মশকনিধন কর্মীদের দায়িত্ব কাউন্সিলররা নেওয়ার পর বেড়েছে চিকুনগুনিয়া-ডেঙ্গু

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০৭:৩৩, আগস্ট ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২৩, আগস্ট ১৯, ২০১৯

ডিএনসিসি ও ডিএসসিসিরাজধানী ঢাকার মশা নিধনে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর অবহেলার অভিযোগ তুলে মশকনিধন কর্মীদের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়েছিলেন দুই সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি) কাউন্সিলররা। সে অনুযায়ী কর্মীদের বেতন ও হাজিরা নির্ধারণসহ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাদের। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর এ কাজ থেকে উধাও হয়ে পড়েন তারা। উপরন্তু, মশার ওষুধ চুরি, কর্মীদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে বেতনের টাকা ভাগাভাগিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। এর পর থেকেই নগরীতে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

মূলত রাজধানী ঢাকার মশা নিবারণের দায়িত্বে ছিল মশক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। কিন্তু অধিদফতরটির ব্যর্থতার পর এর দায়িত্ব নেয় সিটি করপোরেশন। অধিদফতরের মোট জনবলের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কিছু জনবল যুক্ত করে যৌথভাবেই নগরীর মশা নিবারণের কাজ করা হচ্ছে। এতে ওষুধসহ সব ধরনের সুবিধা দিচ্ছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু সংস্থা দুটির ঢিলেমি ও  অনিয়মের কারণে কোনওভাবেই মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ওষুধ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির মালিকদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন মশককর্মীরা। আবার অনেকেই টাকা নিয়ে ধনাঢ্য বাড়িওয়ালাদের বাড়িতে স্প্রে করেন। মশা উৎপাদনের স্থানগুলোর আশপাশ দিয়েও যান না তারা। এজন্য দিন দিন বাড়ছে মশাবাহিত নানা রোগব্যাধি। নাগরিকদের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ ওঠার পর মশক নিধন কর্মীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য আবেদন করেন দুই সিটির কাউন্সিলররা। একাধিক কাউন্সিলরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের জুলাই থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পাশাপাশি মশক নিধন কর্মীদেরও দায়িত্ব দেওয়া হয় কাউন্সিলরদের ঘাড়ে।  কিন্তু ওই বছর চিকুনগুনিয়া ও চলতি বছর ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

যেসব অভিযোগের ভিত্তিতে কাউন্সিলদের হাতে মশক নিধন কর্মীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সেই কাউন্সিলররাই আবার একই অভিযোগে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি নিয়ে কোনও কর্মী প্রকাশ্যে কথা বলতে না চাইলেও একাধিক মশক নিধনকর্মী বলেন, ‘মশার ওষুধ কাউন্সিলরের বাসা কিংবা অফিস থেকে সংগ্রহ করতে হয়। তাদের ওখানে গিয়ে হাজিরা দিতে হয়। যারা যে ওষুধ দিয়ে থাকেন সেই ওষুধই ব্যবহার করি। অনেক ওষুধ তারা রেখে দেন। পরে সেগুলো বিভিন্ন মশার কয়েল উৎপাদনকারীদের কাছেও বিক্রি করে দেওয়া হয়।’  

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, আগে মশক নিধন কর্মীদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ছিল দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের। কিন্তু বর্তমানে সে দায়িত্ব পালন করছেন কাউন্সিলররা। মশক নিধনকর্মীরা প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত লার্ভিসাইডিং ও বিকাল ৪টা হতে ৬টা পর্যন্ত অ্যাডাল্টি সাইডিং করেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কোনও কাউন্সিলরই কাজে উপস্থিত থাকেন না। সকালে যখন ওষুধ ছিটানো হয় তখন তারা থাকেন ঘুমে। আর বিকালে থাকেন নিজেদের কাজকর্মে ব্যস্ত। ফলে মাঠকর্মীদের খবর নেওয়ার সেই সুযোগ পান না কাউন্সিলররা।

দায়িত্ব পাওয়ার আগে কাউন্সিলররা দুই সংস্থার একাধিক বোর্ড সভায় বলেছিলেন,  ‘আমরাই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। যেকোনও দুর্ভোগের জন্য আমরাই জনগণের কাছে জবাবদিহি করি। কর্মকর্তাদের দুর্নীতির দায় আমরা নেবো কেনো?  তাদের কারণেই নগরবাসী মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মতো মশা নিধনকর্মীদের দায়িত্বও আমাদের দিতে হবে। আমাদের তত্ত্বাবধানে দেওয়া হলে নগরীতে মশার উপদ্রব আর থাকবে না। এজন্য একাধিক কাউন্সিলর মেয়রের কাছে আবেদনও করেছেন। কাউন্সিলরদের এমন দাবির পর বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ সভা করে মশক নিধনকর্মীদের বেতনভাতাসহ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণেরও দায়িত্ব দেওয়া হয় কাউন্সিলরদের হাতে।’

সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, একজন কাউন্সিলর তার ওয়ার্ডের সবকিছু জানেন। কোথায় কীভাবে ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে তারা ভালো বোঝেন। কোথায় মশার লার্ভা আছে, কোথায় নেই– তাও তারা জানেন। প্রতিদিন তারা যদি ওয়ার্ডের অন্তত একটি গলিতে কাজ করেন তাহলে এই শহরে ডেঙ্গু মশার আস্তানা থাকতে পারে না। কিন্তু কারও সেদিকে নজর নেই।

‘আমরা ঢাকাবাসী’র সভাপতি মো. শুকুর সালেক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একজন কাউন্সিলর চাইলে তার ওয়ার্ডের জন্য অনেক কিছু করতে পারেন। তার সেই ক্ষমতা আছে। তিনি নাগরিকদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ করতে পারেন। মতবিনিময় করতে পারেন। সচেতনতামূলক কাজ করতে পারেন। প্রতিদিন যদি একটি সড়ককে বেছে নেন, তবে অনেক কিছু হয়ে যায়। কিন্তু করা হয় না। তারা আন্তরিক না। তারা চাইলে ওয়ার্ডের নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব যেসব মশককর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন তাদের মনিটরিংটাও যদি সঠিকভাবে করা হয় তাহলে নগরবাসীকে এই দুর্ভোগে পড়তে হয় না।’

মশক নিধন কর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কাউন্সিলরদের হাতে দেওয়ার দাবি উত্থাপনকারীদের অন্যতম ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ রতন। জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দায়িত্ব কাউন্সিলরদের দেওয়া হয়েছে ঠিক। কিন্তু তাদেরকে কি সেই সব সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে? কাউন্সিলরদের কোনও কার্যালয় নেই। বসার জায়গা নেই। কম্পিউটার নেই। গ্রামের একটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের অফিসেও এসব আছে। আমাদের কাউন্সিলরদের কিছুই নেই। আমরা বলেছি, প্রতিটি কর্মীদের ডিজিটাল হাজিরা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে কে কখন আসলো কখন গেলো, কাজ করলো কি করলো না– সবই ধরা যাবে। এখন তো এসব মনিটরিং বা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’

উত্তর সিটির প্যানেল মেয়র আলেয়া সারোয়ার ডেইজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাউন্সিলরদের সঙ্গে আমি মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের তদারকির দায়িত্বে রয়েছি। কিন্তু আসলে আমি কাজ করছি কিনা, আমাকে মনিটরিং করার দায়িত্ব কারও নেই। আগে সেটা করতে হবে। আমি বিষয়টি একাধিকবার মেয়রকে বলেছি। কিন্তু কাজ হয়নি। আমার দায়িত্ব বলে যাওয়া,  সেটি করে যাচ্ছি।’

 

/এসএস/এমএএ/

লাইভ

টপ