সংসদ মধ্যরাতের, সরকার অদ্ভুত: বিএনপির হারুন

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২১:৪৭, জুন ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫৩, জুন ২৫, ২০১৯

সংসদ অধিবেশন (ফাইল ফটো)

বর্তমান জাতীয় সংসদকে ‘মধ্যরাতের সংসদ’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য (এমপি) হারুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘এই যে সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, সেই সংসদ নির্বাচনে আগের রাত্রেই ব্যালট ভর্তি হয়। আর পরেরদিন গণনা করা হয়। যে কারণে এটাকে বলা হচ্ছে, মধ্যরাতের পার্লামেন্ট। নির্বাচনে ভোটারা প্রতারিত ও অপমানিত হয়েছে।’ বর্তমান সরকারকে তিনি ‘অদ্ভুত সরকার’ বলেও আখ্যায়িত করেন।

আওয়ামী লীগ দলীয় এমপিদের বক্তব্যের জবাবে হারুন বলেন, ‘এই সংসদে বারবার বলা হচ্ছে যে, কৌশলে বিএনপি হেরে গেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেটা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জাতিসংঘ, টিআইবি, যুক্তরাষ্ট্র, নিউ ইয়র্ক টাইমস, দিল্লির গবেষক-বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন। নির্বাচনের পর পুলিশ সদর দফতর থেকে পুলিশ সুপারদের (এসপি) চিঠি দেওয়া হয়েছে। এটি দেশের ৪৯ বছরের ইতিহাসে অত্যন্ত কলঙ্কজনক। ওই চিঠিতে নির্বাচন পরিচালনার জন্য তাদের ধন্যবাদ জনানো হয়। চিঠিতে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও আন্তর্জাতিক মানসন্মত বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, এসপিরা সুষ্ঠু পরিকল্পনায় তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। এই সুষ্ঠু পরিকল্পনার মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন বলছে, এখন থেকে ব্যালট পেপার পাঠাবো সকাল বেলা। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দায়িত্বপালনে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে। এই কমিশন ব্যর্থ, অযোগ্য।’

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “সংসদ নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনি ১১তম সংসদ নির্বাচনের সময় জাতীয় নেতাদের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান করেছেন; সংলাপে গিয়েছি। সংলাপে আপনি অঙ্গীকার করেছেন, যা জাতীয় সব পত্রপত্রিকায় এসেছে— ‘আপনারা নির্বাচনে যান; নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, শান্তিপূর্ণ হবে’। আপনি কথা দিয়েছিলেন— ‘যেসব মামলা হয়েছে তালিকা দেন, আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো’। আল্লাহ পাক-কুরআনে বলছেন, ‘তোমাদের আমানত ও অঙ্গীকারের ব্যাপারে আল্লাহ অবহিত’। সংসদ নেতা আজকে জাতীয় যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, এ সংকট থেকে বের হয়ে আসার জন্য পথ বের করতে হবে। যেভাবেই বলি না কেন, এটা করতেই হবে। আপনি জাতীয় সংলাপের সময় ওয়াদা করেছেন, সে ওয়াদা কি পূর্ণ হয়েছে? এখানে কোনও কৌশলের বিষয় নেই। আজকে আমরা নির্বাচনে গিয়েছি, ১১তম নির্বাচনের মতো কোনও নির্বাচন হয়নি। আমাদের ২২ জন প্রার্থী গ্রেফতার হয়েছে। ৪০ জন প্রার্থী ভয়ানকভাবে আহত হয়েছে, যা অতীতে কোনও নির্বাচনে হয়নি। কোনও ভোটকেন্দ্রে ভোটার যেতে পারেনি।”

আওয়ামী লীগের সিনিয়র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, “মন্ত্রী (সাবেক) উপহাস করে বলেন, ‘রাস্তায় দাঁড়াতে পারে না’। আজকে বিএনপির কত নেতাকর্মী অপহরণ, ব্রাশফায়ার, বিনাবিচারে হত্যার শিকার হয়েছে, এর তথ্য-হিসাব আপনি চাইলে পৌঁছে দেবো। বিএনপির মহাসচিবের নামে ৮৪টি মামলা। অবাক লাগে যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গায়েবি মামলা বলে কিছু নাই’। আমাদের সাবেক স্পিকার জমির উদ্দীন সরকার, খন্দকার মাহবুব হোসেন, মওদুদ আহমদ, বিএনপির সিনিয়র নেতারা নাকি হাতিরঝিলে বসে বোমা তৈরি করছিলেন, নাশকতার কাজে লিপ্ত ছিলেন। গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার কম করে হলেও ৯০ হাজার মামলা করেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে। অধিকাংশই ভুয়া। প্রায় ২৫ লাখ আসামি। বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে অভিযোগ দিয়েছে, বোমা তৈরি করছিল।” গায়েবি মামলার বিষয়টি তদন্তে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করতে স্পিকারের প্রতি অনুরোধ করেন বিএনপির এমপি।

তিনি বলেন, ‘জননিরাপত্তার কথা বলা হচ্ছে। এই সরকারের ১০ বছরে নিখোঁজ হয়ে গেছে প্রায় ১২শ’ মানুষ। গুমের শিকার হয়েছে কতজন? জানি না, এখানে কথা বলে বাড়ি ফিরে যেতে পারবো কিনা, রাস্তা থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে আমার ভাগ্যে ইলিয়াসের ভাগ্য জুটবে কিনা, সালাউদ্দিনের ভাগ্য জুটবে কিনা; একথা বলতে পারছি না।’

হারুনুর রশীদের বক্তব্যের একপর্যায়ে স্পিকার শিরীন শারমিন বলেন, ‘মাননীয় সদস্য, আপনি বাজেটের ওপর কোনও কথা বলছেন না। আপনি বাজেটের ওপর কথা বলুন।’

জবাবে হারুন বলেন, ‘বাজেটের ওপর আলোচনা করতেই প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু এতক্ষণ সাধারণ আলোচনা হয়েছে; যা আজকে বক্তব্যের ধারা চেঞ্জ করে দিয়েছে।’

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী স্বজন হারিয়েছেন। ইনডিমনিটি বিলের মধ্যদিয়ে হত্যার বিচার বন্ধ করা হয়েছিল। কুরআনে আল্লাহ কিসাসের কথা বলেছেন। কোনও আইন দিয়ে হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করা যায় না। আমি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। অবশ্যই যারা বিচার বন্ধ করেছিল, এটা কুরআন পরিপন্থী। কুরআনে বদলা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে বাড়াবড়ি না হয়ে যায়। যে কারণে আমাদের জাতীয় নেতারা এ বিষয়গুলো বিবেচনা করেছেন। বিচার করতে গিয়ে যদি সত্যিকার অর্থে কোনও নিরীহ মানুষকে হত্যাকাণ্ডের শিকার করে ফেলি, এজন্য আমরা যারা দায়িত্বে থাকবো তাদের জবাবদিহি করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘যতই বলি না কেন, আজকে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জাতীয় যে সংকট তৈরি হয়েছে, এখানে কোনও কৌশলের কথা নয়।’

সংসদে মতিয়া চৌধুরীর দেওয়া বক্তব্যের জবাবে বিএনপির এই এমপি বলেন, ‘মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, জিয়াউর রহমান মদের লাইসেন্স দিয়েছেন। লাইসেন্স কী মুসলমানদের দিয়েছেন? সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, অন্য ধর্মাবলম্বীরা স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করবে। সাঁওতাল, ডোম-রা মদ পান করে। সুইপার, বিদেশিরা রয়েছে, তাদের মদ লাগে। যেসব মদের লাইসেন্স দেখেন, মুসলমানদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে? মদের লাইসেন্সে শর্ত দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স না থাকলে আজকে অনেকে মদ্যপান করে এই সংসদে চলে আসতেন। আর আপনারা কেন ওই আইন বাতিল করলেন না?’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ দুর্নীতিতে মহা-আক্রান্ত। এই বাজেট কি নিশ্চয়তা দিতে পারবো, যারা ব্যাংকের টাকা লুটপাট করে নিয়ে গেছে, তাদের গ্রেফতার করতে পারবো? বাজেট কি নিশ্চয়তা দিতে পারবে, যারা শেয়ারবাজার লুটপাট করে ধ্বংস করে দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা  নিতে পারবো? এই বাজেটে কি কোনও ঘোষণা আছে, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে? চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি।’

বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এটি একটি অদ্ভুত সরকার। মহাজোটে ভোট করলেন। মহাজোটের শরিকদের বিরোধী দলে বসিয়ে দিলেন। আমি পরিষ্কার বলছি, আজকে যখন পার্লামেন্টে ঢুকি, দেখি— মহাজোটের শরিকদের যারা বিরোধী দলে বসে আছে, চেহারা কিন্তু মলিন। এটা হয় না। দেড় বছর আগে একইসঙ্গে কাজ করলাম, ঘর করলাম, এখন বিরোধিতা করি —এটা হয়? রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘ওনারা নিজেদের অবস্থান নিয়ে বিব্রত’। হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ‘ফরমায়েশি বিরোধী দল দিয়ে সংসদ কার্যকর করা যাবে না’। এগুলো সত্য। মসজিদে ঘোষণা দিয়েও ভোটার পাওয়া যাচ্ছে না। এটা সত্য। কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এগুলো সত্য। একা থাকতে ভয় পান এরশাদ। ওনাকে জোর করে ভোটে দাঁড় করানো হয়েছে; ২০১৪ সালেও, এবারও।”

তিনি বলেন, ‘আমরা যেভাবেই বলি না কেন, আজকে এই জায়গা থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবো? আজকে আমরা সংসদে আসার পর আমাদের কথাগুলো মানুষ শুনছে। আর আপনারা যারা সংসদে আছেন, বাইরে দেখেন, বাইরে আপনাদের বক্তব্য কেউ শুনছে না। টেলিভিশন বন্ধ, মিডিয়া বন্ধ, ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে তাদের। টেলিভিশনের নিউজ বন্ধ করে দিয়েছে।’

হারুন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলে দিলেন, বালিশ মাসুদ বিএনপির ভিপি ছিলেন। এটা সঠিক নয়। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলে যাচ্ছি, এটা একেবারেই সঠিক তথ্য নয়। বুয়েটের কোনও ছাত্র ভিপি ছিল না। আর বিএনপির একজন ভিপি রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পালন করবেন, এটা কি সম্ভব? এটা কি বিশ্বাস হয়? আজকে বিএনপির লোকেরা চাকরি নেওয়ার আগে ইনভেস্টিগেশন হচ্ছে, বাপ-মা কী করে। বিএনপি হলে বাতিল। বিসিএসে টেকার পরও চাকরি নাই।’

বাজেটের স্লোগানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সময় এখন আমাদের..., মানুষ তা বলছে না। মানুষ বলছে, সময় এখন আমাদের, দুঃসময় এখন বাংলাদেশের। এ অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। বেরিয়ে আসতে হবে। প্রত্যাশা করবো।’

 

/ইএইচএস/এমএ/

লাইভ

টপ