ডেঙ্গু মোকাবিলায় দুই সিটির ভরসা স্বেচ্ছাসেবীরা

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ২২:১৫, জুলাই ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫৫, জুলাই ২২, ২০১৯




ডেঙ্গু-ডিএসসিসি-ডিএনসিসিঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে জনবলের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। মাত্র ৪৮ শতাংশ জনবল নিয়ে সংস্থা দু’টি নাগরিক সেবা দিয়ে আসছে। এর ফলে নাগরিক সেবার মানও কমেছে। পাশাপাশি ডেঙ্গুসহ প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগ ও পরিচ্ছন্নতা কর্যক্রমে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংস্থা দু’টিকে। এ অবস্থায় নাগরিকসেবা অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, সরকারের অন্যান্য জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসহ স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে এই দুই সিটিকে।

দুই সিটি সূত্র জানিয়েছে, ১৯৮৯ সালের অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের জনবল কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) দিয়েই এখনও পরিচালিত হচ্ছে বিভক্ত দুই সিটি করপোরেশন। সংস্থা দু’টি বিভক্তির পর ২০১২ সালের জানুয়ারিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দুই সংস্থার পক্ষে পৃথক দুটি সাংগঠনিক কাঠামোর প্রস্তাব পাঠানো হয়। তখন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় প্রস্তাব পর্যালোচনা করে ঢাকা উত্তরের জন্য ১ হাজার ৮৫৮ এবং ঢাকা দক্ষিণের জন্য ২ হাজার ৪৮২ জন জনবল চূড়ান্ত করে। দুই সিটি করপোরেশন মিলে ৪ হাজার ২৮০ জন। যদিও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মোট জনবল ছিল ৫ হাজার ১১৭ জন।

ওই অর্গানোগ্রাম তৈরির দুই বছর পর ১৯৯১ সালে রাজধানী ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল ৩৪ লাখ ৪০ হাজার ১৩৭ জন। আর তখন নগরীর আয়তন ছিল ১২৯ বর্গকিলোমিটার । আর এখন নতুন করে ১৬টি ইউনিয়ন যুক্ত হওয়ায় এর আয়তন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭০ বর্গকিলোমিটারে। ফলে শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় নতুন সাংগঠনিক কাঠামো। পাশাপাশি এর আঞ্চলিক কার্যালয়ও বেড়েছে। কিন্তু জনবল বাড়েনি।

পরে দুই সংস্থার প্রত্যেক বিভাগের অভিমতসহ ওই সাংগঠনিক কাঠামো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পুনরায় পাঠানো হয়। এ ক্ষেত্রে উত্তরের জনবল ১ হাজার ৮৫৮ জনের স্থলে ২ হাজার ৫০০ এবং দক্ষিণের ২ হাজার ৪৮২ জনের স্থলে ৩ হাজার ৪০০ করার প্রস্তাব করা হয়। এরপর থেকে বিষয়টি নিয়ে ফাইল চালাচালিসহ তদবির চলছে। কিন্তু এখনও অনুমোদন পায়নি।

সম্প্রতি সময়ে নগরজুড়ে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ৪ জনের মৃত্যু হলেও বেসরকারি হিসেবে এর সংখ্যা প্রায় ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজারেরও বেশি। এ অবস্থায় মশার ওষুধ ছিটাতে বিভিন্ন ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ চালিয়ে যাচ্ছে দুই সিটি করপোরেশন। তবে সংস্থা দুটি বলছে, এ জন্য যে পরিমাণ জনবল থাকার কথা, তা নেই। সে কারণে অতিপ্রয়োজনীয় এসব সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে মশানিধন কাজে ৩৪৪ জন জনবল রয়েছে। এর মধ্যে স্প্রে-ম্যান রয়েছেন ১৮৩ জন, ক্রু ১৫১ জন ও সুপারভাইজার ১০ জন। অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটিতে এর সংখ্যা ৩১৭ জন। এর মধ্যে ১২০ জন স্প্রেম্যান ও ১৮৯ জন ক্রু-ম্যান। সুপারভাইজার রয়েছেন ৮ জন। মাত্র এক হাজার ৬৬১ জন জনবল নিয়ে এ বিশাল নগরীর মশানিধন কাজ পরিচালনা অসম্ভব বলে মনে করছে সিটি করপোরেশন। এ অবস্থায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় ঢাকা দক্ষিণ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কর্মীদের সমন্বয়ে কমিউনিটি অ্যাম্বাসেড়র নিয়োগ করেছে। পাশাপাশি স্কাউট ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর ( বিএনসিসি) সদস্যদের দ্বারস্থ হচ্ছে।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘আমাদের যে জনবল রয়েছে, তা অবশ্যই অপ্রতুল। এখন সিটি করপোরেশনের আয়তন বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু জনবল বাড়েনি। বরং কমছে। মাত্র ৪৮ শতাংশ জনবল নিয়ে এখন দ্বিগুণ সিটির সেবা দিয়ে যাচ্ছি। পরিচ্ছন্নতা ও মশানিধন কার্যক্রমসহ দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছি।’

সাঈদ খোকন আরও বলেন, ‘আমাদের যে জনবল কাঠামো রয়েছে, সেটা দীর্ঘ ৮-৯ বছর ধরে মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। এখনও অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আমি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফোরামে বলেছি। মন্ত্রীও চেষ্টা করছেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতিকে মোকাবিলা করার জন্য বিভিন্ন সংগঠন, স্কাউট দল, বিএনসিসি ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিডেন্সের সদস্যদের ওপর নির্ভর হতে হচ্ছে। অচিরেই সবাইকে সম্পৃক্ত করে জনবলের যে ঘাটতি রয়েছে, সাময়িকভাবে হলেও দুই-এক দিনের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে এই জনবল কাটাবার উদ্যোগ নেবো।’

এদিকে, উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘জনগণকে যথাযথ সার্ভিস দেওয়ার জন্য অবশ্যই জনবল বাড়াতে হবে। আমাদের জনবল খুবই কম। সে কারণে জরুরি সার্ভিস দিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। জনবল কাঠামো অনুমোদন পেলে নগরীতে এই সমস্যাগুলো দেখা দিতো না। তখন আরও ভালো সার্ভিস দেওয়া সম্ভব হতো।’

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দুই সিটি করপোরেশন থেকে অর্গানোগ্রাম বিষয়ে যে প্রস্তাবনা পেয়েছি, সেটি চূড়ান্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। এটি তো এতদিন পেইন্ডিং থাকার কথা না। তবু আবারও খোঁজ নিচ্ছি।’

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের তো প্রত্যেকটি স্থানে কিছু সমস্যা রয়েছে। কাজগুলো ডিলে হয়। বিশেষ করে সরকারি কাজগুলোয় কিছু প্রসিডিউর মেনটেইন করে চলতে হয়। আমরা কাজ করছি।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে খোঁজ নিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জনপ্রশাসনও বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে। তবে, কর্মকর্তাদের প্রমোশনের বিষয়ে মন্ত্রণালয় বলছে, এটি একটি পরীক্ষার মাধ্যমে হবে। এই বিষয়টি নিয়েই মূলত একটু সমস্যা চলছে।’ আগামীকাল (সোমবার ২২ জুলাই) এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হবে বলেও তিনি জানান।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ