেঙে ফেলে। মনে করেছিলাম নতুন বিয়ে করেছি, ডাকাতরা স্বর্ণালঙ্কার নিতে এসেছে। কিন্তু দেখি উল্টা। তারা আমাকে বেঁধে ফেলে, এরপর...।’ আর শোনার বা শোনানোর দরকার পড়ে না। এনায়েত উদ্দিনের চোখের পানি মুখ বেয়ে টলমল করে গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। থেমে থেমে হাউমাউ করে কাঁদছেন তিনি। ক্ষোভে কষ্টে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেবল বলেন, ‘এসব বলে আর লাভ নাই। গরিবের লাই (জন্য) কোনও সরকার নাই।’
আস্তে জানতে চাই, ‘এসব তো অনেকদিন আগের ঘটনা বলছেন। এখনও কি এমনটা ঘটে।’
তিনি বলেন, ‘ঘটছে। হরহামেশাই ঘটছে।’
যাদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ তাদের কাউকে ঠিক সামনে পাওয়া গেল না। ঢালচরবাসীর বয়ানে তাদের কাছে ভিড়লে বিপদেরও আশঙ্কা আছে। কিন্তু, তারপরেও সাবেক সচিবসহ প্রভাবশালীদের দখলে থাকা জায়গা ও মাছের ঘেরের খোঁজ জানতে চাই তাদের কাছে। তারা দেখিয়ে দেয় সচিবের লাল অট্টালিকার পথ।

আগামীকাল পড়ুন: ভূমিহীনের চরে সচিবের অট্টালিকা!

 

 

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ