আগস্ট বিক্ষোভ: হিমাগারে তদন্ত প্রতিবেদন!

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১২:৩৯, আগস্ট ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৫৯, আগস্ট ২৪, ২০১৯

আন্দোলন করায় গ্রেফতার হওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০-২২ আগস্ট দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের ওপর সেনা সদস্যদের হামলার ঘটনায় সংসদীয় কমিটির দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের ১৩ সুপারিশ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। তদন্ত  কমিটির প্রধান রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আমরা যে প্রতিবেদন দিয়েছিলাম সেটি সংসদের লাইব্রেরির কোল্ড স্টোরেজে রয়ে গেছে। মামলার বিষয়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ বা দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার যে সুপারিশ করা হয়েছিল তার বাস্তবায়ন না হওয়াটা হতাশার।’

২০০৭ সালে ২০ অগাস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে ছাত্র ও সেনা সদস্যদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। খেলার মাঠেই শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ২১ আগস্ট নির্যাতনের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন শিক্ষার্থীরা। ২২ আগস্ট এ আন্দোলন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। রাজশাহীতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রিকশা চালক আনোয়ার।

ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া  শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আটক করা হয়। ওই ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষককে সশ্রম কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। পরে আন্দোলন ও বিক্ষোভের মুখে মুচলেকা দিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

ওই বছরই এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। ২০০৯ সালে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ওই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে। তারা সংসদে তদন্ত প্রতিবেদন উত্থাপনও করে। কিন্তু তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি।

মুক্তি পাওয়ার পর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা

ঘটনা তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, রাজনীতিতে সেনাবাহিনী ও সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সব ধরনের হস্তক্ষেপ বন্ধ, নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রদের ক্ষতিপূরণ, সব মামলা ও দণ্ড স্থায়ীভাবে বাতিলের ব্যাপারে সরকারকে সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলা হয়। বাকি আরও দু’টি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে কোনও উদ্যোগ নেওয়া না হলেও সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন কার্যকর করা উচিত ছিল বলে মনে করছেন কমিটির প্রধান রাশেদ খান মেনন।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের সুপারিশকে ধরে এতদিন পর ডাকসু নির্বাচন হলো। কিন্তু সেসময় ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কোনও উদ্যোগ নেই। ফলে আগামীতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না সেটি নিশ্চিত হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেসময় আমরা লম্বা সময় ধরে তদন্ত করেছি,তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান, সেনাবাহিনীর প্রধান, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের সঙ্গে চিঠি বা টেলিফোনে সাক্ষ্য নিয়েছি। এরপর একটি প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে সরকার উদ্যোগী হয়নি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার করণীয় কাজ করেনি।’

সুপারিশ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন,  ‘সংসদীয় কমিটি সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে সংসদের কার্যকারিতা কমে যায়। সংসদ জনপ্রতিনিধিদের প্রতিষ্ঠান এবং এর কমিটিগুলো মিনি সংসদ। ফলে সেই সম্মানটা রাখতে হলেও সুপারিশ বাস্তবায়ন জরুরি। আমাদের দেওয়া সুপারিশগুলো যদি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হতো তাহলে আজকে আমরা যে সমস্যাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখছি সেগুলো থেকে বের হয়ে আসতে পারতাম।’

আন্দোলন করায় গ্রেফতার হওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক

সেসময় আটক হওয়া ছাত্রনেতা মানবেন্দ্র দেব মনে করেন, কোনও এক অজানা কারণে সচেতন ও সতর্কভাবেই সরকার আগস্ট ছাত্র আন্দোলনকে এড়িয়ে যেতে চায়। ওই আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও দেশের মানুষের প্রতি অমর্যাদার বিরুদ্ধে লড়াই ছিল। আন্দোলনের পরে নির্বাচন এসেছে, একদশক পরে ডাকসুও হয়েছে কিন্তু গণতন্ত্র কি এসেছে? আমরা যারা সেসময় নির্যাতিত হয়েছি যারা তাদের প্রত্যেকের মনে এটি বড় প্রশ্ন।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি ধরেও নিই সুপারিশ অনুসারেই ডাকসু হয়েছে। তারপরও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তো ফেরত আসেনি। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসেনি।’

সংসদীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনও তদন্ত প্রতিবেদন পাই না বলে সেই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়াটাই অন্যরকম বিষয় ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তারা এটা বাস্তবায়ন করবেন সেই প্রত্যাশাও নেই। সেটাও আরেকটি লড়াইয়ের বিষয়।’

২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পরে নির্বাচন নিয়ে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল মুখোমুখি অবস্থান নেয়। শুরু হয় সারাদেশে সহিংসতা। অরাজকতা আর সহিংসতার সেই সুযোগে সেনাবাহিনীর সহায়তায় জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অঙ্গীকার করে ক্ষমতা গ্রহণ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্ধারিত হওয়া জাতীয় নির্বাচন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ বেশ কয়েকটি দল বর্জন করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নামে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। যদিও সংস্কারের নামে বড় দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ দুই নেতাকে বাদ দেওয়ার মাইনাস টু ফর্মুলা প্রয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্বশূন্য করার জোর চেষ্টা চালানো শুরু করে তারা। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও আটক করা হয়।

 

 

/ইউআই/এসটি/

লাইভ

টপ