রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ

Send
শেখ শাহরিয়ার জামান
প্রকাশিত : ২৩:২৩, আগস্ট ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩২, আগস্ট ২৫, ২০১৯

দুই বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও দেশে ফেরত যেতে রাজি করাতে পারেনি মিয়ানমার। রাখাইনে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা তো দূরের কথা বরং সেখানকার রাখাইন সম্প্রদায়ের জনগণকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আরও বেশি করে উসকে দিচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সরকার। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি মিয়ানমারের দায়বদ্ধতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চায় বাংলাদেশ। সরকার মনে করে, দেশটির দায়বদ্ধতাই রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করবে।
বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থানরত ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা তাদের মাতৃভূমিতে ফেরত যেতে রাজি নয়। কারণ, মিয়ানমার সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিতে তারা বিশ্বাস করতে পারছে না। রাখাইনে এখনও এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে। তাদের নিজ বাড়িতে ফেরত যেতে দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া রোহিঙ্গাদের ওপর যারা নির্যাতন করেছে তাদেরও বিচারের আওতায় আনেনি মিয়ানমার সরকার। এসব কারণে রোহিঙ্গাদের মাঝে মিয়ানমার সরকারের ওপর বিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শুধু বাংলাদেশ নয়, এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও দায়বদ্ধতার ওপর জোর দিচ্ছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গত ২১ ও ২৩ আগস্ট দুই দফা মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। উভয় বৈঠকে দায়বদ্ধতার বিষয় নিয়ে বাংলাদেশসহ পরিষদের সদস্য দেশগুলো বক্তব্য রাখেন।

প্রত্যাবাসনে সমস্যা
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এই লোকগুলোকে ফেরত নেওয়ায় মিয়ানমারের অনীহা। সেই কারণে তারা রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত যাওয়ার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে না। রাখাইনে এখনও ২৬টি ইন্টারনাল ডিসপ্লেসড পারসন (আইডিপি) ক্যাম্প আছে যেখানে গত কয়েক বছর ধরে এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মানবেতর জীবনযাপন করছে। যেসব রোহিঙ্গা রাখাইনের ক্যাম্পে অবস্থান করছে তাদেরই পুনর্বাসন করছে না মিয়ানমার সরকার, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গারা ফেরত গেলে তাদের কতটুকু পুনর্বাসন করা হবে সেটি নিয়ে আস্থাহীনতায় রয়েছে তারা।
রোহিঙ্গাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে আছে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, চলাচলে স্বাধীনতা ও জীবনযাপনের ব্যবস্থা। এই দাবিগুলোর ক্ষেত্রে কোনও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না মিয়ানমার সরকার। এ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেছে মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধিরা কিন্তু কোনও সন্তোষজনক জবাব তারা দেয়নি।

দায়বদ্ধতা
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গত ২১ আগস্ট রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ১৫ জন সদস্য দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেন এবং জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা- ইউএনএইচসিআরের প্রধান ফিলিপো গ্র্যান্ডি সদস্যদের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান। এরপর ২৩ আগস্ট আরিয়া ফর্মুলায় (সমসাময়িক সমস্যা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের অনানুষ্ঠানিক গোপনীয় সভা) আরেকটি বৈঠক হয় যেখানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সদস্য কুমারাস্বামিসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে বাংলাদেশসহ প্রায় প্রতিটি সদস্য দায়বদ্ধতার ওপর জোর দিলেও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া বিষয়টির আন্তর্জাতিকীকরণের বিরোধিতা করে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানে জোর দেয়। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিটি দেশ জাতীয় স্বার্থ মাথায় রেখে কাজ করে। চীন ও রাশিয়া এর ব্যতিক্রম নয়। মিয়ানমারে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে চীন। রাশিয়া থেকে প্রচুর সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে মিয়ানমার। এ কারণে ওই দেশটির বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ নিতে রাজি নয় তারা।’

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ
আগামী মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত দুই বছর সাধারণ পরিষদের বক্তৃতায় তিনি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এবারও আশা করা হচ্ছে তিনি নতুন পথ নিয়ে বক্তব্য দেবেন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ’আমরা এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’ রোহিঙ্গা নিয়ে সাইড ইভেন্ট হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ’গতবার ওআইসি এবং ইউএনএইচসিআর আলাদাভাবে দুটি অনুষ্ঠান করেছিল। এবার ওআইসি করবে বলে জানিয়েছে কিন্তু ইউএনএইচসিআর এখনও কিছু জানায়নি।’
প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতনে ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ২০১৭ এর ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

/এসএসজেড/ওআর/

লাইভ

টপ