পশু জবাই ও চামড়া সংগ্রহে এবারও ব্যবহার হয়েছে কওমি মাদ্রাসার শিশু শিক্ষার্থীরা

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ২১:১৩, আগস্ট ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৮, আগস্ট ১২, ২০১৯

চামড়া সংগ্রহ করছে কওমি মাদ্রাসার শিশুরা

প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদুল আজহায় কোরবানির পশু জবাই ও চামড়া সংগ্রহে শিশু শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করেছে কওমি মাদ্রাসাগুলো। তবে এবার শিশু শিক্ষার্থীরা পশু জবাইয়ের চেয়ে চামড়া সংগ্রহ করছে বেশি। একজন শিক্ষকের অধীনে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এ কাজ করছে। 

রাজধানীতে ঘুরে দেখা গেছে, বড়দের পাশাপাশি ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুরাও কোরবানির পশু জবাই করছে। আর ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা কোরবানির পশু জবাইয়ে সহযোগিতা ও চামড়া সংগ্রহ করছে। কেউ কেউ আবার রসিদ দিয়ে মাদ্রাসার জন্য টাকা সংগ্রহ করছে।

চামড়া সংগ্রহ করছে কওমি মাদ্রাসার শিশু-কিশোররা

শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রতি বছর তাদের ঈদুল আজহায় পশু জবাই ও চামড়া সংগ্রহের জন্য মাদ্রাসায় থাকতে হয়। তবে কোনও কোনও মাদ্রাসায় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিলে ঈদের ছুটি মেলে। না হয় পশু জবাই ও চামড়া কালেকশনের কাজ করতে হয়। এসব কাজ শেষে ঈদের দিন বিকালে অথবা পরের দিন তাদের ছুটি দেওয়া হয়।

রাজধানীর আজিমপুরে কথা হয় শফি (ছদ্মনাম) নামে এক ১৬ বছর বয়সী কিশোর মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সঙ্গে। সে মোহাম্মদপুর জামি’আ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার ছাত্র। সে জানায়, যারা ঈদের ছুটিতে গেছে  তাদের ১ হাজার টাকা করে জমা দিতে হয়েছে। এছাড়া এলাকায় চামড়ার টাকা সংগ্রহ করতে হবে।

জবাইয়ের কাজে নেমেছে কওমি মাদ্রাসার কিশোর ছাত্র

সোমবার দুপুরে এই কিশোর জানায়, দুটি গরু জবাই করেছে সে। আরও একটি গরু জবাই করার কথা রয়েছে তার। একজন হুজুরের নেতৃত্বে তারা এ এলাকায় কাজ করছে।

আজ ঈদের দিন জবাই ও চামড়া সংগ্রহের পর আগামীকাল (মঙ্গলবার) বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছা আছে তার।

কওমি মাদ্রাসার কিশোর ছাত্রদের লম্বা ছুরি হাতে এভাবে সব এলাকাতেই ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে ঈদের দিনে

রাজধানীর কলাবাগানে কথা হয় মাকসুদুর রহমান নামে মাত্র ১৩ বছর বয়সী আরেক কিশোরের সঙ্গে। জামি’আ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার ইবতেদায়ি আউয়ালের এই ছাত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, দুপুর পর্যন্ত ৩টি গুরু জবাই করেছে সে। ‘বড় হুজুরসহ আমরা ২০-২৫ জনের মতো এসেছি। একেবারে ছোটরা চামড়া কালেকশন করছে’- জানায় সে।

আজিমপুরে কথা হয় ১৪ বছর বয়সী শেখ শাহেদের সঙ্গে। সে লালবাগ জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার ইবতেদায়ি শ্রেণির ছাত্র। সে জবাই করেছে একটি ছাগল ও একটি গরু। শেখ শাহেদ বলে, ‘মাদ্রাসা থেকে অনেকে ছুটিতে গেছে। যারা ছুটিতে গেছে, তারা নিজ নিজ এলাকায় চামড়ার টাকা সংগ্রহ করবে। তবে ছাত্রদের বড় একটি অংশ কোরবানির পশু জবাই ও চামড়া কালেকশনের কাজে ঢাকায় রয়েছে।

প্রাপ্তবয়স্ক না হয়েও কোরবানিদাতাদের অজ্ঞতা ও তাড়াহুড়োর কারণে ঈদের দিনে পশু জবাই করেছে এমন কিশোর ছাত্ররাও।

কল্যাণপুর জামিআ ইসলামিয়া মাদ্রাসার তাইসির ছাত্র মো. সোহান। এই কিশোরও চামড়া সংগ্রহের কাজ করছিল। সোহান বলে, আমাদের বড় হুজুরের সঙ্গে এসেছি। এখন পর্যন্ত ৫টা চামড়া পেয়েছি। মাদ্রাসার সব ছাত্রকে চামড়া কালেকশনের জন্য থাকতে হয়। তবে ঈদের পরদিন থেকে আমাদের ছুটি। কালকে কুমিল্লা চলে যাবো।’

চামড়া সংগ্রহ করছে কওমি মাদ্রাসার কিশোররা

ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার হেফজখানার ছাত্র মো. রাকিব। নিজের বয়সটাও ঠিকমতো বলতে পারে না সে। এরপরও এতিমখানার হুজুরদের সঙ্গে চামড়া সংগ্রহের কাজে মাঠে নেমেছে। রাকিব বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করতে না পেরে খারাপ লাগছে। তবে মাদ্রাসার অনেক ছাত্রই ঈদে বাড়ি যেতে পারেনি। ঈদের দিন সকালে মাদ্রাসায় ভালো খাবার দিয়েছে। কালকে গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর নিয়ে যেতে বাবা আসবেন।

যখন অন্য শিশুরা মা-বাবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করছে তখন সোহান ও রাকিবের মতো হাজারও শিশু রাজধানীতে পশু জবাই ও চামড়া সংগ্রহের কাজ করছে।

তবে ঈদে এসব শিশুকে নিয়োজিত করার বিষয়ে জানতে চাইলে উল্লিখিত জায়গাগুলোতে থাকা কওমি মাদ্রাসার কোনও শিক্ষক কথা বলতে রাজি হননি।

এমন শিশুদেরও চামড়া সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করেছে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষগুলো।

প্রসঙ্গত, কোরবানির পশু জবাই ও চামড়া সংগ্রহে অন্তত ১৮ বছরের নিচের কাউকে যেন যুক্ত না করা হয় এ নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনা ছিল। ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট কোরবানির আগে তৎকালীন স্থানীয় সরকার সচিব আব্দুল মালেক বলেছিলেন, ‘১৮ বছরের কম বয়সী মাদ্রাসা ছাত্রদের কোরবানির পশু জবাইয়ে ব্যবহার করা যাবে না। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য সিটি করপোরেশনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনগুলো মাঠপর্যায়ে বিষয়টি নজরদারি করবে।’ এর কারণ হিসেবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের শারীরিক ও মানসিক অপরিপক্বতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। যদিও এ বছর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ১৮ বছরের কম বয়সীদের কোরবানির পশু জবাইয়ে নিযুক্ত না করার বিষয়ে কোনও  নির্দেশনা আসেনি।

কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ চামড়া সংগ্রহের বিষয়ে বরাবর বলে আসছে, এসব মাদ্রাসায় সরকারি অনুদান পাওয়া যায় না। মাদ্রাসার অধিকাংশ ছাত্র গরিব। কোরবানির পশুর চামড়া, ফিতরা, জাকাতের অর্থ দিয়ে ছাত্রদের পড়ালেখা, থাকা-খাওয়ার খরচ মেটানো হয়। ফলে ছাত্ররা স্বেচ্ছায় কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করে।

তবে শিশু শিক্ষার্থীদের কোরবানির পশু জবাই কাজে না থেকে ছুটি নিতে অর্থ দিতে হয়- এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে মোহাম্মদপুর জামি’আ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। তবে এ বিষয়ে কোনও ব্যাখ্যা দিতে রাজি হয়নি এর কর্তৃপক্ষ।

জবাইয়ের পর ছুরির গায়ে লেগে থাকা রক্ত ধোয়ার জন্য পানি এনে দিচ্ছে কওমি মাদ্রাসার এক কিশোর ছাত্র।

মোহাম্মদপুর জামি’আ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার জালানাই শরিফের ছাত্র মো. জাকারিয়া (২৪) বলেন, কোরবানির পশু জবাইয়ে ধর্মীয় নিয়ম আছে। পশু জবাইকালে দোয়া পড়তে হয়।  অনেক কোরবানিদাতা এসব দোয়া জানেন না। এজন্য আমরা বড়রা কোরবানির পশু জবাই করি। এতে মাদ্রাসারও কিছু লাভ হয়।

তিনি আরও বলেন, ঈদে ছোট শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়া হয়। তবে যাদের বাসাবাড়ি মাদ্রাসার কাছে তারা স্বেচ্ছায় আমাদের সঙ্গে আসে। তারা চামড়া সংগ্রহ বা কোথাও ময়লা থাকলে পানি দিয়ে ধুয়ে দেওয়ার কাজ করে। আর আমাদের মাদ্রাসায় ছুটি নেওয়ার জন্য কোনও অর্থ দেওয়া লাগে না। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, কোরবানির পশু জবাইর পরে যে রক্ত থাকে, তা দেখলে শিশুদের মানসিক ডিপ্রেশন তৈরি হতে পারে। তাদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। এতে তার মানবিক গুণাবলি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।  

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, শিশুদের মধ্যে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। কোরবানির পশু জবাইয়ের পরে যে রক্তাক্ত অবস্থা সৃষ্টি হয় তা দেখে কোমলমতি শিশুদের মধ্যে মানসিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। এটা তার মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে। এসব দৃশ্যে অভ্যস্ত হয়ে গেলে মানুষের যে সুকুমারবৃত্তি সেগুলো নষ্ট হতে পারে। তবে এটা আমাদের দেশে একটা কালচার হিসেবে চলছে। ঐতিহ্যের উৎসব হিসেবে আত্মস্থ করে ফেললে সেক্ষেত্রে তেমন ক্ষতি নাও হতে পারে।

কওমি মাদ্রাসা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে মক্তব, ফোরকানিয়া ও কোরানিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসার সংখ্যা ১৪ হাজার ৯৩১টি। এসব মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। জাকাত, কোরবানির পশুর চামড়া ও চামড়া বিক্রীত অর্থ কওমি মাদ্রাসার আয়ের অন্যতম উৎস। শুধু এই ঈদুল আজহার সময়েই কোরবানির পশুর চামড়া থেকে এসব মাদ্রাসার কমপক্ষে চার মাসের ব্যয় মেটানো সম্ভব হয় বলে জানিয়েছেন মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা। আর এ কারণেই মাদ্রাসার জন্য চামড়া সংগ্রহ করতে শিক্ষকদের নেতৃত্বে ছাত্ররা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে থাকেন। মাদ্রাসা-শিক্ষার্থীরা কোরবানির পশু জবাই করে। তাদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী ছাত্ররাও থাকে।

 

 

 

/টিএন/

লাইভ

টপ