রাস্তায় ‘ফায়ার হাইড্রেন্ট’ কেন বসানো প্রয়োজন

রাফসান জানি
৩০ মার্চ ২০১৯, ১৩:৪৪আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৯, ১৯:৩৮

ফায়ার হাইড্রেন্ট (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত) রাজধানীতে একের পর এক ঘটছে অগ্নি দুর্ঘটনা। অধিকাংশ সময় পানি স্বল্পতার কারণে আগুন নেভাতে গিয়ে বাঁধার সম্মুখিন হচ্ছেন ফায়ার ফাইটাররা। সরু রাস্তায় পানি বহনকারী গাড়ি প্রবেশ করতে না পারা, বাড়ির নিচে রিজার্ভ ট্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত পানি না থাকা এবং নগরীর বিভিন্ন স্থানে থাকা জলাধারগুলো ভরাট করে ভবন নির্মাণ করার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার সময় পানির সংকটে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। তবে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব বলে জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। একটি পরিকল্পিত নগরীতে আগুন নেভানোর জন্য বিভিন্ন রাস্তার ধারে ‘ফায়ার হাইড্রেন্ট’ বসানো থাকে। যা সরাসরি পানির পাম্পের সঙ্গে সংযোগ দেওয়া থাকে এবং এতে পানির অতিরিক্ত প্রেসার দেওয়া থাকে। কোথায় আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে পৌঁছামাত্রই হাইড্রেন্টের বাল্ব খুলে পানি ছিটানোর জন্য পাইপ লাগাবে আর সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকের থেকে বেশি গতিতে পানি বেরিয়ে আসবে। যা দিয়ে সহজে ও দ্রুত সময়ের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহর পরিকল্পিতভাবে গড়ে না উঠলেও সরকার ও নগরের দায়িত্বশীলরা চাইলে পুরো ঢাকা শহরজুড়ে ‘স্ট্রিট হাইড্রেন্ট’ বসানো সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীলদের সদিচ্ছা। চারপাশে নদী বেষ্টিত ঢাকা শহরে পানির অভাবে আগুন নেভাতে না পারার মতো ঘটনাকে লজ্জাজনক বলে মনে করছেন নগর নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (অপারেশন ও মেইনট্যান্স) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ‘পুরান ঢাকাসহ সারা শহরে স্ট্রিট হাইড্রেন্ট করার জন্য সিটি করপোরেশন ও ওয়াসাকে অনেক আগে থেকে সুপারিশ করে আসছি। সরকার চাইলে পুরো ঢাকা শহরে হাইড্রেন্ট বসানো সম্ভব।’ 

স্ট্রিট হাইড্রেন্টের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘পাম্পের পানি প্রেশার দেওয়া থাকবে। বিভিন্ন পয়েন্টে হাইড্রেন্ট বসানো থাকবে। সেগুলোতে ডেলিভারি হুজ লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে পানি সোর্স পাব। এবং সেই পানি দিয়ে আগুন নেভানোর কাজটা দ্রুত করা যাবে।’ 

শহরজুড়ে স্ট্রিট হাইড্রেন্ট বসানোর শতভাগ সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট এর সাবেক সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের এই ঢাকা শহরে স্ট্রিট হাইড্রেন্ট বসানোর শতভাগ পসিবিলিটি আছে। মরুভূমিতে ফায়ার হাইড্রেন্ট বসানো গেলে আমাদের এখানে কেন নয়? পৃথিবীর একমাত্র রাজধানী ঢাকা, যার চারপাশে নদী রয়েছে। আমরা পানি বেষ্টিত অবস্থায় থেকে পানির অভাবে আগুন নেভাতে পারি না, এর চেয়ে লজ্জাজনক অবস্থা আর কী হতে পারে? এটার উত্তর কে দিবে? এই ব্যর্থতা সরকারের, নির্বাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর, নীতি নির্ধারকদের, সংসদ সদস্যদের। বিষয়টা এরকম, তারা মেডিক্যাল বোর্ডে ডাক্তারদের পরিবর্তে আলু পটল ব্যবসায়ীদের বসিয়ে রোগীর চিকিৎসা করতে চান।’ 

পরিকল্পিতভাবে নগর গড়ে উঠলে জননিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি বিষয় সংযুক্ত থাকতো, যাতে ফায়ার হাইড্রেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা করা থাকতো, এ অব্যবস্থাপনার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন মোবাশ্বের হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের পাশে কলকাতায় ব্রিটিশ আমল থেকে ফায়ার হাইড্রেন্ট আছে। কিন্তু আমাদের এখানে নেই। গত ১৫-২০ বছর ধরে বলা হচ্ছে, ঢাকা শহরের চারপাশে নদী আছে, জরুরি ভিত্তিতে ফায়ার হাইড্রেন্ট করা হউক। এটা করা হলে যেখানে ফায়ারের গাড়ি ঢুকতে পারে না, সরু গলি, সেখানেও পাম্প দিযে আগুন নেভানো সম্ভব। এগুলো তো বলা হচ্ছে। আমরা ফায়ার হাইড্রেন্টের বদলে নির্মাণ করি ফ্লাইওভার। যেসব এলাকা ডেভেলপমেন্ট হয়েছে, কিন্তু ফায়ার হাইড্রেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা রাখা হয়নি, সেসব স্থানে এখন করলেই হয়। আমাদের তো আগে ফ্লাইওভার ছিল না, এখন হচ্ছে না? হচ্ছে। তাহলে ফায়ার হাইড্রেন্টও বসানো কেন সম্ভব না?’ 

তার ভাষ্য, ‘একটি নগরের উন্নয়নের জন্য বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হয়। হাসপাতালে কোনও রোগী বেশি অসুস্থ হলে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডে কি রোগীর স্বজনরা থাকেন না বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা থাকেন? বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বসে রোগ নির্ণয় ও করণীয় ঠিক করেন। আমাদের সড়কে দুর্ঘটনা দূর করা জন্য কৃষিমন্ত্রী বা নৌমন্ত্রী দায়িত্বপ্রাপ্ত হন কেন? নগরের উন্নয়নের জন্য নীতি নির্ধারকরা সবচেয়ে ভালো মানুষদের দিয়ে তাদের কাজগুলো করাবেন। যতদিন একাজ করতে না পারবো ততদিন আমাদের এই দুরবস্থা শেষ হবে না।’ 

ফায়ার হাইড্রেন্ট থাকলে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডে পানির সংকটে পড়তে হতো না বলে উল্লেখ করেন এই নগরবিদ। তিনি বলেন, পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের মতো বড় বড় আগুন লাগার ঘটনায় আমরা দেখি, আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ারের সদস্যরা পানির সংকটে পড়েন। কেন আমাদের এই সংকটে পড়তে হবে? ফায়ার হাইড্রেন্ট থাকতে এই সংকটে পড়তে হতো না।’

গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার কেমিক্যাল গোডাউনে লাগা আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ৭১ জন। সেখানে আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে গিযে পানির সংকটে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বিভিন্ন বাড়ির রিজার্ভ ট্যাংকেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায়নি। দূর থেকে পাইপ টেনে পানির ব্যবস্থাপনা করতে হয়েছিল। এছাড়া ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের গাড়িতে করেও পানি এনে আগুন নেভাতে দেখা গেছে।

নগর পরিকল্পনার সময় জননিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুরুত্ব পায় না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তার ভাষ্য, ‘আমাদের দেশে অধিকাংশ এলাকা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা। যেখানে অপরিকল্পিতভাবে নগর গড়ে ওঠে সেখানে ফায়ার হাইড্রেন্টের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো রাখা হয় না বা মানা হয় না। বনানীর মতো জায়গাকে অপরিকল্পিত বলা যাবে না। সেখানেও দেখা গেছে এই ভয়াবহতা।’ 

গত ২৮ মার্চ বনানী এফ আর টাওয়ারে লাগা আগুনে ২৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।  ভবনের ভেতরে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নেভানোর জন্য কোনও ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থাপনা ছিল না। শুধু তাই নয়, একটি বহুতল ভবনে জননিরাপত্তার জন্য যে যে ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন তার কোনোটিই এই ভবনে ছিল না বলে জানিয়েছেন উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। 

পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, ‘সিটি হয়ে গেছে টাকা তৈরি যন্ত্র। যেখানে মানুষ, মানবিকতার জায়গা নেই। সিটিতে যে মানুষগুলো থাকে, তাদের নিরাপত্তা দেওয়াটা জরুরি। একটা মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সিটিতে যতটুকু প্রটেকটিভ মেজারস থাকে তার কোনওটাই সিটির দায়িত্বশীলরা পালন করছেন না। একারণে বারবার দুর্যোগ আসছে। তবে এটাই শেষ না। একটা মানুষের জীবনের মূল্য অনেক। সে জীবন রক্ষা করার জন্য সরকার ও রাষ্ট্রকে অনেক ছাড় দিতে হবে। অনেক কঠোর হতে হবে। কোনও নিয়মই সাধারণ মানুষ এমনিতে মানে না। তাকে মানাতে হয়। সমষ্টিগত ভালোর জন্য রাষ্ট্রকে সে জায়গাটা তৈরি করতে হয়। যেন তেন ভাবে করতে পারবেন না। এভাবে করতে হবে। নিয়ম মেনে করতে হবে। এই না বলার চর্চাটা কঠোরভাবে রাষ্ট্রকে করতে হবে।’ 

তবে এতো আলোচনা সমালোচনা পর যে প্রতিষ্ঠান ‘ফায়ার হাইড্রেন্ট বা স্ট্রিট হাইড্রেন্ট’ বসাবে তারা বলছেন, বিগত সময়ে নগর অপরিকল্পিতভাবে হয়েছে। ভবিষ্যতে যেসব স্থানে ডেভেলপমেন্ট হবে সেসব স্থানে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা রাখা হবে। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিন এ খান নগর পরিকল্পনায় ফায়ার হাইড্রেন্টের মতো ব্যবস্থা না থাকা দুঃখজনক উল্লেখ করে বলেন, ‘আরবান প্ল্যানিংয়ে শহরে ফায়ার হাইড্রেন্ট থাকতে হয়। এটা প্ল্যানিংয়ের একটা পূর্ব শর্ত। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে পরিকল্পিতভাবে আরবার প্ল্যানিং হয়নি। যার জন্য এই ফায়ার হাইড্রেন্টের অভাব রয়ে গেছে। তবে আমাদের নতুন যেসব প্রকল্প আসছে, সেগুলোতে ফায়ার হাইড্রেন্ট রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ হবে।’

যেসব এলাকায় ফায়ার হাইড্রেন্ট নেই সেসব এলাকায় করণীয় সম্পর্কে ওয়াসার এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন যেসব এলাকায় করা সম্ভব হয়নি সেখানে ভবন ও বাড়িগুলোতে পর্যাপ্ত ফায়ার ফাইটিং টুলস রাখতে হবে। একই সঙ্গে নিচের যেখানে পানি রাখা হয়, সেখান থেকে ফায়ার সার্ভিস যাতে পানিটা ব্যবহার করতে পারে সেটার সুব্যবস্থা রাখতে হবে। এটা বিল্ডিং কোডের মধ্যেও আছে। সেখানে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা দেখা যায়।’

আরও পড়ুন- হেলিকপ্টার থেকে পানি ফেলে দেওয়ার কারণ

/আরজে/এফএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
জনআস্থা ও জবাবদিহিমূলক সংসদ গঠনে সাংবিধানিক জ্ঞান জরুরি: ডেপুটি স্পিকার
জনআস্থা ও জবাবদিহিমূলক সংসদ গঠনে সাংবিধানিক জ্ঞান জরুরি: ডেপুটি স্পিকার
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী