শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলার ছলে দেওয়া হচ্ছে যৌন-প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা (ভিডিও)

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ১০:২৯, আগস্ট ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪০, আগস্ট ২৩, ২০১৯


শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচির স্বাস্থ্যশিক্ষা অন্য আর পাঁচটা বিষয়ের মতোই। তবে ‘সবার জন্য জেন্ডার সমতা’ বা ‘জেমস’ গাইডের মডিউল ক্লাস ব্যতিক্রম। এর চেয়ে আরও ব্যতিক্রমী ও শিক্ষণীয় হচ্ছে ‘যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা’র দুটি খেলা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই খেলার ছলেই বয়ঃসন্ধিকালের (১০ থেকে ১৯ বছর) কিশোর-কিশোরীদের যৌন-প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান পাঠসূচিতে স্বাস্থ্যশিক্ষা পাঠ থাকলেও তাতে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। এমনকি শিক্ষকরাও শুরুতে বিষয়টি এড়িয়ে যান। আর এ কারণেই ‘জেনারেশন ব্রেক থ্রু’ নামের প্রকল্প হাতে নেয় মাউশি।

প্রকল্প পরিচালক ও মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) জেনারেশন ব্রেক থ্রু নামের প্রকল্প শুরু করে ২০১৪ সালে। যৌন ও প্রজনন, স্বাস্থ্য ও অধিকার এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ সংক্রান্ত তথ্য প্রবাহে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করতে এই প্রকল্প শুরু করা হয়। প্রকল্পের আওতায় দেশের ৫০টি মাদ্রাসাসহ মোট ৩৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। গত বছর ডিসেম্বরে এই প্রকল্প শেষ হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজ উদ্যোগেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর ৬০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এভাবে চলছে ক্লাস। সরকার এই শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করতে যাচ্ছে এ বছর থেকেই। প্রথম পর্যায়ে যেভাবে চলেছে সেভাবেই কার্যক্রম পরিচালিত হবে।’

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন আরও বলেন, ‘প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে এ বছর যুক্ত হচ্ছে দেশের পাঁচটি জেলার ২৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুই লাখ সাত হাজার ৫২ জন ছাত্র-ছাত্রী। আর ২০২১ ও ২০২২ সালে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ প্রকল্প চালু হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে দেশের অন্য ছয়টি বিভাগের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্ধেকে চালু করা হবে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম।’

বেসরকারি সংস্থা কনসার্ন উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট (সিডব্লিউএফডি) টেকনিক্যাল অফিসার ইয়াসমিন আক্তার বলেন, ‘প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী বয়ঃসন্ধিকালের শিক্ষার্থীদের এই শিক্ষা দেন। খেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যৌন ও প্রজনন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। হার্ড ব্রেক খেলার মাধ্যমে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির ছেলেমেয়েদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। ১০-১৯ এর মোড় খেলায় এই শিক্ষা দেওয়া হয় ষষ্ট থেকে দশম শ্রেণির ছেলেমেয়েদের। এছাড়া কম্পিউটার গেম রয়েছে সাতটি। ভূতের বাড়ি, অজানাকে জানা খেলাসহ সাতটি খেলায় যৌন প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্য দেওয়া আছে।’

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষার উপকরণ বিশেষভাবে তৈরি লুডু গত বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) আইডিয়াল স্কুল অ্যন্ড কলেজের কিশোর-কিশোরী কর্নারে ‘হার্ড ব্রেক’ খেলায় অংশ নেয় নবম শ্রেণির মেয়েরা। খেলায় হার-জিতের আনন্দে মেতেই যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষার বিভিন্ন বিষয় জেনে নেয় তারা। এই খেলা শুধু অষ্টম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য। এই খেলার মাধ্যমে যৌন ও প্রজনন বিষয়ে শিক্ষা পাচ্ছে ছাত্রীরা।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরুনিমা, অর্ণা, অর্পা ইউশা বলেন, ‘আমরা বুঝতে পেরেছি এই শিক্ষায় লজ্জার কিছু নেই। এখন নিজেরা শিখে অন্যদেরও শেখাচ্ছি। বয়ঃসন্ধিকালে আমাদের করণীয় কী তা জানতে পেরেছি। শারীরিক পরিবর্তন সংক্রান্ত সমস্যা বা মাসিক হলে আর লজ্জা বা ভয় পাই না। এছাড়া গুড টাচ, ব্যাড টাচ কী তা জেনেছি। কেউ ব্যাড টাচ করলে প্রতিবাদ করতে পারি। প্রথমে মা বা শিক্ষককে জানাতে পারি। আমাদের আগের ভুল ধারণা দূর হয়েছে। খেলার মাধ্যমে আমরা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে পারি।’

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক মনি দ্বীপা রায় চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা আগে দ্বিধার মধ্যে ছিল। কিন্তু এখন অভিভাবকদের আগ্রহ অনেক বেশি। শুরুতে ক্লাসে মেয়েরা অস্বস্তি অনুভব করতো। কিন্তু এখন তা নেই। খেলার মধ্যদিয়েই ছেলেমেয়েরা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে জানছে।’

গত ৩১ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ‘১০-১৯ এর মোড়’ খেলায় প্রাণোচ্ছল অংশ নেওয়া দেখা গেছে। জেমস গাইড ক্লাসে প্রাণবন্ত ছিল শিক্ষার্থীরা। তার চেয়ে বেশি প্রাণবন্ত দেখা গেছে ‘সবার জন্য জেন্ডার সমতা (জেমস) কর্নার’ বা জেমস কর্ণারে ‘১০-১৯ এর মোড়’ খেলায়। খেলায় ষষ্ট শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির সব শিক্ষার্থীই অংশ নিচ্ছে। এই খেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জানতে পারছে প্রজনন স্বাস্থ্যেন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কুসংস্কার দূর করার জন্য এই খেলার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রশ্ন। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করে, তারাই আবার উত্তর দেয়। খেলাটি সাপ-লুডু খেলার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দদায়ক বলেও জানায় শিক্ষার্থীরা।

তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিক্ষার্থী মুবিদুর রহমান নাবিল ও নবম শ্রেণির মুজাহিদ জানায়, আগে তাদের লজ্জা লাগতো। এখন আর সমস্যা হয় না।

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষার উপকরণ বিশেষভাবে তৈরি লুডুশিক্ষার্থীরা বলে, শারীরিক বিভিন্ন পরিবর্তন ও প্রজনন বিষয়ে আমরা আগে ভুল জানতাম। এখন সঠিক তথ্য জেনে বন্ধুদের সঙ্গেও শেয়ার করি। শারীরিক পরিবর্তন স্বাভাবিক এটা নিয়ে ভয় বা লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। এটা সবার জানা দরকার।

জেমস কর্নারে ‘১০-১৯ এর মোড়’ খেলায় সহকারী শিক্ষক মো. জিয়াউর রহমান গাইড করেন। তিনি জানান, খেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শারীরিক পরিবর্তন ও সমস্যা সম্পর্কে জানতে পারছে। প্রয়োজনে শিক্ষকদের ফোন করেও তারা সমাধান পাচ্ছে।

এরআগে, জেমস গাইডের মডিউল থেকে শ্রম বিভাজন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষিত সহকারী শিক্ষক আব্দুস সোবহান। তিনি বলেন, নারী ও পুরুষের জন্য ঘরের বা ঘরের বাইরের কোনও কাজ নির্ধারিত নয়, তাই শেখানো হচ্ছিল। রান্না করা শুধুই নারীদের কাজ তা নয়, কারণ ঘরের বাইরের রান্না করেন পুরুষরা। তাই ঘরে কিংবা বাইরে নারী কিংবা পুরুষ একই কাজ করতে পারে।

শ্রম বিভাজন করে নারী ও পুরুষকে সমান মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা যায় না, এ বিষয়টিই শিক্ষার্থীদের বোঝানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।

/টিটি/

লাইভ

টপ