আইনের অভাবে থেমে গেছে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের উদ্যোগ

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১২:০১, মে ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৫, মে ১৯, ২০১৯

আইন মন্ত্রণালয়

মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। বর্তমান আইনে তা করা সম্ভব না হলে প্রয়োজনে আইন পরিবর্তনের উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছিল। এ লক্ষ্যে আইনগত বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কাজও শুরু করেছিল। মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল, এটি জনগণের দাবি যা বাস্তবায়নে সরকারের ওপর মহলের নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাস্তবিক অর্থে এ উদ্যোগ থেমে গেছে।
কেন এ উদ্যোগ থেমে গেলো- জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ওপর মহল এটি দেখভাল করছে। অপরদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, বিষয়টি গভর্নর নিজে দেখছেন।
এদিকে জানা গেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে নতুন আইন করছে সরকার। এরই মধ্যে আইনের খসড়া প্রস্তুত করেছে আইন মন্ত্রণালয়। শিগগিরই এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদনের পর যাচাই-বাছাই শেষে আইনটি পাসের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে।
তবে এ-সংক্রান্ত আইন পাসের আগেই বহু দণ্ডিত ও অভিযুক্ত মানবতাবিরোধী অপরাধী তাদের সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর করে দিয়েছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইনে দণ্ডিত বা অভিযুক্ত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি ক্রোক ও বাজেয়াপ্ত করার বিধান নেই। তবে কারান্তরীণ বা পলাতক মানবতাবিরোধী অপরাধীরা যাতে সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে না পারে সে উদ্যোগ নিয়েছে আইসিটির তদন্ত সংস্থা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন সময় সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও সরকারদলীয় নেতারা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়েই এ দাবি জোরালো হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এ বিষয়টি নিয়ে কেউ আর তেমন কিছু বলেন না। এদিকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জামায়াত-শিবির সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার কাজ শুরু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। এ কমিটিতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, দফতরসহ সব গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের কাছ থেকেও সহায়তা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ওই কমিটির সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেছিলেন।
এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার লক্ষ্যে এসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছিল সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। চিঠির সঙ্গে এ সম্পর্কিত ৫৬১টি প্রতিষ্ঠানের তালিকাও দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, কর্মকাণ্ড ও সংশ্লিষ্টদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছিল। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে সব শাখায় নজরদারিও শুরু হয়েছিল। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশেষভাবে নজরদারিতে ছিল এ সংক্রান্ত কার্যক্রম। বিষয়টিতে গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছিলো এবং সেই সময়ের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান নিজে বিষয়টি মনিটর করেন বলে জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব ইউনুসুর রহমান বলেন ‘আমার জানা মতে এ উদ্যোগের বিষয়ে আমার বিভাগ কিছু করেছে বলে জানি না। এ বিষয়ে কবে কী করা হয়েছে তাও জানি না। আমি এ বিভাগে যোগদানের পর কোনও উদ্যোগ বা নির্দেশ পাইনি।’
বিদ্যমান আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব কিনা বা এজন্য নতুন কোনও আইন করার কথা আইন মন্ত্রণালয় ভাবছে কিনা জানতে চাইলে আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু সালেহ শেখ মোহম্মদ জহিরুল হক বলেন, ‘এটি স্পর্শকাতর বিষয়। কিছু বলা যাবে না।’
এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকার যখন যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা বাস্তবায়ন করে। এ উদ্যোগও বাস্তবায়ন হবে। কাজ চলছে। এর বেশি কিছু বলা যাবে না।’
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দুই শীর্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধী সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের কয়েক ঘণ্টা পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে। ওই চিঠিতে ব্যাংক-বীমাসহ যেসব সেবামূলক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জামায়াত ও শিবিরের কর্তৃত্ব রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এক্ষেত্রে চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কারও বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল, ক্লিনিক, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কোচিং সেন্টার, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, মাল্টি পারপাস সমিতির ৫৬১টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা পাঠানো হয় র‌্যাব-পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে আগে থেকেই নজরদারিতে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র বলেছে, এ কাজের সঙ্গে দেশের চারটি গোয়েন্দা সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার ছয় সদস্যের টিম বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকও করেছিল।
সরকার মনে করে, ওইসব প্রতিষ্ঠান একদিকে যেমন জামায়াত ও শিবিরকে অর্থ সহায়তা দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করছে তেমনি সংশি¬ষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জামায়াত-শিবির সমর্থক বা কর্মীদের একটি বড় অংশ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কাজে সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি এসব কর্মকর্তা জঙ্গি অর্থায়নসহ সরকারবিরোধী বা দেশকে অস্থিতিশীল করতে পারে এমন কর্মকাণ্ডে পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে বলেও মনে করছে সরকার। এক্ষেত্রে জামায়াত-শিবির সংশি¬ষ্ট পরিচালক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম, ঠিকানা ও তাদের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য অনুসন্ধান করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল।
এছাড়া ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে জামায়াতের মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশেষ নজরদারি করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই নির্দেশে বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণকারী অন্য সরকারি সংস্থাগুলোকেও নজরদারি বাড়াতে বলা হয়। সে সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় জামায়াতে ইসলামীর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন সরকারের উদ্বেগের কারণ। তাই সংগঠনটির মালিকানাধীন ব্যাংক এবং লাভজনক সব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন ও আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতার ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারি নিশ্চিত করা দরকার। এরপর আবারও জামায়াত নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে ওই চিঠি পাঠানো হয়।
এ প্রসঙ্গে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘একাত্তরে শহীদদের পরিবারগুলো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিকে হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে, অসহায়ভাবে জীবনযাপন করছে। ঘাতকদের পৃষ্ঠপোষকতাকারীরা শহীদ পরিবারকে অপমান করেছে। তাই এখন সরকারের উচিত শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে তাদের ক্ষতিপূরণ ও সম্মান দেওয়া।’
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সার্ক চলচ্চিত্র সাংবাদিক ফোরাম আয়োজিত ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে হলেও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে।

আরও পড়ুন: যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত আইনের খসড়া তৈরি হচ্ছে: আইনমন্ত্রী

                বঙ্গবন্ধুর খুনি ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে

              মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হবে, বিতর্ক আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে

 

 

/ওআর/এমএমজে/

লাইভ

টপ