সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতদূর?

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ২২:০৪, এপ্রিল ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৪, এপ্রিল ১৪, ২০১৯





শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলন (ফাইল ছবি)সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য সময় বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত তা তদারকি করতে বলা হয়েছিল। তবে আট মাস পেরিয়ে গেলেও এর বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে সড়কেও ফেরেনি শৃঙ্খলা।
গত বছরের ২৯ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আব্দুল করিম সজীব নিহত হওয়ার জেরে রাস্তায় নামে সারাদেশের শিক্ষার্থীরা। তাদের এই ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের জেরে গত ১৬ আগস্ট ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পাঁচটি মৌলিক বিষয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বিআরটিএ, বিআরটিসি, পুলিশ, ডিএনসিসি ও ডিএসসিসিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে পরিবহন ব্যবস্থাপনায় রয়েছে চারটি। যেমন, শহরে চলাচলের সময় গণপরিবহনের দরজা বন্ধ রাখতে হবে। নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠা-নামা করানো যাবে না ইত্যাদি। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ওই বছরের ২০ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কথা ছিল বিআরটিএ ও পুলিশ এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে।
এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে সড়কে সিগন্যাল বাতি, বাস স্টপেজ ও আন্ডারপাস ব্যবহার উপযোগী করার দায়িত্ব ছিল দুই সিটি করপোরেশনের। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলছে, তারা তালিকা করে প্রতিটি সড়কেই মার্কিং করেছে। আর উত্তর সিটি জরিপ করে ৯৪টি বাস স্টপেজ স্থাপনের জন্য তালিকা প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে ১৭টি স্থান সড়ক ও জনপদ অধিদফতরের আওতাধীন সড়কে রয়েছে। এগুলোতে কোনও স্টপেজ নির্মাণ করা হয়নি। বাকিগুলোর মধ্যে ৪০টি এখনও নির্মাণ করা হয়নি। আর ৩৭টির নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে একটা কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। আমি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসেছি। আমি বলেছি সড়ক শৃঙ্খলার জন্য যত ধরনের উদ্যোগ রয়েছে সবগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।’
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়ে সব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার জন্য মালিকদের নির্দেশ দিয়েছি। যারা এই নির্দেশনা মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে অনেকবার ভিজিল্যান্স টিমের মাধ্যমে অভিযান করেছি। কিন্তু এখনও অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সে কারণে সব নির্দেশনা পুরোপুরিভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছে না।’
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সড়ক ব্যবস্থাপনায়ও ৯টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেমন, ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাসের উভয় দিকের ১০০ মিটারের মধ্যে রাস্তা পারাপার বন্ধ করা ইত্যাদি। দুই সিটি করপোরেশন ও ডিএমপিকে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল।
এ ছাড়া স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগনাল ব্যবস্থাপনা পুলিশকে হস্তান্তর করে রিমোট কন্ট্রোল অটোমেটিক বৈদ্যুতিক সিগনালিং চালু ও সিটি করপোরেশনকে রোড ডিভাইডারের উচ্চতা বৃদ্ধি করতে বলা হয়। ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনাবিদ ও কেইস প্রকল্পের পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ৯০ ভাগ সিগন্যাল বাতি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি। তারা পরীক্ষামূলক দেখছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটির আওতায় ৪০টি ও উত্তর সিটিতে ২৫টি বাতি রয়েছে। আরও অনেক বাতি মেট্রোরেল নির্মাণের কারণে খুলে ফেলা হয়েছে। পুরান ঢাকার দিকে কয়েকটি বাতি বাকি রয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে সবগুলো হস্তান্তর করা হবে।’
ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও লাইসেন্স বিষয়ে চারটি সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে অবৈধ পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ফিটনেস সনদ দেওয়ার আগে পরিবহন দেখানোর ব্যবস্থা নেওয়া ইত্যাদি। একাধিকবার চেষ্টা করেও এ বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মশিউর রহমানের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি নগরীর বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতোই সড়কে রয়েছে বিশৃঙ্খলা। যত্রতত্র ওঠা-নামা করছে বাসগুলো। ভেতরে চালক ও হেলপারদের জীবন বৃত্তান্ত লাগানো নেই। দরজাও খোলা রাখা হচ্ছে। যেখানে-সেখানে দিয়ে হচ্ছে রাস্তা পারাপার। অনেক স্থানে জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপরেই বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এখনও গাড়ি চলছে পুলিশের হাতের ইশারায়। তবে মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট ব্যবহার অনেকটাই বেড়েছে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মীর রেজাউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ট্রাফিক আইন পালনে চালক ও পথচারী সবাইকেই সচেতন হয়ে আইন মানতে হবে। কাউকে বেঁধে রেখে আইন মানানো যাবে না।’ পরিস্থিতি দিনদিন ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘তবে আগের থেকে এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমরাও চেষ্টা করছি, পরিবহন মালিকরাও চেষ্টা করছেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন সামনে থাকি তখন সবাই একেবারেই সোজা হয়ে যায়। আড়াল হলেই আবার আগের মতো। এ জন্যই বলি নিজ থেকে আইন পালনে সচেতন হতে হবে। আমরাও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে অনেকেই সচেতন হচ্ছেন। গুলশানে সিগন্যাল দেখে মানুষ ট্রাফিক মোড় অতিক্রম করছে। আমরা আশা করছি সবাই আরও সচেতন হবেন।’ শুধু মামলা দিয়ে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

/এইচআই/

লাইভ

টপ