শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতা: দ্বিতীয় পর্ব দারুল ইহসানের সনদে এমপিও পেয়েছেন সিইসি’র ভাই

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ১১:০৮, এপ্রিল ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৮, এপ্রিল ১৭, ২০১৯

দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়

দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ আইনসঙ্গত উল্লেখ করে আইন মন্ত্রণালয় মতামত দিলেও গত পাঁচ মাসে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর এই সিদ্ধান্তের জালে আটকে আছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তিন হাজার শিক্ষক। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গোপন আদেশে এমপিওভুক্ত হচ্ছেন অনেক শিক্ষক। যারা তদবিরের জোরে এমপিও পেয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) ভাই প্রধান শিক্ষক কেএম নাসির উদ্দিন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি বন্ধ থাকলেও পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নওমালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিইসির ছোট ভাই কেএম নাসির উদ্দিন ২০১৮ সালে এমপিওভুক্ত হয়েছেন। এমপিওভুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে নওমালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কেএম নাসির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলাম। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২০১৮ সালে এমপিওভুক্ত হয়েছি।’

শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাই নয়, যাদের তদবিরের জোর রয়েছে তারাও পেয়েছেন এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার)। আগের শিক্ষামন্ত্রীর সময় সিলেটের আরও দুইজন শিক্ষককে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই এমপিওভুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর গত দুই বছরে বেশকিছু শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করেছে।

এমপিওভুক্তিতে এই দ্বিমুখী নীতির বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘উচ্চ আদালতের রায়টিকেই নানাভাবে ব্যাখ্যা করবার একটি সুযোগ রয়েছে বলে প্রতীয়মান। সেটা (সিদ্ধান্ত) প্রতিষ্ঠানের ওপর দিয়ে দেওয়া হয়েছে এমনটা মনে হয়। সে কারণে কোনও প্রতিষ্ঠান এটি গ্রহণ করছে, কোনও প্রতিষ্ঠান করছে না। আইন মন্ত্রণালয় ওই রায়ের আলোকে প্রায় সেরকমই মতামত দিয়েছে।’ সে কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।

এমপিওভুক্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফরের (মাউশি) পরিচালক অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান বলেন, ‘কোনও শিক্ষক এমপিওভুক্ত হতে চাইলে থানা শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করেন। এই আবেদন জেলা শিক্ষা অফিস হয়ে যায় উপপরিচালকের দফতরে। তারা (থানা শিক্ষা অফিসার, জেলা শিক্ষা অফিসার ও উপপরিচালক) এমপিওভুক্তির সুপারিশ করেন। এমপিওভুক্তি এখন বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। কোনও অভিযোগ পেলে তখন সেটা নিয়ে আমরা কাজ করি।’

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক সফিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি যোগ দেওয়ার পর এ ধরনের সমস্যা পাইনি। তবে কেউ যখন একটা অর্ডার পেয়ে যায় তখন আমরা হঠাৎ করে সেটা বন্ধ করতে পারি না। অভিযোগ পেলে সেটা দেখি।’

ভুক্তভোগী শিক্ষকরা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ‘সিইসির ভাই, মন্ত্রীর কাছের লোক বলে এমপিওভুক্ত হবেন আর আমরা বছরের পর বছর কষ্ট করবো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। একই মন্ত্রণালয়ের এমন দুই নীতি থাকলে শিক্ষকরা নিবেদিত থাকবেন কীভাবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এমপিওভুক্তি বন্ধ রাখা হলেও যেসব শিক্ষক-কর্মচারী তদবির করে এমপিওভুক্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে আরও রয়েছেন রাজধানীর তেজগাঁওয়ের মদিনাতুল উলুম মডেল ইনস্টিটিউশন বালক কামিল মাদ্রাসার ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক মনোয়ার খোকন। তার এমপিওভুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘প্রথমে সমস্যা হয়েছিল তবে স্থানীয় মন্ত্রীর সুপারিশে এমপিওভুক্ত হয়েছেন ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক।’

আগের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও ভোগান্তিতে

দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী যারা আদালতের আদেশের আগেই এমপিওভুক্ত হয়েছেন তারাও বঞ্চিত হচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জের হোসেনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমি আগেই ২০১৩ সালে এমপিওভুক্ত হয়েছি। কিন্তু দারুল ইহসানের সনদের কারণে উচ্চতর স্কেলে যাওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত না নিলে আমরা কখনও উচ্চতর স্কেল পাব না।’

শর্ত সাপেক্ষে এমপিও

দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী দেশের বিভিন্ন বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারিকদের শর্ত সাপেক্ষে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মালবদিয়া গার্লস হাই স্কুলের গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের সনদ নিয়ে সহকারী লাইব্রেরিয়ান রেজাউল এমপিওভুক্ত হয়েছেন ২০১৭ সালে। রেজাউল হক বলেন, ‘শর্ত সাপেক্ষে আমাদের এমপিও হয়েছে। পরে শর্ত অনুযায়ী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কোর্স করেছি।’ নতুনভাবে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের সনদ প্রয়োজন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘না কিছুই করতে হয়নি।’

সরকারি শিক্ষকসহ অন্য চাকরিজীবীরাও ভোগান্তিতে

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ হাজারও কর্মকর্তা-কর্মচারী উচ্চতর স্কেল পাচ্ছেন না একই সমস্যায়। তাদের বক্তব্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় দ্বিমুখী আচরণ না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ হাজার হাজার কর্মচারীও উচ্চতর স্কেল পেতেন। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার কাটালদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তাসরিফ আহমেদ বলেন, ‘পরীক্ষা দিয়ে পাস করে নিজ যোগ্যতায় চাকরি নিয়েছি। এখন দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের কারণে উচ্চতর স্কেল পাব না। শুধু আমি নই, আমার মতো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক একইভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে আটকে না রাখলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংস্থাগুলোতে চাকরি করা হাজারও মানুষ উচ্চতর স্কেল পাবেন, পদোন্নতি পাবেন।’

আরও পড়ুন:
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতা- প্রথম পর্ব: সরকারের নিয়োগ করা শিক্ষকের বেতন মাসে দুই হাজার টাকা!

 

/ওআর/এমএমজে/

লাইভ

টপ