খুনিকে আশ্রয় দিলে মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে, কানাডাকে বাংলাদেশ

Send
শেখ শাহরিয়ার জামান
প্রকাশিত : ০৭:৫৫, আগস্ট ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫৫, আগস্ট ১৫, ২০১৯

বঙ্গবন্ধুর পলাতক ছয় খুনি

বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি নুর চৌধুরী কোনও স্ট্যাটাস ছাড়াই দুই দশকের বেশি সময় ধরে কানাডায় অবস্থান করছে। তাকে ফিরিয়ে আনতে ক’টনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

কানাডা সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশ বলেছে, একজন খুনিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে তাদের দেশের (কানাডার) মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। একজন খুনির মানবাধিকার রক্ষা করায় বাংলাদেশের জনগণের যে বিচার চাওয়ার এবং পাওয়ার অধিকার, সেটি লঙ্ঘিত হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে আদালতের রায় বাস্তবায়নে কোনও ছাড় দেবে না বাংলাদেশ, এ কথাও অটোয়াকে জানিয়ে দিয়েছে ঢাকা।

এছাড়া, কানাডার আদালতকে বাংলাদেশ বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, নুর চৌধুরী কত বড় অপরাধ করেছে।

বঙ্গবন্ধুর খুনিরা বর্তমানে কে কোথায় আছে এবং তাদের ফিরিয়ে আনতে সরকার কী উদ্যোগ নিয়েছে— এনিয়ে  সম্প্রতি আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে তার দফতরে খোলামেলা কথা হয়। এসময়

আইনমন্ত্রী জানান, আমরা দুজনের অবস্থান পরিষ্কারভাবে জানি এবং বাকি চার জনের অবস্থান সম্পর্কে এখনও অন্ধকারে আছি।

তিনি বলেন, ‘রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং নুর চৌধুরী কানাডায় অবস্থান করছে। এছাড়া শরীফুল হক ডালিম, রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, খন্দকার আব্দুর রশিদ ও আব্দুল মাজেদ কোথায় আছে, সেটি সরকারের জানা নেই।’

কানাডায় নুর চৌধুরী

নুর চৌধুরীর বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘কানাডায় একটি আইনি প্রতিবন্ধকতা আছে। তারা একটি আইন করে দিয়েছে, কোনও অপরাধী যে দেশে অপরাধ করেছে, সে দেশে যদি তার ফাঁসির রায় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বা হয়েছে, তবে ওই আসামিকে তারা দেশে ফেরত পাঠায় না।’

আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা তাদেরকে বলেছি, একটি খুনিকে তোমরা সেখানে রাখলে, তোমাদের দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।’

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘কানাডার সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আমরা একটি বিষয় পরিষ্কার করেছি যে, আদালতের রায় আমরা বাস্তবায়ন করবো। আরেকটি জিনিস আমরা করেছি সেটা হচ্ছে, নুর চৌধুরী দেশে ফিরে গেলে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রায় কার্যকর করবো। এবিষয়ে আমরা কোনও আলাপ-আলোচনায় যেতে রাজি না। হয়তো এমনও হতে পারে— সে দেশে আসলে আদালত আরেকবার শুনানির সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু সেটি আদালতের বিষয়।’

কানাডার আদালতে দায়ের করা মামলার বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘কানাডা আইন করে একটি অবস্থান নিয়েছে। এই আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। আমরা আদালতে গিয়েছি তাদের বোঝানোর জন্য গিয়েছি যে, এটা কত বড় একটা অপরাধ। আমাদের জাতির পিতা এবং তার পরিবারের ১৭ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে এবং এরমধ্যে একটি ১০ বছরের একটি শিশুও ছিল। এটার যে গুরুত্ব তা আগে কখনও বলা হয়নি,সেটাই আমরা কানাডার আদালতকে বোঝানোর চেষ্টা করছি।’

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই নুর চেীধুরী কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে একটি প্রি-রিমোভাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট দরখাস্ত করে জানায় যে, তাকে (নুর) যদি কানাডা থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়, তবে তাকে  ফাঁসি দেওয়া হবে। গত ১০ বছরে কানাডার সরকার তার দরখাস্তটি গ্রহণ বা প্রত্যাখান না করে বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে।

২০১৮ সালের জুন মাসে কানাডার ফেডারেল কোর্টে বাংলাদেশ এ বিষয়ে একটি রিট অব ম্যানডামাস দাখিল করে এবং আদালতের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত চেয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের  ঘটনাটি একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। এ বিষয়টিও আমরা উল্লেখ করেছি।’

তিনি বলেন, ‘কানাডা যেমন একজন ব্যক্তিকে রক্ষা করার জন্য আইন করেছে, তেমনই আমরা বলার চেষ্টা করছি, সমষ্টিগতভাবে এ বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের যে বিচার পাওয়ার অধিকার আছে, সেটাও কিন্তু লঙ্ঘন হচ্ছে। সেক্ষেত্রে তাকে ফেরত দেওয়া উচিত।’

কানাডায় বসবাসকারী বঙ্গবন্ধুর খুনি নুর চৌধুরী

যুক্তরাষ্ট্রে রাশেদ চৌধুরী

বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি রাশেদ চৌধুরী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে এবং সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছে বলে জানা যায়।

তার ব্যাপারে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন,‘আমেরিকাতে আমরা আইনি পদক্ষেপ নিয়েছি এবং আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছি। আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে  আমরা হয়তো একটি সমাধানে আসতে পারবো।’

তিনি বলেন, ’এটা আমার বিশ্বাস এবং এর মূল কারণ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ৩৫টি রাজ্যে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরইমধ্যে বলেছেন যে, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে যে রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড নাই, সেখানে তিনি এই ব্যবস্থা প্রচলন করবেন।’

আমাদের দেশে মৃত্যুদণ্ড সাজা হিসাবে আছে এবং যুক্তরাষ্ট্রেও আছে বলে তিনি জানান।

আনিসুল হক বলেন, ‘রাশেদ চৌধুরীর বিষয়ে সমস্যার সমাধান হয়তো তাড়াতাড়িই করতে পারবো। আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ’আমি কোনও সময়সীমা বেঁধে দিতে রাজি নই। কারণ, এটি আলোচনার ওপরে নির্ভর করে। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের ফেরত আনতে পারবো, আমরা এই চেষ্টায় ক্ষান্ত হবো না।’

ডালিম, রশিদ, মাজেদ ও মোসলেহউদ্দিন

আলাপকালে আইনমন্ত্রী জানান, ডালিম, রশিদ, মাজেদ ও মোসলেহউদ্দিন— এই চার খুনির কোনও খোঁজ আমরা জানি না।

তিনি বলেন, ‘এদের বিষয়ে কোনও সঠিক তথ্য আমাদের হাতে নেই। যেসব খবর আছে, তা কতটা সত্য সেটাও আমরা জানি না। কারণ, এসব খবরের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব নয়।’

আইনমন্ত্রী আরও  বলেন, ’হয়তো অনেকে বলেন, অমুক জায়গায় আছে। তখন খোঁজ নেই এবং দেখি খবরটি ঠিক না। সেজন্য এই চার জনের বিষয়ে এখন যে সংবাদ আছে, সেগুলো নিয়ে কথা না বলাই ভালো।’

যারা খুনিদের সহায়তা করে তারাও অপরাধী

আনিসুল হক বলেন, ‘বলা হয়ে থাকে, যারা খুনিদের সহায়তা করে তারাও অপরাধী। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে ওই খুনিদের বিচার প্রক্রিয়া রদ করা হয়। শুধু তাই না তাদেরকে পুরস্কৃত করা হয়। এই অপরাধ যারা করেছে তাদেরকে আমরা ধিক্কার দিতে পারি। যারা মূল অপরাধী তারা কিন্তু মারা গেছে। এরমধ্যে মোশতাক একজন এবং আরেকজন হচ্ছে জিয়া। তারা সবাই মারা গেছে। তারা খুনিদের শুধু রক্ষাই না, তাদের পুনর্বাসনের জন্য যা যা করা দরকার, তার সব কিছু করেছে।’

তিনি বলেন, ‘সেক্ষেত্রে আমার মনে হয়,সামজিকভাবে এদের ধিক্কার জানানো উচিত।’

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ