আস্থা পেতেই ইতালি পৌঁছানোর পর টাকা নেয় দালালরা

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন ও রাফসান জানি
প্রকাশিত : ০৯:৫৯, মে ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪১, মে ২৫, ২০১৯

ইতালি নেওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিঅবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে ইতালি নিয়ে যাওয়ার জন্য নানা প্রলোভন দেখায় দালাল চক্র। লোকজনের আস্থা অর্জন করতে ইতালি পৌঁছানোর পর টাকা নেওয়ার কথা বলেই বেশির ভাগ লোককে দেশ থেকে পাচার করা হয়। ইতালি যাওয়ার  জন্য ৭-১০ লাখ টাকা নেয় পাচারকারীরা। সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় জীবিত ফেরা ১৫ বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

৯ ও ১০ মে ভূমধ্যসাগরে পরপর দু’টি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। সাগরপথে অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ওই ঘটনায় জীবিত ১৫ বাংলাদেশি ২১ মে দেশে ফিরেছেন। এছাড়া ২৪ মে ভূমধ্যসাগরের লিবিয়া উপকূল থেকে ১৪ বাংলাদেশিসহ ২৯০ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে দেশটির নৌবাহিনী।

দেশে ফেরা বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, ইতালি যাওয়ার জন্য দেশে থাকতে বড় অঙ্কের টাকা দিতে হয়নি তাদের। তাদের সঙ্গে দালালের চুক্তি ছিল লিবিয়া ও ইতালি পৌঁছানোর পর টাকা দেবে। দালালরা ইতালি যাওয়ার জন্য কারও কাছ থেকে ৭ লাখ, কারও কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছেন। লিবিয়া পৌঁছানোর পর দালালের প্রতিনিধিরা দেশে থাকা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে কয়েক ধাপে টাকা নিয়েছেন।

২০১৮ সালের শেষ দিকে দালাল পারভেজের হাত ধরে লিবিয়া যান সিলেটের সোহেল আহমেদ। দালাল পারভেজ নিজেও এক সময় লিবিয়া প্রবাসী ছিলেন। চুক্তি ছিল সাড়ে ৮ লাখ টাকায় ইতালি নেওয়া হবে সোহেলকে। চুক্তি  অনুযায়ী লিবিয়া যাওয়ার পর দুই কিস্তিতে সাড়ে ৮ লাখ টাকা বাংলাদেশে দালাল পারভেজের প্রতিনিধিকে দেয় সোহেলের পরিবার।

এ প্রসঙ্গে সোহেল বলেন, ‘লিবিয়া যাওয়ার পর আমিসহ কয়েকজনকে একটা গুদাম ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয়। ওখানে আমাদের সঙ্গে থাকা ডলার, টাকা, মোবাইল সব নিয়ে যায়। এরপর সেখান থেকে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় পারভেজের কাছে। ইতালি যাওয়ার জন্য বের হওয়ার আগ পর্যন্ত পারভেজের তত্ত্বাবধানে ছিলাম আমরা। লিবিয়া পৌঁছানোর পর আমার পরিবার তিন লাখ টাকা দেয় দালালের লোকজনের কাছে। দুই তিন মাস আগে আমাদের জানানো হয় জাহাজে করে ইতালি নিয়ে যাওয়া হবে। তাই বাকি টাকা পরিশোধ করতে হবে। তখন দেশে আমার পরিবার সাড়ে ৫ লাখ  টাকা পারভেজের লোকজনের কাছে দেয়। আমাদের জাহাজে নেওয়ার কথা বললেও নিয়ে গেছে প্লাস্টিকের নৌকায় করে।’

লিবিয়া থেকে ফিরে আসা ১৫ জনের একজন  হবিগঞ্জের  বানিয়াচংয়ের বাসিন্দা সজীব। তার ভাই সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ভাই নিজেই দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। দালাল দেশে থাকতে কোনও টাকা নেয়নি। লিবিয়া পৌঁছানোর পরপর দালালের লোকজন ৪ লাখ নেয়। সর্বশেষ আরও দুই লাখ টাকা দিয়েছি। ভাই মাঝে মাঝে আমাদের ফোন দিতো দালালের মাধ্যমে। ’

প্রায় একই কথা জানালেন কিশোরগঞ্জ ভৈরবের ইরফান চৌধুরী। তিনিও লিবিয়া পৌঁছানোর পর দেশের পরিবারের মাধ্যমে টাকা দিয়েছেন পাচারকারীদের। তাকে লিবিয়া নিয়ে যায় ভৈরবেরই আরেক লিবিয়া প্রবাসী জাফর।

ইরফানের বাবা হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিন ছেলে চার মেয়ের মধ্যে ইরফান চতুর্থ। সে পড়াশুনা করতো ভৈরব হাজী হাসমত কলেজে। লিবিয়া প্রবাসী জাফরের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার চুক্তি হয়। তখন দালাল বলেছিল,  ইতালি পৌঁছানোর পর টাকা দিলেই হবে। ইরফান লিবিয়া পৌঁছানোর পর দালাল জাফরের লোকজন কয়েক ধাপে আমাদের কাছ থেকে টাকা নেয়। লিবিয়া পৌঁছনোর পরপরই প্রথমে নেয় ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এরপর আরও দুই দফায় টাকা নেয় জাফরের লোকজন। দ্বিতীয় দফায় ১ লাখ ২০ হাজার ও তৃতীয়  দফায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নেয়।’

তিনি আরও জানান, তাদের একটা মুদি দোকান রয়েছে। প্রথমে জমি বিক্রি করে চার লাখ টাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। বাকি টাকা ঋণ নিয়েছেন।

দালাল পারভেজের হাত ধরে সিলেট সদর থানার টুকের বাজার এলাকার  রুবেল আহমেদও ইতালি যায়।  তার ছোট ভাই রাসেল আহমেদ বলেন, ‘গত বছর রোজায়  ঢাকা থেকে লিবিয়া যায় আমার ভাই।  লিবিয়া যাওয়ার পর বাবার কাছ থেকে টাকা নেয় পারভেজের লোকজন। প্রথমে নেয় সাড়ে ৫ লাখ টাকা। তিন মাস আগে ইতালি পাঠানোর জন্য আবার নেয় সাড়ে তিন লাখ টাকা। এছাড়া খাবার দাবারের জন্য নেয় আরও ৫০ হাজার টাকা। ওরা বলছিল, মাছ ধরার বড় জাহাজে করে আমার ভাইকে ইতালি নিয়ে যাবে। কিন্তু তারা করেনি। উল্টো বিভিন্ন সময় নির্যাতন করেছে। শেষে ইতালি পাঠানোর নামে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল।’

একবছর আগে লিবিয়া গিয়েছিলেন সিলেটের সাইদুল ইসলাম। লিবিয়া পৌঁছানোর পর তার পরিবার টাকা দেয় দালালের প্রতিনিধিকে।সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘লিবিয়া যাওয়ার পর বাংলাদেশে আমার পরিবার সাড়ে চার লাখ টাকা দেয় দালালের প্রতিনিধিরা। এরপর লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার জন্য আবার তিন লাখ টাকা দেয় আমার পরিবার।’

এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আস্থা অর্জন করতে দালাল চক্র নানা কৌশল নিয়ে থাকে। আগে টাকা না নেওয়াটাও তাদের একটি কৌশল। দেশে থাকতে টাকা দিতে হবে না, টাকার অঙ্কও বেশি না হওয়ায় অনেকেই আগ্রহী হয়ে ওঠে। ইতালিতে আয় করা অনেজ সহজ-এমন অনেক গল্পও শোনায় পাচারকারীরা, যা সঠিক নয়।’

তিনি বলেন, এসব ঘটনায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করছে, সেদেশের মানুষ কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতালি যাবে, সে প্রশ্নও উঠছে। সরকারকে দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

/এসটি/

লাইভ

টপ