বিমানের অব্যবস্থাপনায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন
প্রকাশিত : ১৭:৫৫, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৯, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

উড়োজাহাজ-থেকে-প্যালেট-লোডারে-পণ্য-নামানো-হচ্ছেদেশের সব বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তবে, নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ কাজে নিয়োজিত জনবলের যথাযথ প্রশিক্ষণ, তদারকি না থাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে দুর্ঘটনা বাড়ছে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বেশিরভাগ কর্মী নৈমিত্তিক ভিত্তিতে নিয়োগ হওয়ায় তাদের প্রশিক্ষণ, সুরক্ষায় আগ্রহ নেই স্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের। এতে উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংকর্মীরাও আহত হচ্ছেন। হাত পা-সহ বিভিন্ন অঙ্গহানির কারণে অনেকেই হারিয়েছেন স্বাভাবিক কর্মজীবন। আয়ের অন্যতম উৎস বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খাতের এমন দুর্ঘটনার জন্য বিমানের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা।

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত শাহজালাল বিমানবন্দরের গ্রাউন্ডে দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১৭ জন কর্মী আহত হয়েছেন।  আর ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৭ সালে ১০ জন। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং-কর্মীদের নিয়োগ নৈমিত্তিক ভিত্তিতে হওয়ায় কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হলেও কোনও চিকিৎসা সুবিধা ছিল না। বরং চিকিৎসাধীন অবস্থায় কর্মস্থলে আসতে না পারার কারণে কোনও বেতন-ভাতা পেতেন না কর্মীরা। তবে, এ বছর জুন থেকে নৈমিত্তিককর্মীদের চিকিৎসা-সুবিধা চালু করে বিমান।

জানা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশি-বিদেশি ৩৯টি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট পরিচালিত হয়। দিনে গড়ে এসব এয়ারলাইন্সের ২৫০টি ফ্লাইট ওঠানামা করে। এরমধ্যে ১৩০টি থাকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। কেবল দেশি ৩টি এয়ারলাইন্স নিজেদের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিজস্ব জনবল দিয়ে করে। বাকি এয়ারলাইন্সগুলোর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বিমান গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের আওতায় বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ও যাত্রীদের লাগেজ সরবরাহসহ অন্যান্য কাজ করে থাকে। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের আওতায় আমদানি-রফতানি পণ্য উড়োজাহাজে ওঠানো-নামানোর কাজ করা হয়।

উড়োজাহাজ-থেকে-পণ্য-নামাচ্ছেন--গ্রাউন্ড-হ্যান্ডরিংকর্মীরাবিমান সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনে বিমান। গ্রাউন্ড, ফ্লাইট, লাগেজ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রায় ৩৫ রকমের যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়। এরমধ্যে রয়েছে এয়ার প্যালেট ট্রান্সপোর্টার, এয়ারক্রাফট এয়ারকন্ডিশনিং ইউনিট, এয়ার ফ্র্যাশকার্ট, এয়ার ওয়াটার কার্ট, প্যালেট লোডার, ব্যাগেজ টোও ট্রাক্টর, ব্যাগেজ ট্রলি, পুশকার্ট ইত্যাদি। এ ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহারে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। এছাড়া, বিমানবন্দরে অ্যাপ্রোন এলাকায় যান চলাচলের সর্বোচ্চ গতিসীমা ১৫ কিলোমিটার নির্ধারিত।

তবে, যন্ত্রপাতি ব্যবহারের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংকর্মীদের। এছাড়া, নিয়ম মেনে নির্ধারিত গতিতে যান চলাচলের পর্যবেক্ষণ করেন না দায়িত্ব থাকা বিমানের কর্মকর্তারাও। অদক্ষ পরিচালনা ও নিয়ম না মানায় ঘটছে দুর্ঘটনা। অন্যদিকে, এসব সমস্যা সমাধানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নেই মনিটরিং।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর বেল্ট লোডারের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ। বেল্ট লোডার লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইঞ্জিনের বেশকিছু ব্লেড। একই বছরের ৫ আগস্ট বিমানের জিএসি অপারেটর মো. নজরুল অসতর্কভাবে টো-ট্রাকটার পরিচালনার কারণে বিমানের কার্গো হেলপার মো. সেলিম মারাত্মক আহত হন। এরপর ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমানের টোয়িং ট্র্যাক্টরের আঘাকে নভোএয়ারের এটিআর ৭২-৫০০ বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ট্রলির আঘাতে আহত হন ক্যাজুয়াল ট্রাফিক হেলপার আলী আহমেদ। একই মাসে ট্রলি পায়ের ওপর পড়ায় আহন হন ক্যাজুয়াল ট্রাফিক হেলপার মো. নুরুজ্জামান। জুন মাসে আহত হন জিএসই হেলপার মো. তানজিল হক, ক্যাজুয়াল ট্রাফিক হেলপার মো. নুর হোসেন। এছাড়া, চলতি বছর আরও আহত হন ক্যাজুয়াল ট্রাফিক হেলপার মো. বেল্লাল হোসেন, ক্যাজুয়াল ট্রাফিক হেলপার মো. রফিকুল আলম, ক্যাজুয়াল ট্রাফিক হেলপার মো. গোলাম মওদুদ, ক্যাজুয়াল ট্রাফিক হেলপার মো. বেল্লাল হোসেন, ক্যাজুয়াল ট্রাফিক হেলপার মো. আলী মিয়া, ক্যাজুয়াল ট্রাফিক হেলপার মো. জামাল হোসেন, ক্যাজুয়াল কার্গো হেলপার নুরুল ইসলাম হাওলাদার, মো. রোমান, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. খলিলুর রহমান, মো. শফিউল আলম, মো. আমজাদ হোসেন, মো. ইদ্রিস, টিপু সুলতান। কেউ আহত হয়েছেন টো ট্রাক্টরের ধাক্কায়, কারও পায়ের পর উঠেছে টো-ট্রাক্টর, কারও ক্ষেত্রে ঘটেছে যন্ত্রপাতির আঘাত।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ৬-৭ দিনের ট্রেনিং দিয়ে কাজ করতে দেওয়া হয়। সময় মতো হয় না রিফ্রেশার ট্রেনিং। বেতন কম হওয়ায় কর্মীদের অতিরিক্ত সময়ে (ওভারটাইম) কাজ করার প্রবণতা রয়েছে। ফলে অতিরিক্ত কাজ করার কারণে ভুলের পরিমাণ বাড়ছে। এতে দুর্ঘটনাও ঘটছে। এছাড়া, মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নজরদারি না থাকায় নিয়ম না মানলেও কারও বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

ট্রো-ট্রাক্টর

দুর্ঘটনা প্রতিরোধ প্রসঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাবেক পরিচালক জাকির হাসান বলেন, ‘বিমানবন্দরের কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। শুধু প্রশিক্ষিত করলেই হবে না, তাদের যথাযথভাবে মনিটরিংও করতে হবে। কমপক্ষে ৩-৪টি শিফটে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত জনবলও প্রয়োজন। ’

এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও বিমান বাংলাদেশে এয়ারলাইন্সের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ক্যাপ্টেন ফারহাত হাসান জামিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। অন্যদিকে, মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়ে ও এসএমএস পাঠিয়েও বিমানের জনসংযোগ বিভাগ থেকেও কোনও জবাব পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মহিবুল হক বলেন, ‘যারা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ করেন, তারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিমানের নিজস্ব ট্রেনিং সেন্টার আছে। সেখানে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনায় কেউ যদি আহত হন, তার চিকিৎসার ভার বহন করবে বিমান।’ কেউ আহত  হয়ে বাড়ি চলে যাবেন, আর কেউ খবর নেবেন না, এটা হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ