সংসদে ব্যাংকিং খাতের সমালোচনায় বিএনপি ও আ.লীগের শরিকরা

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২৩:২১, জুন ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:২৩, জুন ১৯, ২০১৯

 জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা খেলাপি ঋণসহ আর্থিক খাতের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা এবং কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। বিএনপি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শরিক দলের একাধিক সংসদ সদস্য বলেন, আর্থিক খাতের দুর্গতি সরকারের সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রার পথে কাঁটা হয়ে রয়েছে। ব্যাংক খাতে লুটপাট, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা এখন সবারই জানা। ঋণখেলাপির দায়ে ব্যাংকগুলোর এখন বেহাল দশা, চলছে তারল্য সংকট। ব্যাংকিং সেক্টরের দুর্নীতি অনিয়ম দূর করা না গেলে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

বুধবার (১৯ জুন) স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এ সমালোচনা করেন।

বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, বাজেটের আকার নিয়ে কথা হয়। কিন্তু এ বাজেট বাস্তবসম্মত। বড় বাজেট সরকার বাস্তবায়ন করতে পারে। বড় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারে।

পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, যারা রেমিট্যান্স পাঠান, তারা যেন সরকারি কর্মকতাদের যথেষ্ঠ সহায়তা পান তা নিশ্চিত করতে হবে। রেমিট্যান্সে প্রণোদনা এ বাজেটের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।

নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সরকারি দলের সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষমতার বাইরে থাকা মূল নারী সমাজ কতখানি বৈষম্যের শিকার তার একটি সমীক্ষা হওয়া দরকার। নারীর ক্ষমতায়নে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোতে ওয়ার্ড ইউনিয়ন পর্যায়ে সভাপতি–সাধারণ সম্পাদক পদে ২৫ ভাগ নারী, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ২৫ ভাগ নারী প্রার্থী দেওয়া হোক। রাজনৈতিকভাবে এটা করতে হবে। না হলে নারীরা এগিয়ে আসতে পারবেন না।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রার পথে কাঁটা হয়ে রয়েছে আর্থিক খাতের দুর্গতি। ব্যাংক খাতে লুটপাট, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা কারও অজানা নয়। ঋণখেলাপির দায়ে ব্যাংকগুলো আজ ন্যুব্জ। চলছে তারল্য সংকট। করের টাকা দিয়ে ব্যাংকের ঘাটতি মূলধন পূরণ করার জন্য বরাদ্দ এবারেও রাখা হয়েছে বাজেটে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন ভূমিকা দূরে থাক, ব্যাংকগুলোকে কার্যকর নজরদারি করতেও অক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। নিজের অর্থই তারা সামাল দিতে পারেনি এবং তার কোনও জবাবদিহি দেশবাসী পায়নি।

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন আর এক টাকাও ঋণখেলাপি হবে না। আর ওই প্রজ্ঞাপনের এক মাসের মধ্যে ঋণখেলাপির পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকার ওপর ছাড়িয়ে গেছে, যা এই বাজেটের পরিমাণের এক পঞ্চমাংশ। আর ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি কীভাবে নির্দিষ্ট হবে তা জানা নেই।

তিনি বলেন, কালো টাকা দিয়ে জমি-ফ্ল্যাট কেনার বিশেষ সুবিধা দান, বিপুল পরিমাণ পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার কোনও প্রক্রিয়া না থাকা কেবল ধনীদের জন্য। আর দেশের বিকাশমান মধ্যবিত্ত এক্ষেত্রে বিশেষ চাপের মধ্যে থাকবে।

বাজেটের সমালোচনা করে বিএনপির রুমিন ফারহানা বলেন, ব্যাংকের ঋণ খেলাপিতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে আছে। ব্যাংকিংখাতে খেলাপি ঋণ ১২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সরকারবান্ধব অর্থনীতিবিদরাও সরকারকে ঋণখেলাপি বান্ধব সরকার বলে আখ্যায়িত করছেন। এটা লুটেরা তোষণকারী সরকার, ঋণখেলাপি বান্ধব সরকার। অপলোপন বাদেই বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তন করে ব্যাংকগুলোকে এক একটি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হলে ব্যাংকের হাতে আর অর্থ থাকবে না।

রুমিন বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসা মানেই শেয়ার বাজার ধ্বংস হয়ে যাওয়া। ২০১০-১১ সালে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারিতে লাখ লাখ মধ্যবিত্তকে পথে বসানো হয়েছে। শেয়ার বাজারের ক্ষেত্রেও কোনও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বাজেটে নেই।

প্রস্তাবিত বাজেটকে গতানুগতিক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বাজেট সরকারের চরিত্র সম্পর্কে ধারণা দেয়। দেশের সব থেকে দরিদ্রপ্রবণ ১০টি জেলায় মোট উন্নয়ন বাজেটের শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ বরাদ্দ হলেও গোপালগঞ্জ জেলায় এই দশ জেলার মোট বরাদ্দের ৫ গুণের বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কেন প্রতিদিন বৈষম্য বাড়ছে তার জবাব পাওয়া যাবে এই বাজেট পড়লে।

তিনি বলেন, সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেট জিডিপির ৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ দাবি করলেও এটি একেবারেই ভুল তথ্য। শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বাজেট ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ যুক্ত করা হয়েছে। বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ১৪ হাজার কোটি টাকা রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ। সঠিক হিসেব করলে দেখা যায় শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশ। শিক্ষার মানোন্নয়ের কোনও পদক্ষেপ এই বাজেটে নেই।

রুমিন দাবি করেন, বাজেটে কৃষকদের প্রতি ন্যূনতম সংবেদনশীলতা দেখানো হয়নি। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তার কোনও নির্দেশনা নেই এ বাজেটে। বেসরকারি বিনিয়োগ ২২ শতাংশে স্থবির হয়ে আছে। তেল, চিনি, গুঁড়ো দুধের মতো অত্যবশকীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে সাধারণ মানুষের জীবন-যাপনকে আরও কষ্টসাধ্য করা হয়েছে।

বিএনপির জাহিদুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট ধনীকে ধনী করবে, এই বাজেট কালো টাকার মালিকদের সুরক্ষা দেওয়ার বাজেট।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও দলের নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহারের দাবি করে জাহিদ বলেন, গণতন্ত্র ফেরানোর আন্দোলন করতে গিয়ে খালেদা জিয়া আজ জেলে। দলের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। তিনি তদন্ত করে এসব মামলা প্রত্যাহার করার ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ করেন।
তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন নেই। জেল, জুলুম, গুম-হত্যা প্রতিনিয়ত হচ্ছে। ইলিয়াস আলীসহ অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। যদি তারা বেঁচে থাকেন তবে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

জাহিদ বলেন, নির্বাচন সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে চান না। গোটা জাতি জানে কী রকম নির্বাচন হয়েছে।

আওয়ামী লীগ–জোটের শরিক জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরিন আকতার বলেন, ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনা মেটাতে না পারলে লুটপাট বন্ধ করা যাবে না, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। তিনি কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য, বাজার স্থিতিশীল রাখা, সবকিছু মিলিয়ে কৃষি কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেন।

শিরিন বলেন, বিএনপি সংসদে এসে বলছে সংসদ অবৈধ। তারা নিজেদেরই অবৈধ ঘোষণা করেছে। এর থেকে হাস্যকর কিছু হতে পারে না।

দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর কাজ দ্রুত শুরু করার দাবি জানান সরকারি দলের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী।

ওয়ার্কার্স পার্টির মোস্তফা লুৎফুল্লাহ বলেন, এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানো না হলে রাজস্ব আয় সম্ভব হবে না।

 

/ইএইচএস/টিটি/

লাইভ

টপ