আন্তর্জাতিক নির্যাতনবিরোধী দিবস শিশু নির্যাতনের মামলা হয় কম!

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৭:২৩, জুন ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৬, জুন ২৬, ২০১৯




শিশু নির্যাতনরায়হান (৮) কাজ করতো কাজীপাড়ার একটি গ্যারেজে। সারাদিন খাওয়া খরচ আর যদি কেউ খুশি হয়ে কিছু দিতো তাই ছিল তার উপার্জন। কাজে ভুল হলে জুটতো চড়-থাপ্পড়, আবার মাঝে-মধ্যে ব্যাপক মারধরও করা হতো। গত মার্চ মাসে রায়হানের ভুলে গ্যারেজ মালিকের আর্থিক ক্ষতি হয়। এরপর চলে বেদম প্রহার, দিনভর খাওয়া বন্ধ হয়ে যায় তার। সেদিনই ওই গ্যারেজ ছেড়ে চলে আসে রায়হান। ছেলের ক্ষত নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান বাবা, কিন্তু থানা পুলিশ আর করেননি। তবে থানা পুলিশ করা হতে পারে, এই ভয়ে গ্যারেজ মালিক রায়হানের চিকিৎসার খরচসহ কিছু টাকা তার বাবার হাতে তুলে দিয়ে বিষয়টি আপস করেন।

‘পুলিশি ঝামেলা’ এড়াতে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় রায়হানের বাবার মতো অনেক অভিভাবকই এভাবে আপস করছেন। ফলে অন্যান্য নির্যাতনের ঘটনার চেয়ে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা কম হয়। নির্যাতনকারী ও ভিকটিম শিশুর অভিভাবকের মধ্যস্ততার এ সুযোগ থাকার কারণেই মামলা কম হচ্ছে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মীরা।

জানুয়ারি থেকে মে ২০১৯ পর্যন্ত মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, এ সময়ের মধ্যে শিশু হত্যা হয়েছে ১৬৯টি, মামলা হয়েছে ৬৫টির ক্ষেত্রে। হত্যার শিকার ৩৩ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছর, আর ৩১ জনের ছয় বছরের নিচে। একই সময়ে শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৫৪৩টি। তবে মামলা হয়েছে ৩৬৫টি ঘটনায়। ভিকটিম ১০৪ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে, আর ৬৪ জনের বয়স ছয় বছরের নিচে।

এ পরিস্থিতিতে আজ ২৬ জুন আন্তর্জাতিক নির্যাতনবিরোধী দিবস পালন হচ্ছে। জাতিসংঘের সদস্য প্রতিটি দেশ দিনটি পালন করছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান মনে করেন, আমাদের মধ্যে মামলা না নেওয়া এবং মামলা না করার মানসিকতা আছে। তবে হত্যার ঘটনায় মামলা না হওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মানবাধিকার সংস্থাগুলো পত্রিকা থেকে তালিকা নির্ধারণ করে এবং পত্রিকায় সবসময় মামলার বিষয়টি উল্লেখ থাকে না বলে সংখ্যাটি এত কম। কিন্তু হত্যা মামলায় এ সুযোগ নেই বললেই চলে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় অভিভাবকরা অপরাধীদের সঙ্গে থানার বাইরে দফারফা করেন। কেননা তারা মামলা চালিয়ে যাওয়ার হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে চান না।

তিনি আরও বলেন, অপরদিকে সাধারণ সহিংসতার ঘটনায় অনেকসময় থানা থেকেও মামলায় অনুৎসাহিত করা হয়। কেননা থানা এলাকায় এ ধরনের অপরাধ ঘটছে, পুলিশ সদস্যরা তা লুকাতে চান। এছাড়া অভিভাবকদের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী অপরাধীদের বিপরীতে মামলায় অনীহা থাকে, ফলে তারা সমঝোতা করে নেন। আর এমনিতেই সাধারণ মানুষের ভেতর পুলিশের কাছে না যাওয়ার প্রবণতা আছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড রাইটস গভর্নেন্স অ্যান্ড চাইল্ড প্রোটেকশন সেক্টরের পরিচালক আবদুল্লা আল মামুন বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই শিশু হত্যাসহ শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবে মামলা পর্যন্ত যেতে পারে না, তার আগেই স্থানীয়ভাবে মীমাংসা বা আর্থিক ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে দফারফা হয়, যা আইনত ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া থানা-পুলিশের নানারকম হয়রানি ও অনাগ্রহের কারণে চাইলেও অনেক বাদী শিশুহত্যা বা শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে মামলা করতে পারেন না। সর্বোপরি, মামলার প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক অভিভাবক আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। উল্লিখিত বিষয়গুলো সমাধান ছাড়াও শিশু নির্যাতনরোধে সরকারি হেল্পলাইন পরিচালনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা করতে সহযোগিতাকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে হবে।

শিশুদের আমরা মানুষ হিসেবে গণনা করি, নাকি কেবল সংখ্যা হিসেবে দেখি, সেটি আগে ভেবে দেখার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন শিশু অধিকার কর্মী গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এমনিতেই আমাদের মধ্যে পুলিশভীতি আছে। যখন কোনও নিম্নবিত্তের শিশু হত্যার ঘটনা ঘটে, সে বিচার চাইবে, এমন সাহস সচরাচর তার হয় না। প্রভাবশালীদের চাপে পড়ে থানার বাইরে তাকে আপস করতে হয়।

অবস্থার পরিবর্তনে সামাজিক সচেতনতা, পুলিশি সহায়তা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি শিশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

/টিটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ