বাজেটে কিছু গৎবাঁধা ভালো কথা আছে, কোনও কর্মসূচি নেই: দেবপ্রিয়

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৬:৫০, জুন ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০৯, জুন ১৪, ২০১৯

প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখেন সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যপ্রস্তাবিত বাজেটে কিছু গৎবাঁধা ভালো কথা আছে, কিন্তু কোনও কর্মসূচি নেই বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু কর্মসূচি থাকলেও তা শেষ হবে কবে তার কোনও সময়সীমা দেওয়া হয়নি। বাজেটের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করলে ‘বাতাসের ভেতর আশ্বাসের বাণী’ পাওয়া যায়।”

শুক্রবার (১৪ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০১৯-২০২০ নিয়ে সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

বাজেট বাস্তবায়নে মূল্যনীতি ও ভর্তুকির মধ্যে সামঞ্জস্য আনার আহ্বান জানিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘ভর্তুকির কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের খুচরা মূল্য নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। না হলে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ পড়বে।’

আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে বর্তমান বাজেট সঙ্গতিপূর্ণ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ প্রতিনিয়ত কমছে, ভর্তুকির অনেক অর্থ অব্যবহৃত থাকায় কৃষকের প্রকৃত সুবিধাভোগ হচ্ছে না।’

পর্যালোচনায় শিক্ষা খাতে বাজেট বাস্তবায়নের হার কমায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সিপিডি। নির্বাচনি ইশতেহারের আঙ্গিকে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কম রয়েছে বলেও দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি। একটি বিকাশমান দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করলে টেকসই উন্নয়ন এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘বাজাটে যারা আয় করে খায় তাদের কোনও সুবিধা দেওয়া হয়নি, সুবিধা দেওয়া হয়েছে বিত্তবানদের। প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে ধনীদেরকেই বেশি।’ তিনি দাবি করেন, নতুন ভ্যাট আইনেও জটিলতা রয়েছে। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হবে বলে মনে করি। এ নিয়ে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ তৈরি হবে। গত বছরের তুলনায় এই অর্থবছরে ধান-চাল সংগ্রহে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি বলে কৃষক উপকৃত হবেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি মনে করেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন আসা প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষায়, ১ শতাংশ স্বাস্থ্য ও ২ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ বরাদ্দ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্যে সুখবর নয়।

সিপিডির বিশেষ ফেলো বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’ তিনি উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মধ্যবিত্তদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়নি। যদিও সম্পদের সারচার্জের সীমা বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ যারা আয় করে তাদের জন্য সুবিধা বা প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। কিন্তু যারা সম্পদশালী তাদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কেন দেওয়া হয়েছে, আমাদের কাছে এটি বোধগম্য নয়। এটি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গেও মেলে না।

দেবপ্রিয় বলেন, ‘দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল রয়ে গেছে। এই কর্মসূচির অধীনে পাঁচটি মূল খাত—যোগাযোগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, শিক্ষা ও বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে ৭০ শতাংশ টাকা দেওয়া একটি ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।’

কালো টাকা বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাড়ানো নির্বাচনি ইশতেহারের পরিপন্থী। এ জন্য অঘোষিত আয় এবং বেআইনি আয়ের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করতে হবে।’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই বাজেটে উচ্চ আয়ের মানুষকে সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হলেও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ উপকৃত হবে না। আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন খাত সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া হয়নি। ব্যাংক খাতের সংস্কার দরকার। কিন্তু অর্থমন্ত্রী সুনির্দিষ্টভাবে এ নিয়ে নির্দেশনা দেননি। ব্যাংক থেকে যারা অন্যায্য সুবিধা নিয়েছেন, তারা আসলে পরিবর্তন চান না; তারা স্বচ্ছতা চান না। ব্যাংক খাত থেকে যারা অবৈধ সুবিধা নিয়েছেন, তারা ব্যাংকিং কমিশন হোক চান না। কমিশন হলে ব্যাংক খাতে সচ্ছতা ফিরে আসবে। তথ্য-উপাত্তের সমস্যা আছে, সেগুলো প্রকাশিত হবে, জবাবদিহি বাড়বে। যারা এ খাত থেকে অন্যায্য সুবিধাগুলো নিয়েছেন, তারা এ পরিবর্তনগুলো আনতে দিতে চান না।’

সিপিডির বিশেষ ফেলো বলেন, ‘মানুষের আয় বৈষম্য বাড়ছে। বাজেটে মধ্যবিত্তের উপার্জন ক্ষমতা বিকাশে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বৈষম্য কমানোর প্রতি সরকারের কোনও নজর নেই।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশ এখন এমন পর্যায়ে এসেছে—সামনে দ্বিতীয় প্রজন্মের সংস্কারে যেতে হবে। কিন্তু বাজেটে এটি গুরুত্ব পায়নি।’
খাতওয়ারি বরাদ্দের দিক থেকে বাজেট ভারসাম্যহীন ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বাজেট অপশাসনের সুবিধাভোগীদের পক্ষে গেছে। অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলোকে বাজেটে তুলে ধরা হয়নি এবং সমাধানের কোনও আভাসও নেই। ব্যাংক খাতের সমস্যা নিয়ে বাজেটে আলোচনা আছে, কিন্তু কর্মপরিকল্পনা নেই। ব্যাংকিং খাতের সমস্যাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি টাকায় অবকাঠামো নির্মাণ করে জিডিপি বাড়ানোর চেষ্টা প্রাগৈতিহাসিক ধারণা। এটা অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি করছে।’
দেবপ্রিয় আরও বলেন, ‘বর্তমানে অর্থনৈতিক যে চাপ চলছে, বাজেটে তার কোনও স্বীকৃতি নেই। বাজেট দেওয়ার সময় যে অভিনব কায়দা ছিল, বাজেটের তথ্য উপাত্তে তা পাওয়া যায়নি। দেশের মধ্যবিত্তদের জন্য আমরা কি করতে পারবো; সেটার ওপর নির্ভর করছে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া। বিকাশমান মধ্যবিত্তরাই হলো চালিকা শক্তি। তাদের চিন্তা, চেতনা, উপার্জন, বুদ্ধিমত্তাই হলো চালিকাশক্তি। সেই চালিকাশক্তিকে যদি সেভাবে পরিমাপ না করেন, তাহলে ইশতেহার চেতনা সম্পূর্ণ বিফল হবে। এটি রাজনৈতিক দলের আদর্শ ও ভোটের ভিত্তি পরিপন্থী, আর এটাই দুশ্চিন্তার বিষয়।’

দেবপ্রিয় ভট্টচার্য বলেন, ‘যারা অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগী, এ বাজেট তাদের পক্ষেই গেছে। কারণ পরিবর্তনের যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, অর্থনৈতিক কৌশল সেটা আমরা দেখিনি। কিন্তু এসব বিষয় ইশতেহারে ছিল, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ছিল। সরকার যে টাকা বরাদ্দ করেছেন, সেটা গরিব মানুষের কাছে যায়নি, আর খরচ করলেও সেটা গরিব মানুষের পক্ষে যায়নি।’
ব্রিফিংয়ের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

/জিএম/আইএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ