এমপিওভুক্তিতে দ্বিমুখী নীতি

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ১০:১১, এপ্রিল ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৩, এপ্রিল ১৮, ২০১৯

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতা

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের (দারুল ইহসান) সনদে কেউ নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন, আবার কেউ পাচ্ছেন না। শুধু তাই নয়, নতুন করে অনেকেই বেতনভুক্ত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তিন হাজার শিক্ষক রয়েছেন এমপিও বঞ্চিত। মন্ত্রণালয়ের অধীন মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর আদালতের নির্দেশে কর্তৃপক্ষের নিয়োগের বৈধতা দেখে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) প্রায় তিন হাজার শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করছে না। তবে যাদের তদবিরের জোর আছে তাদের গোপনে এমপিও দিচ্ছে মাউশি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা) প্রায় তিন হাজার শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল হাইকোর্টের রায়ে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে দেওয়ার পর এই অবস্থা চলছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘দারুল ইহসানের সনদের বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতের একটি রায় আছে। এই রায়টিকেই নানাভাবে ব্যাখ্যা করার একটি সুযোগ রয়ে গেছে বলে প্রতীয়মান হয়। সেটা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর দিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন মনে হয়। সে কারণে কোনও প্রতিষ্ঠান এটি গ্রহণ করছে, কোনও প্রতিষ্ঠান করছে না। এই জায়গাটিতে আইন মন্ত্রণালয়েরও একটি মতামত চেয়েছিলাম। আইন মন্ত্রণালয় ওই রায়ের আলোকে প্রায় সেরকমই মতামত দিয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে। এটা যে কী করে সমাধান হবে, সে বিষয়ে কোর্টের কাছে আরও ক্ল্যারিফিকেশন (স্পষ্ট নির্দেশনা) চাইতে পারি।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১৩টি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই নামে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি না দেওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেন আদালত। তবে দারুল ইহসানের সনদ বাতিল করেননি আদালত। সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে রায়ে বলা হয়— ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিলের আগের সনদধারীদের সনদের গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করবে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। উল্লেখ্য, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ আগে ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি। বর্তমানে নিয়োগকারী হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান— বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)।

সনদধারীদের এমপিও নিয়ে জটিলতা

২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর আদালতের রায় প্রকাশের পর এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দারুল ইহসান থেকে অর্জিত সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন করে এমপিওভুক্তিতে জটিলতা তৈরি হয়। আদালতের রায়ের আলোকে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সনদের বৈধতা যাচাই করে নিয়োগ দিলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনভাতা দেবে কিনা, সে বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এতে নতুন আবেদনকারীদের এমপিওভুক্তি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেশব্যাপী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় তিন হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওভুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

মাউশির উদ্যোগ

উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে জটিলতা নিরসনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর গত বছরের ১২ অক্টোবর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে রায়ের আগে অর্জিত সনদধারীদের গ্রহণযোগ্যতা দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগকে চিঠি দেয়। এতে বলা হয়, হাইকোর্টের রায়ের আগে ইনডেক্সধারী হওয়ায় তাদের এমপিওভুক্তি ও বিএড সনদধারীদের সনদের গ্রহণযোগ্যতা দিতে জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সনদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার ঘোষিত হওয়ায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত সনদধারী (আদালতের রায়ের আগে) এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কর্মস্থল পরিবর্তন ও উচ্চপদে এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতা

মাউশির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মতামত নিয়ে ২০১৮ মালের ২৮ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে সনদের গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে মত দিয়ে বেসরকারি শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির আদেশ দেওয়া হয়। এমপিওভুক্তির আদেশে বলা হয়েছিল— সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মোতাবেক দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত সনদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে স্ব-স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি অথবা ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। ওই সনদের ভিত্তিতে এরইমধ্যে বিধি মোতাবেক নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্ত সংক্রান্ত সব কার্যক্রম গ্রহণ করবে শিক্ষা অধিদফতর। কিন্তু পরদিন ২৯ আগস্ট আবার ওই আদেশ স্থগিত করা হয়। আদেশ স্থগিত হওয়ার বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত না নিয়ে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের পর স্থগিত আদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত

গত বছরের ১ নভেম্বর আইন মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের পক্ষে মত দেয়। এতে বলা হয়, ‘যেহেতু হাইকোর্ট সনদ অবৈধ ঘোষণা করেননি, যেহেতু সনদ গ্রহণ করা বা না করা যথাযথ কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাধীন। কিন্তু এই মতামতের পর পাঁচ মাস পার হয়ে গেলেও দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

আরও পড়ুন:

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতা- প্রথম পর্ব: সরকারের নিয়োগ করা শিক্ষকের বেতন মাসে দুই হাজার টাকা! 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতা-দ্বিতীয় পর্ব: দারুল ইহসানের সনদে এমপিও পেয়েছেন সিইসি’র ভাই

 




 

 

/ওআর/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ