৯০ শতাংশ কোরবানির পশু কাটেন ‘অপেশাদার’ কসাইরা

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ১২:১৩, আগস্ট ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৪, আগস্ট ১২, ২০১৯

জবাইয়ের আগে গরু বাঁধছেন কয়েকজন ‘অপেশাদার’ কসাই

কোরবানির ঈদ এলে পেশাদার কসাইদের কদর অন্য সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কারণ, রাজধানীতে কোরবানির পশুর তুলনায় পেশাদার কসাইয়ের সংখ্যা খুবই কম; মাত্র ১০ শতাংশ। সেজন্য ঈদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে, এমনকি কোরবানির পশু কেনার আগেই পেশাদার কসাইদের নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। পেশাদারদের নিয়ে এই টানাটানির ভিড়ে ঈদের দিনটিতে দেখা মেলে ‘একদিনের কসাই’দের; যাদের আবার ‘অপেশাদার’ বা ‘মৌসুমি’ কসাইও বলা হয়। মাংস ব্যবসায়ী সমিতি বলছে, রাজধানীর ৯০ শতাংশ কোরবানির পশু কাটার কাজ করেন এই অপেশাদাররাই; যাদের বেশিরভাগই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার রিকশাচালক, দিনমজুর বা সবজি-বিক্রেতা। বাড়তি কিছু আয়ের আশায় পশু কাটার একাজ বেছে নেন তারা।

রাজধানী ঘুরে কয়েকজন অপেশাদার কসাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পেশাদারদের তুলনায় কম পারিশ্রমিকে পশু কাটেন তারা। ঈদের দিনটিতে বাড়তি কিছু টাকা আয় করে তা নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। অনেকে ঈদের দিন পশু কাটার জন্য গ্রাম থেকে ছুটে আসেন রাজধানীতে। মাংস নিয়ে ঈদের পরদিনই আবার গ্রামে ফিরে যান। রাজধানীতে পেশাদার কসাইদের সংখ্যা কম হওয়ায় এই অপেশাদার কসাইরাই নগরবাসীর ভরসা।

কোরবানির গরু জবাইয়ের প্রস্তুতিঈদের দিন ঢাকার সর্বত্র তাদের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে। রাজধানীর কাওরান বাজার, গ্রিন রোড, কাঁঠাল বাগান, কলা বাগান, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, ধানমন্ডি, পান্থপথ, কাঁটাবন, ইস্কাটন, মালিবাগ, মগবাজার এলাকাসহ প্রায় প্রতিটি এলাকায় অপেশাদার কসাইয়ের দেখা মেলে। ঈদের দুদিন আগে থেকেই পাড়ামহল্লায় ঘুরে ঘুরে কাজ জুটিয়ে ফেলেন তারা। পেশাদার কসাইয়ের তুলনায় কিছুটা কম টাকায় কাজ নেন এই অপেশাদাররা।

গ্রাম থেকে আসা কয়েকজন অপেশাদার কসাইয়ের ভাষ্য— দিনাজপুর, জামালপুর, পঞ্চগড়, ময়মনসিংহ, বগুড়া, নওগাঁ, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, পুটয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন তারা। কিছু বাড়তি আয়ের আশায় ঈদের দিন স্বজনদের ছেড়ে ঢাকায় পশু জবাই করতে এসেছেন। তারা মূলত চার, পাঁচ, ছয় কিংবা আট জনের দলে কাজ করেন; যেদলের নেতৃত্বে থাকেন একজন পেশাদার কসাই।

দিনাজপুর থেকে আসা মনির বলেন, ‘কসাইয়ের কাজে ঢাকায় আসছি। ঈদে কিছু টাকা বেশি কামানো যায়। এখন কাজের খোঁজ করতেছি। কথাবার্তা ফাইনাল হয়ে গেলে জিনিসপাতি (মাংস কাটার সরঞ্জাম) কিন্না আনবো।’  মনির আরও জানান, এর আগে দুইবার কসাইয়ের কাজ করেছেন তিনি। বেশিরভাগ সময় চুক্তিতেই কাজ করেন। তার সঙ্গে মাংস কাটার কাজ করেন আরও ৪-৫ জন।

মনির বলেন, ‘বেশি লোক থাকলে পেশাদার কসাইয়ের সমান টাকা পাওয়া যায়। পেশাদার কসাইয়ের কাজ ২-৩ জনে মিলে তাড়াতাড়ি কইরা ফালায়। আমাদের একটু সময় বেশি লাগে।’

বাড়তি কিছু উপার্জনের জন্য কোরবানির পশু কাটতে বাইরের জেলা থেকে ঢাকায় আসেন অনেকেপেশাদার কসাইরা পশুর মূল্যভেদে হাজার প্রতি ২০০-২৫০ টাকা পারিশ্রমিক নেন। কিন্তু অপেশাদারদের বেশিরভাগই চুক্তিতে কাজ করেন। কেউ কেউ পশুর মূল্যভেদে হাজারে ১০০ টাকা নিয়েও কাজ করেন।

পেশাদার কসাইদের বলা হয় ‘জাত কসাই’। একটা গরু কাটার কাজ শেষ করতে সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। এক্ষেত্রে তাদের টাকাটাও একটু বেশি দিতে হয়। আস্তে আস্তে দিন যতই গড়াতে থাকে, তাদের কাজের রেট কমতে থাকে। নামাজের পর কাজ করাতে হলে একজন জাত কসাইকে গরুর দামের উপর শতাংশ হারে পারিশ্রমিক দিতে হয়, অর্থাৎ পশুর মূল্যভেদে হাজারে ২৫০-৩০০ টাকা দিতে হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রেট কমতে কমতে ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেমে আসে।

মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজারের মাংস বিক্রেতা একরামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের অর্ডারের বুকিংয়ের কাজ শুরু হয়ে গেছে। তারা বেশ প্রস্তত। সাধারণত পরিচিত মানুষের মধ্যে কাজ করতে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাই বাইরের কাজের অর্ডার কম নেন। চেনার বাইরে কাজ করলে মজুরি হারানোর একটা শঙ্কা থেকে যায় বলে জানান তিনি।

অপেশাদার কসাইদের বিষয়ে একরাম বলেন, ‘তাদের কাজে আমাদের কোনও সমস্যা হয় না। কারণ আমাদের কাস্টমার ফিক্সড। তাতেই আমরা কুলায় উঠতে পারি না।’

কোরবানির গরুর চামড়া ছাড়াচ্ছেন তিনজন ‘অপেশাদার’ কসাইঅপেশাদার কসাইদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদের সময় ৫৫-৫৮ লাখ গরু কোরবানি হয়। আর ছাগল-ভেড়া কোরবানি হয় ৩০-৩৫ লাখ। আমাদের পেশাদার যেসব মাংস শ্রমিক আছে, তারা ১০ শতাংশের বেশি কোরবানির কাজ করতে পারে না। ৯০ শতাংশ গরু কাটার কাজ অপেশাদারদের দিয়েই হয়। শিল্পপতি পর্যায়ের মানুষেরাই পেশাদার মাংস শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করান। একজন পেশাদার শ্রমিকের মজুরি সবার পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই পেশাদার শ্রমিক না পাওয়া গেলে অনেকেই অপেশাদার শ্রমিক দিয়েই কাজ করান। এতে কোনও বাধাবিপত্তি নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘অপেশাদার মাংস শ্রমিক যারা আছে, তাদের জন্য বিগত দিনে আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কিছু প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করি। তাদের চামড়া সম্পর্কে অবহিত করি। চলতি বছর আমরা এটি করতে পারি নাই। হয়তো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ফান্ডের অভাব ছিল। যেহেতু চামড়া হলো বাংলাদেশের দ্বিতীয় রফতানি খাত, এই খাতকে যাতে প্রথম স্তরে নেওয়া যায়, সেদিকে আমরা লক্ষ্য রাখতেসি। যারা কোরবানিদাতা তাদেরও কোরবানির নিয়মকানুন সম্পর্কে অবহিত করার জন্য আমরা গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে আসছি। আগামীতে এই বিজ্ঞাপন কিছুটা সংশোধন করে সারাদেশে প্রচার করা হবে। শুধু মাংসের দিকে লক্ষ্য রেখে আমরা পশু কাটি না। মাংস ছাড়াও পশুর অন্য সবই রফতানিযোগ্য। এগুলো সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষ অবহিত না। এসব সংরক্ষণের বিষয়েও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।’
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

/এমএ/

লাইভ

টপ