দুই-তৃতীয়াংশ উপজেলায় আ. লীগ জয়ী, স্বতন্ত্ররাও ক্ষমতাসীন দলের

Send
এমরান হোসাইন শেখ
প্রকাশিত : ২০:৫৩, জুন ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৫, জুন ২০, ২০১৯

উপজেলা-নির্বাচন-২০১৯দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। ৫ ধাপে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি উপজেলায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা চেয়ার‌ম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। ৪৭৩টি উপজেলার মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা ৩২০টিতে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন। এরমধ্যে ১১৫ জনই নির্বাচিত হয়েছেন বিনা ভোটে। চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান—তিনটি পদেই একক প্রার্থী থাকায় ৩৩টি উপজেলায় কোনও ভোটেরই প্রয়োজন হয়নি। নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছেন ১৪৯ জন উপজেলার চেয়ারম্যান। পার্বত্য এলাকার দুই-একটি বাদে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়েছেন।

নির্বাচনি ফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রায় ৩২ শতাংশ উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। অন্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি তিন জন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির (জেপি) একজন উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনে আরও কয়েকটি ছোট দল অংশ নিলেও তাদের কোনও প্রার্থী নির্বাচিত হননি। চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ১১৫ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া ছাড়াও ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে আরও শতাধিক প্রার্থী বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।

এর আগে স্থানীয় সরকার পরিষদের ভোটে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হলেও এবারের উপজেলা নির্বাচনে তা দেখা যায়নি। নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ খুব একটা দেখা যায়নি। কোথাও কোথাও মাইকে ভোটারদের কেন্দ্রে আসার আহ্বান করার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া, এবারের ভোটে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগ এসেছে কোনও কোনও এমপির বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন দল দলীয়ভাবে তদন্তও শুরু করেছে।

এদিকে, প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকারসহ অন্তত দুই ডজন এমপিকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে নোটিশ দিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেছে ইসি। কোনও কোনও এমপির বিরুদ্ধে ইসির চিঠি আমলে না নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ভোটের আগের দিন কয়েকটি উপজেলায় ভোট বন্ধ করে দিয়েছিল ইসি। ইসির তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নেত্রকোনা-৫ আসনের এমপি ওয়ারেসাত হোসেন বেলালের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আরও কয়েকজন এমপির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে ইসি সূত্র জানিয়েছে। এ উপজেলা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও অনিয়ম নিয়ে সরকারি দলের শরিক দলের নেতারাও জাতীয় সংসদে অভিযোগ তুলেছেন।

প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত এবারের উপজেলা নির্বাচনে অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে কম ভোট পড়েছে বলে ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বিগত নির্বাচনে ৬০ থেকে ৭০ ভাগের মতো ভোট পড়লেও এবার উপস্থিতির হার ছিল ৪০ দশমিক ২২ ভাগ। একজন নির্বাচন কমিশনার ভোটারদের নির্বাচনবিমুখতা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত বলে মন্তব্য করেছেন।

সংসদের বৈঠকেও সরকারের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টি ও বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে উপজেলা ভোট নিয়ে। তারা বলছে, নির্বাচনে ভোট দেয়ার ব্যাপারে জনগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। মসজিদের মাইকে ভোটারদের ভোট দিতে আহ্বান জানানোর ঘটনাও ঘটেছে। এরপরও মানুষ ভোটকেন্দ্রের দিকে যাচ্ছে না। এটা নির্বাচনের জন্য কেবল নয়, গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদাসহ নির্বাচন কমিশনাররা বলছেন, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের বর্জনের কারণে ভোটারদের আগ্রহ কম। তাদের দাবি, কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার দায় কমিশনের নয়; রাজনৈতিক দলের। তবে বরাবরের মতোই কমিশনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। বুধবার (১৯ জুন) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘এই নির্বাচন সংবিধানসম্মত হয়েছে কিনা, এ প্রশ্ন থেকে যায়। নির্বাচনবিমুখতা জাতিকে গভীর খাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।’

উপজেলা নির্বাচন প্রসঙ্গে বুধবার সংসদের বৈঠকে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসার জন্য মসজিদের মাইকে ডাকা হচ্ছে। কিন্তু ভোটাররা আসছেন না। পাঁচ দফা উপজেলা নির্বাচনে তার দলের অভিজ্ঞতা, এমনকি আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা করুণ। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বলেও কোনও লাভ হচ্ছে না বরং তাদের যোগসাজশ রয়েছে। ফলে নির্বাচন ও সামগ্রিক নির্বাচনি ব্যবস্থা সম্পর্কে জনমনে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে জনগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।’

এর আগে সম্পূরক বাজেটের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি দলীয় সদস্য হারুন অর রশীদ অভিযোগ করেছেন, ‘স্থানীয় সরকার পরিষদের সবকটি স্তরে অনির্বাচিতরা বসে আছেন। আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা সব পদ দখল করে নিয়েছেন।’

এদিকে পঞ্চম ধাপের ভোট শেষ সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘নির্বাচনবিমুখতা জাতিকে গভীর খাদের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনের অনিশ্চিত গন্তব্যে বাংলাদেশ। এই অবস্থা কখনও কাম্য হতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘এবার উপজেলা নির্বাচনে সবচেয়ে আশঙ্কার দিক হচ্ছে ভোটারদের নির্বাচনবিমুখতা। একটি গণতান্ত্রিক দেশ ও জাতির জন্য নির্বাচনবিমুখতা অশনিসংকেত। যথোপযুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে।’

প্রথম ধাপ: গত ১০ মার্চ প্রথম দফায় ৭৯টি উপজেলার মধ্যে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ ৫৬টিতে জয়লাভ করে। এরমধ্যে দলটির ১৪ জন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বিনা ভোটে। বাকি ২৩টি উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। এই স্বতন্ত্রদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। প্রথম ধাপের ভোট পড়ে গড়ে ৪৩ দশমিক ৩২ শতাংশ।

দ্বিতীয় ধাপ: গত ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচনে ১২৩টি উপজেলার মধ্যে ২৩টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়সহ আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ৭৭টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। এ দফায় জাতীয় পার্টি (এ) ২টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৪৪টিতে জয়ী হয়েছেন। দ্বিতীয় ধাপে ভোট পড়ে ৪১ দশমিক ২৫ শতাংশ।

তৃতীয় ধাপ: ২৪ মার্চ তৃতীয় ধাপে ১২২টির মধ্যে আওয়ামী লীগ ৮৩টিতে জয়ী হয়। এরমধ্যে ৩১টির চেয়ারম্যান পদে দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এছাড়া জাতীয় পার্টি ১টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ৩৮টিতে জয়ী হয়। ভোট পড়ে গড়ে ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ।

চতুর্থ ধাপ: ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত এ ধাপে ১২১টি উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৯টি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাসহ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি (জেপি) ১টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৩২টিতে জয়ী হয়। ভোট পড়েছে ৩৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ ধাপে ১৫টি উপজেলায় সব পদে প্রার্থীরা বিনা ভোটে বিজয়ী হওয়ায় সেগুলোতে ভোটের দরকার হয়নি।

পঞ্চম ধাপ: সর্বশেষ ১৮ জুন অনুষ্ঠিত ৫ম ধাপের ভোটে ২২ উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৫টিসহ ১৩টিতে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছে। এ ধাপে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা চেয়ারম্যান পদে ৯টিতে বিজয়ী হয়েছেন। এ ধাপে ভোটের হার ৩৮ দশমিক ৬২ শতাংশ।

এছাড়া, পঞ্চম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলেও তার কয়েকটি আদালতের কারণে স্থগিত হয়েছিল। পরে সেগুলো নিষ্পত্তি করে ইসি ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করে। এ ধরনের ৬টি উপজেলার মধ্যে তিনটিতে আওয়ামী লীগ ও তিনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের তুলনায় এবার অনেক কম ভোট পড়েছে। তখন ছয় ধাপে উপজেলা নির্বাচন হয়। সেই সময়ে প্রথম ধাপে ৬২ দশমিক ৪৪ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ৬৩ দশমিক ৩১ শতাংশ, তৃতীয় ধাপে ৬৩ দশমিক ৫২ শতাংশ, চতুর্থ ধাপে ৫৬ দশমিক ১২ শতাংশ, পঞ্চম ধাপে ৬০ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ষষ্ঠ ধাপে ৫৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ ভোট পড়ে। ১০ বছর আগে ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি তৃতীয় উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে ভোট পড়ে ৬৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
প্রসঙ্গত, দেশের ৪৯২টি উপজেলার মধ্যে আরও ১০টির মতো উপজেলায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বর/অক্টোবরে ভোট হবে। এছাড়া কয়েকটি উপজেলা এখনও নির্বাচন উপযোগী হয়নি এবং কয়েকটি মামলার কারণে আটকে রয়েছে।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ