শ্রমিক শিশুর পুনর্বাসন যেভাবে সম্ভব

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১০:৫৯, জুন ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৩৩, জুন ১৩, ২০১৯

ইট ভাটায় কাজ করছে শিশুরা

রমজান, বয়স ১২ বছর। পরিবারের হাল ধরতে প্রাইমারি শেষ হওয়ার আগেই স্কুল ছাড়তে হয় তাকে। এখন সে ফার্মগেট-পাইকপাড়া ৬০ ফিট রুটে লেগুনায় সাহায্যকারী (হেলপার) হিসেবে কাজ করে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাকে। একই লাইনে রমজানের সমবয়সী আরও ৫০ শিশু কাজ করে। এরা সবাই মাস শেষে বেতন পায় ৫-৭ হাজার টাকা। কেউ কেউ টিপসসহ ১০ হাজারও পায়। রমজানের পরিবারে ব্যয়ের বেশিরভাগ অংশ আসে তার রোজগার থেকে। এই কাজে ঝুঁকি আছে জানিয়ে তাকে কাজ ছাড়তে বললে সে পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘আমার পরিবার কীভাবে চলবে তাহলে?’

এমন বাস্তবতায় পুনর্বাসন ছাড়া শিশুশ্রম নিরসন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন শিশুদের নিয়ে কর্মরত দেশি-বিদেশি নানা সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা। বাংলাদেশও জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন (এসডিজির) লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে পূরণ করতে চায়। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন শিশু অধিকার নিয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা।

শিশু শ্রমিকদের পুনর্বাসনসহ শ্রম নিরসন নিয়ে নানা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছোট পরিসরে কাজ করছে। তবে এ সংক্রান্ত সরকারি উদ্যোগে নেওয়া ২৮৪ কোটি টাকার প্রকল্প দেড় বছরেও শুরুই হয়নি। টাকা বরাদ্দ আছে, প্রকল্প অফিস আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হবে যে এনজিওগুলোর মাধ্যমে, সেগুলোকেই এখনও নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রকল্প পরিচালক বলছেন, এ বছরই কাজ শুরু সম্ভব হবে।

গ্যারেজে কাজ করছে শিশু

পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮টি খাতে ১৬ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯৪ শিশু কাজ করে। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯০ জন মেয়ে শিশু। শিশুশ্রমে নিয়োজিতদের ৫৭ শতাংশের কাজই অস্থায়ী। গবেষণা মতে, শিশুশ্রম বেশি কৃষি ও কল-কারখানায়। সেখানে ১০ লাখের বেশি শিশু কাজ করে। এছাড়া দোকানপাটে ১ লাখ ৭৯ হাজার শিশু, নির্মাণ শিল্পে ১ লাখ ১৭ হাজার শিশু কাজ করে। বর্তমানে শিশুশ্রমে নিয়োজিত আছে এমন ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু একসময় স্কুলে গেলেও এখন আর যায় না। আর ১ লাখ ৪২ হাজার শিশু কখনোই স্কুলে যায়নি।

২০১৮ সালে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে জড়িত শিশুদের জন্য ২৮৪ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রয়োজনে এসব শিশুর অভিভাবককে ঋণ দেওয়া হবে বা জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছিলেন তৎকালীন শ্রমমন্ত্রী মুজিবুল হক। কিন্তু এরপরে কাজটি খুব একটা এগোয়নি।

এ বিষয়ে সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড রাইটস গভর্নেন্স অ্যান্ড চাইল্ড প্রোটেকশন সেক্টরের পরিচালক আবদুল্লা আল মামুন বলেন, ‘৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে গাড়ির হেলপারি করা সবচেয়ে ঝুঁকির কাজ হলেও এতে টাকা বেশি। তাকে যখন পুনর্বাসনের কথা ভাবা হবে, তখন তার পরিবারের জন্য আর্থিক প্রণোদনা অবশ্যই ব্যবস্থা করতে হবে। আবার যেখানে আয় কম, সেখানে পুনর্বাসনের ভিন্ন কৌশল হাতে নিতে হবে। কোনও একক পদ্ধতিতে সব ধরনের শিশুর পুনর্বাসন করা সম্ভব না।’

তিনি বলেন, ‘অনেক শিশুকে গ্যারেজ, রেস্টুরেন্ট জাতীয় জায়গায় কেবল সারাদিন সুরক্ষিত থাকবে ভেবে বাবা-মায়েরা কাজে দেন। এজন্য তারা কোনও টাকাও নেন না। কর্মজীবী বাবা-মা তার শিশুটিকে একটি জায়গায় রেখে যেতে চান মাত্র। এসব ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে ভাবতে হবে।’

টুপি তৈরির কারখানায় কাজ করছে শিশু

তিনি আরও বলেন, ‘আর্থসামাজিক পুনর্বাসনের কথা যেমন চিন্তা করতে হবে, তেমনি আর একটি শিশুও যেন আজ থেকে কাজে নতুন করে যুক্ত না হয়, সে বিষয়েও বিস্তারিত কাজ করার আছে। গ্রামাঞ্চল থেকে যে যে কারণে শিশুরা শহরে চলে আসছে এবং কাজে বাধ্য হচ্ছে, সেই কারণগুলো চিহ্নিত করে গোড়াতেই নির্মূল করার উদ্যোগও থাকতে হবে।’

তিন বছরের সরকারি প্রকল্প দেড় বছরেও কাজ শুরু করতে না পারার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটিতে এক লাখ শিশুর ব্যবস্থা হওয়ার কথা আছে। এখনও এনজিও নির্বাচন না করতে পারা হতাশাজনক। এর আগেও চার স্তরে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেসময়েও আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো নয়, এটা ভুলে গেলে চলবে না।’

শিশু অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি মনে করেন, এ ধরনের প্রকল্প দিয়ে কাজ হবে না।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রকল্প মানে বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি আর পয়সা। যে কোনোভাবে শিশুদের অধিকারের বিষয়টি মূলধারার পরিকল্পনা অর্থাৎ রাজস্বের ভেতর আনতে হবে। ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের সংখ্যা যেহেতু মোট জনসংখ্যার ৪৭ ভাগ, তাই তাদের অ্যাড্রেস না করে কিছু করা সম্ভব নয়। ফলে ভেবে দেখতে হবে, পুনর্বাসন বলতে তারা যেটা বোঝাচ্ছে, সেটা কি শিশুবান্ধব? আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কিন্তু শিশুবান্ধব নয়।’

শিশুশ্রম

উপকূলের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যে কোনও দুর্যোগে সেখানকার শিশুরা বাবা হারায়, ক্ষতিপূরণ পায় না এবং পরিবারগুলো শিশুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। তাদের জন্য সরকার কী করবে?’

শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের নেওয়া প্রকল্প পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক লাখ শিশুর পুনর্বাসনের কাজ যে এনজিওদের মাধ্যমে করা হবে বলে পরিকল্পনায় আছে সেই এনজিও বাছাইয়ের কাজ শেষ হয়নি। এই মাসে শেষ হবে। এরপর বাকি কাজ শুরু হবে।’

কয় বছরের প্রকল্প এবং কাজ শুরু হবে কবে−জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি ২০১৮-২০২০ সাল পর্যন্ত। এরমধ্যে এনজিও বাছাই হয়ে গেলে বাকি কাজটা এ মাসেই শুরু হবে।’

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন।

/ইউআই/এসটি/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ