আইন নেই, অধিকারের কথা বলারও কেউ নেই

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৯:৩৮, এপ্রিল ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪০, এপ্রিল ১২, ২০১৯

সিনিয়র সিটিজেন

সিনিয়র সিটিজেনদের রাষ্ট্রীয়ভাবে যেসব সুবিধা দেওয়ার কথা, সেগুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করতে পারেনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা থাকলেও তাও গঠিত হয়নি। এমনকি তাদের জন্য যে আইন করার কথা ছিল, সেটিও খসড়াতেই আটকে আছে।

২০১৩ সালে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে দেশের প্রবীণদের অধিকার সমুন্নত রাখা এবং তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সার্বিককল্যাণের লক্ষ্যে সরকার ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩’ অনুমোদন করে। এই নীতিমালার আলোকে সুনির্দিষ্ট আইন করার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও গত ছয় বছরেও তা করা হয়নি।

বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ বলছে, দেশে ষাটোর্ধ প্রবীণদের সংখ্যা এককোটি ৩০ লাখ এবং ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা তিনগুণ ছাড়িয়ে যাবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য— আইন  না হলেও আমরা প্রবীণদের উন্নয়নে যা যা প্রয়োজন করে যাচ্ছি।

প্রবীণদের অনেকে বলছেন, বয়স্কদের অসহায়ত্ব কিংবা দুর্বলতাকে বড় করে না দেখে, তাদের যোগ্যতা ও মেধাকে কাজে লাগাতে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এছাড়াও সরকার বয়স্কভাতা থেকে শুরু করে নাগরিক যে অধিকারগুলোতে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য কিছু বাড়তি সুবিধা দিতে চায়, সেগুলোও থাকতে হবে। কারণ, সবার সক্ষমতা সমান নাও হতে পারে।

এদিকে, ভরণপোষণ আইনানুযায়ী, প্রত্যেক সন্তানকে তার মা-বাবার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। কেউ যদি তা করতে ব্যর্থ হন, তাহলে অনূর্ধ্ব একলাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উক্ত অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

রেজাউর রহমান একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেন— তিনি বেসরকারি কোনও প্রতিষ্ঠানে কাজে ঢুকবেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে ব্যাংকের চাকরিতে ঢুকেছে। ভরণপোষণ আইনানুযায়ী সে যদি আমাকে দেখেও রাখে, সেটা কি আসলেই আমার অধিকার নিশ্চিত করে? আমি এখনও শারীরিক ও মানসিকভাবে কাজ করতে সক্ষম। অথচ আমাকে অন্য সুযোগগুলো তৈরি করে না দেওয়ায়, আমি সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছি। প্রক্রিয়াটিই বদলানো দরকার। আর বয়স্কদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আইন করা দরকার। আমাদের জন্য দাবি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানোরও কেউ নেই।’

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রবীণদেরকে সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে সম্মান দেওয়ার পাশাপাশি যানবাহনে যাতায়াতে, স্বাস্থ্যসেবায়, ব্যাংকের লেনদেন কার্যক্রমে বিশেষভাবে সহযোগিতা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে বয়স্কদের কাজের সুযোগ সীমিত হয়ে আসায় অনেকে আর্থিক অনটনে ভুগছেন। আবার অনেকে ভুগছেন নিঃসঙ্গতায়। সহায়তা করার মতো লোক না থাকায়, বা থাকলেও সহায়তা না দেওয়ায় কারও কারও ক্ষেত্রে চলাফেরা করাও কঠিন। বাংলাদেশে মা-বাবাদের দেখভালের জন্য ভরণপোষণের আইন করলেও তা দিয়ে অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব না।

নীতিমালা অনুসারে, প্রবীণদের বিশেষ যে সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল— তার মধ্যে আছে চিকিৎসা সেবা, ভ্রমণের সময় গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়া এবং যানবাহনে কোটায় সিট (আসন) সুবিধা। এর পাশাপাশি শিক্ষিত, দক্ষ এবং অভিজ্ঞ সিনিয়র সিটিজেনদের কাছ থেকে দেশের শিক্ষা,স্বাস্থ্য,অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারিভাবে পরামর্শ নেওয়ার বিনিময়ে বিশেষ ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা অন্যতম।

‘প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আইন ২০১৬’- এর খসড়া কোন পর্যায়ে রয়েছে, জানতে চাইলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট, কার্যক্রম ও মূল্যায়ন) ড. মো. নাসির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই আইনের খসড়া নিয়ে এখন কোনও কাজ হচ্ছে না। আমরা প্রবীণদের উন্নয়নে যা প্রয়োজন করে যাচ্ছি।’

মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপসচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘২০১৩ সালের ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা’র আলোকেই কাজ চলছে। সে কারণে আইনের খুব একটা প্রয়োজন দেখা দেয়নি। মনে হয় সেজন্যই খসড়টি আর চূড়ান্ত হয়নি। ২০১৭ সালে আইনটির খসড়া নিয়ে আলোচনা শোনা গেলেও মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্মকর্তা পর্যায়ে রদবদলের পর এই আইন নিয়ে আর কোনও আলোচনা নেই। অধিদফতরও এ নিয়ে কোনও চূড়ান্ত খসড়া দেয়নি।’

সমাজসেবা অধিদফতরের উপপরিচালক (প্রতিষ্ঠান-১) হরিশ চন্দ্র বিশ্বাসের কাছে প্রবীণ ফাউন্ডেশন আইনের খসড়ার বিষয়টি জানতে চাইলে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এই বিষয়টি দেখেন। তার কাছে জানতে পারবেন।এ বিষয়টি নিয়ে ময়মনসিংহের উপপরিচালক রবিক আহমেদ ভালো বলতে পারবেন। আগে আইন ও নীতিমালা নিয়ে যত কাজ হয়েছিল উনারা করেছিলেন।’

সমাজসেবা অধিদফতরের ময়মনসিংহের উপপরিচালক রকিব আহমেদের কাছে এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

প্রবীণদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে বর্তমানে কোন নির্দেশনায় কাজ চলছে প্রশ্নে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (আইন ও সংস্থা) এ. জে. এম. এরশাদ আহসান হাবিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে যেসব আইন ও নীতিমালা হচ্ছে, তার মধ্যে  প্রবিশন আইন বাংলায় করার খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে।যেকোনও সময় এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। এছাড়া, পিতা-মাতার ভরণপোষণ নীতি নিয়ে কাজ চলছে।’ প্রবীণ ফাউন্ডেশন আইনের কোনও খসড়া অধিদফতর থেকে পাঠানো হয়নি। এ নিয়ে শাখায় কোনও কাজ হচ্ছে না বলেও তিনি জানান।

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ